‘রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে।’ তবে মুম্বইয়ের ডাব্বাওয়ালাদের কাছে এ বোঝা খবরের নয়, খাবারের। মুম্বই এবং সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ‘লাঞ্চবক্স’ পৌঁছোনোর কাজে নিয়োজিত বিশ্বখ্যাত মুম্বইয়ের ডাব্বাওয়ালারা। কাঁটায় কাঁটায় সময় মেনে পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে দুনিয়ার কাউকে রেয়াত করেন না তারা। এমনকি ঠিক সময় গন্তব্যে খাবার পৌঁছোতে তাঁদের বহু খারাপ ও জটিল রাস্তাঘাট অনায়াসে পেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও তাক লাগায়।
প্রতি দিন সকালে মুম্বই শহর পুরোপুরি জেগে ওঠার আগেই, সাদা টুপি এবং শার্ট পরা পুরুষেরা সাইকেলে সারি সারি টিফিন বাক্স বোঝাই করে মুম্বইয়ের শহরতলির রেলস্টেশনগুলিতে এসে পৌঁছোন। বাক্সগুলো ট্রেনে তুলে দেন তাঁরা। নির্দিষ্ট গন্তব্যে নেমে তার পর হেঁটে এবং সাইকেলে করে অফিসকর্মীদের কাছে গরম, ঘরে রান্না করা খাবার পৌঁছে দেন। শহরের নানা প্রান্তের বাড়ি থেকে বাক্সে ভরা খাবার তুলে নিয়ে বিভিন্ন অফিস বা স্কুলে পৌঁছোনো ও সেই বাক্স ফের ফিরিয়ে আনার কাজ বিকেল বিকেলই সারা হয়ে যায় তাঁদের। তার পর ঝাড়া হাত-পা।
এই টিফিন বাক্সগুলিকে বলা হয় ডাব্বা। ডাব্বায় থাকে বাড়ির রান্না করা খাবার। আর যাঁরা ডাব্বা দিয়ে-নিয়ে আসার এই কাজ করেন, তাঁরাই ডাব্বাওয়ালা। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তাঁরা এমন এক নিখুঁত সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে মুম্বইবাসীকে খাবার জুগিয়ে আসছেন, যা বিশ্ব জুড়ে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। মুম্বইয়ে অফিসকর্মীদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঘরে রান্না করা খাবার পারিবারিক রুটিন, সংস্কৃতি এবং খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িত। একে এই দ্রুত গতির শহরে কর্মজীবনের একটি অপরিহার্য অংশ করে তুলেছে ডাব্বা।
প্রতিটি বাক্সে একটি ‘আলফানিউমেরিক কোড’ দেওয়া থাকে, যা এক জন ডাব্বাওয়ালাকে বুঝতে সাহায্যে করে যে ডাব্বা কোন এলাকার কোন বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টের কত তলা থেকে এসেছে এবং কোথায় যাবে। কোনও অ্যাপ বা জিপিএসের সাহায্যে এ কাজ হয় না, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার কারণেই ডাব্বাওয়ালারা নিখুঁত ভাবে তাঁদের কাজ করেন।
ডাব্বাওয়ালাদের ব্যবসা ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বইকে বিশ্বব্যাপী অন্য এক পরিচিতি এনে দিয়েছে। জানা যায়, ‘হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল’ও স্বল্প খরচে পণ্য পরিবহণের একটি ‘মাস্টারক্লাস’ হিসাবে এটি নিয়ে গবেষণা করেছে। ২০০৩ সালে ডাব্বাওয়ালাদের সঙ্গে দেখা করতে মুম্বইয়ের চার্চ গেট স্টেশনে এসেছিলেন ব্রিটেনের তৎকালীন প্রিন্স চার্লস।
ডাব্বা পরিষেবা এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে মুম্বইয়ের গর্বের অন্ত নেই। কারণ ভারতে এ জিনিস আর কোথাও দেখা যায় না। তবে ১৩০ বছরের বেশি সময় ধরে এক দিনও গ্রাহকের কাছে খাবারের ডাব্বা পৌঁছোতে দেরি না করে সময়ানুবর্তিতার উদাহরণ হয়ে ওঠা সেই ডাব্বাওয়ালারা এ বার নাকি হাল ছাড়ছেন। যে মানুষগুলির জন্য মুম্বইয়ের এই খ্যাতি, টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছেন তাঁরা।
