Jibanananda Das

জনতাগভীর নির্জনতা

সমকালীন বঙ্গসমাজে জীবনানন্দ দাশ শুধু কবি নন। নক্ষত্রের যাবতীয় মুদ্রাদোষ নিয়েই তিনি ইতিহাস-পুরুষ। তাঁর ম্লান হেমন্তসন্ধ্যার অবসাদ, জলতলের কলমিলতা ও ডাহুক, কেশবতী কন্যারা তাঁকে অন্তরালবর্তী করে তুলেছিল। মানুষ তাঁকে নির্জনতার কবি ভাবত। কালক্রমে তিনি নিজেই ছিন্ন করেছেন সেই ভ্রান্তিজাল।

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৫
Share:

ছবি: কুনাল বর্মণ।

সমকালীন বঙ্গসমাজে জীবনানন্দ দাশ শুধু কবি নন। নক্ষত্রের যাবতীয় মুদ্রাদোষ নিয়েই তিনি ইতিহাস-পুরুষ। তাঁর ম্লান হেমন্তসন্ধ্যার অবসাদ, জলতলের কলমিলতা ও ডাহুক, কেশবতী কন্যারা তাঁকে অন্তরালবর্তী করে তুলেছিল। মানুষ তাঁকে নির্জনতার কবি ভাবত। কালক্রমে তিনি নিজেই ছিন্ন করেছেন সেই ভ্রান্তিজাল। সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

আজ আর সমকালীন বঙ্গসমাজে জীবনানন্দ দাশ শুধু কবি নন। অভিনেতারা যেমন ‘স-জীবনী’ হলে ‘স্টার’-এ রূপান্তরিত হন, জীবনানন্দ তেমনই তাঁর জীবনের অব্যবস্থা ও গোপনীয়তা কিংবা অজাচার ও পরনারী আসক্তি-সহ একটি অপ্রামাণ্য জীবনী গড়ে তুলেছেন। আর তার ফলে তিনি নক্ষত্রের যাবতীয় মুদ্রাদোষ নিয়েই ইতিহাস-পুরুষ। জীবনানন্দকে ‘নির্জনতম’ কবি ভাবার কুসংস্কারে এ বার ছেদ পড়া উচিত।

ঘাসের জাজিম চিরে চেয়ে থাকা সমান্তরাল সরলরেখার মতো যে ট্রামলাইনে শেষ বারের মতো মাথা রেখে ঘুমোতে চেয়েছিলেন, সেই ট্রাম নিয়তি-তাড়িত। আজ আর অস্বীকারের জো নেই যে, দেশপ্রিয় পার্ক হতেই সেই ট্রাম রূপান্তরিত হয়ে যায় ইতিহাস-যানে। জীবনানন্দ দাশ দুর্ঘটনার ছলনায় মর্তের পাহারাদারদের ফাঁকি দিলেন। কিন্তু আরও বড় কথা যে, মরণোত্তর কী যে হাসিরাশি উপহার দিয়ে গেলেন সাহিত্যের আকাদেমিয়ার জন্য! সৌন্দর্যপ্রথার আমিষগন্ধে ম ম করছে দিগন্ত। স্বপ্নের ধারাবাহিকতায় ঘন হয়ে এল উপমার স্তনশ্যামমুখ। কেউ খেয়াল করল না যে ‘মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য’ বলার পরে জীবনানন্দ অমোঘ কালপুরুষের মতো উপলব্ধি করেছেন— ‘কখনো সম্রাট শনি শেয়াল ও ভাঁড়/ সে-নারীর রাং