মনে করা হয়, ডাব্বা সরবরাহ ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের শেষের দিকে, যখন তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনাধীন বোম্বে (বর্তমান মুম্বই) দ্রুত প্রসারিত হচ্ছিল এবং অফিসকর্মীদের দিনের বেলায় তাজা, ঘরে রান্না করা খাবার খাওয়ার একটি উপায়ের প্রয়োজন ছিল। এমন এক সময়ে, যখন রেস্তরাঁ এবং ক্যান্টিনের সংখ্যা সীমিত ছিল। বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এমন একটি শহরে যেখানে সংস্কৃতি, ধর্ম এবং পারিবারিক রীতিনীতির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত ছিল খাবার।
এ-ও মনে করা হয় এক জন পার্সি ব্যাঙ্ককর্মীর জন্য প্রচলিত হয় ডাব্বা পরিষেবা। ওই ব্যাঙ্ক কর্মী নাকি প্রতি দিন সকালে তাঁর বাড়ি থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে এসে অফিসে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এবং পরে খালি বাক্সটি ফেরত নিয়ে যাওয়ার জন্য এক জন লোক নিয়োগ করেছিলেন। আর সেখান থেকে শীঘ্রই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সেই ধারণা। শোভা বোন্দ্রের বই ‘মুম্বই’স ডাব্বাওয়ালা: দ্য আনকমন স্টোরি অফ দ্য কমন ম্যান’ অনুযায়ী, ১৮৯০ সালে মহাদেও বাচ্ছে নামের এক ব্যক্তি প্রায় ১০০ জন কর্মী নিয়ে ডাব্বাওয়ালা পরিষেবা আধুনিক রূপে সংগঠিত করেন।
প্রথম দিকের ডাব্বাওয়ালারা সাইকেলে করে টিফিন বাক্স পরিবহণ করতেন এবং সেগুলিতে রঙিন সুতো দিয়ে চিহ্ন দেওয়া থাকত, যাতে সেগুলি সঠিক ভাবে বাছাই করে ফেরত দেওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রঙিন সুতোর পরিবর্তে একটি স্বতন্ত্র ‘আলফানিউমেরিক কোড’ ব্যবস্থা চালু হয় এবং খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজটি সাইকেল, মোটরবাইক এবং মুম্বইয়ের শহরতলির ট্রেন নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এই পরিষেবা নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলির মতে, যখন ডাব্বা পরিষেবা সংক্রান্ত ব্যবসা সাফল্যের শীর্ষে ছিল, তখন প্রায় ৪,৫০০ ডাব্বাওয়ালা মুম্বই জুড়ে প্রতি দিন প্রায় ৫০,০০০ টিফিন বাক্স পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন। কিন্তু ২০২০ সালে অন্যান্য অনেক ব্যবসার মতো করোনা অতিমারি ডাব্বাওয়ালাদের ব্যবসাতেও আঘাত হেনেছিল।
অনেক অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং মানুষ বাড়ি থেকে কাজ শুরু করায়, আগের মতো প্রতি দিনের খাবার পৌঁছে দেওয়ার আর প্রয়োজন পড়ছিল না। যে সব ডাব্বাওয়ালারা একসময় দিনে ২০ বা ২৫ জন অফিসকর্মীকে খাবার সরবরাহ করতেন, তাঁদের হাতে হঠাৎ করেই মাত্র হাতেগোনা কয়েক জন গ্রাহক এসে ঠেকেছিল। কারও কারও তো কোনও গ্রাহকই ছিলেন না। সে সময় অনেকেই এই ব্যবসা পুরোপুরি ছেড়ে দেন। অচল হয়ে পড়ে মুম্বইয়ের ডাব্বাওয়ালা নেটওয়ার্ক।
এর পর করোনা-পরবর্তী সময়ে অফিস আবার চালু হয়। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ এবং ‘হাইব্রিড’ মডেল ধীরে ধীরে ডাব্বাওয়ালাদের চাহিদা কমিয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে ‘মুম্বই টিফিন বক্স সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সচিব কিরণ গাভান্দে বলেন, ‘‘লকডাউনের পর বাড়ি থেকে কাজ শুরু হয়। এখন কিছু মানুষ সপ্তাহে মাত্র দুই থেকে তিন বার অফিসে যান। এটি মুম্বইয়ের ডাব্বাওয়ালাদের উপর বড় প্রভাব ফেলেছে।’’ ওই সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত ডাব্বাওয়ালাদের সংখ্যা ২০১৮ সালে যেখানে প্রায় ৪,৫০০ ছিল, বর্তমানে তা কমে প্রায় ১,৫০০-তে দাঁড়িয়েছে।
একই সময়ে খাবারের সঙ্গে মুম্বইয়ের সম্পর্কও বদলে গিয়েছে। সুইগি এবং জ়োম্যাটোর মতো অনলাইন খাবার ডেলিভারি অ্যাপ এবং কম দামে রেস্তরাঁর খাবার সরবরাহকারী ক্রমবর্ধমান ক্লাউড কিচেনগুলি মুম্বইবাসীর সামনে একগুচ্ছ নতুন বিকল্প এনে দিয়েছে।
যেখানে একসময় ডাব্বাওয়ালাদের তেমন কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না এবং মাসে মাত্র ২,০০০ টাকার বিনিময়ে বাড়ির রান্না করা খাবার অফিসকর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতেন, সেখানে এখন স্ক্রিনের এক ট্যাপেই বিরিয়ানি থেকে বার্গার পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের কাছে।
২০ বছর ডাব্বাওয়ালা হিসাবে কাজ করা ৪১ বছর বয়সি এক ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, একসময় দিনে ১৫ থেকে ২০ জন গ্রাহকের কাছে লাঞ্চবক্স পৌঁছে দিয়ে মাসে প্রায় ২০,০০০ টাকা আয় করতেন তিনি। সেই টাকায় ভারতের অন্যতম ব্যয়বহুল শহরে পাঁচ জনের একটি পরিবারের ভরণপোষণ ভাল ভাবেই করতেন তিনি। কিন্তু ২০২০ সালের শেষের দিকে তাঁর কাছে মাত্র দু’জন গ্রাহক অবশিষ্ট ছিলেন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ওই কাজ ছাড়তে হয় তাঁকে। এখন তিনি টোটো চালান। মাসে প্রায় ১৫,০০০ টাকা আয় করেন, যা আগে ডাব্বা ডেলিভারি করে যা আয় করতেন তার চেয়েও কম। কিন্তু বিকল্পের অভাবে তিনি অসহায়।
ওই প্রাক্তন ডাব্বাওয়ালার কথায়, ‘‘কোনও খদ্দের নেই, টাকা নেই— আমরা কী করব? আমরা টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছি। আমি সংসারের খরচ কমিয়ে দিয়েছি। কিন্তু আমার তিন সন্তান আছে। তাদের পড়াশোনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাঝেমাঝে আমাকে টাকা ধার করতেও হয়েছে। আগে এমন অবস্থা ছিল না।’’
অন্য এক ডাব্বাওয়ালা আবার জানিয়েছেন, তিনি এখনও ডাব্বা সরবরাহের কাজ করলেও গ্রাহকের সংখ্যা কমার কারণে সংসার চালাতে এখন তাঁকে অন্য কাজও করতে হয়। দুপুর পর্যন্ত ডাব্বাওয়ালা হিসাবে কাজ করে বিকাল থেকে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হয়ে দোকানদারদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন তিনি। বাড়ি ফেরেন রাত ১০টায়।
ওই ডাব্বাওয়ালার কথায়, ‘‘কোভিডের আগে আমি ২৫ অফিসকর্মীর ডাব্বা পৌঁছে দিতাম। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এখন বাড়ি থেকে কাজ করছেন, কেউ চাকরি হারিয়েছেন— এখন মাত্র ১৫ জন গ্রাহক আছেন। এখন ডাব্বাওয়ালার কাজ থেকে আয় খুব কম। তাই সবাই একাধিক কাজ করছেন।”
আজীবন ডাব্বাওয়ালা হিসাবে কাজ করেছেন, তেমন কয়েক জনের আবার আশঙ্কা, পরবর্তী প্রজন্মের কেউ আর এই কাজ করার জন্য এগিয়ে আসবেন না। মুম্বইয়ের গর্বের এই পেশা শহরের বুক থেকে ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যেতে পারে ভেবেও দুশ্চিন্তা অনেকের। ৩৫ বছর ধরে ডাব্বাওয়ালা হিসাবে কাজ করা তেমন এক ব্যক্তি বলেছেন, “আমাদের সময়ে আমরা টিকে থাকতে পেরেছিলাম। কিন্তু আজকের জীবনযাত্রার খরচের কারণে নতুন প্রজন্ম এই কাজে আসবে না। সবাই আরও ভাল বেতনের চাকরি বা ব্যবসা করতে চাইবেন।”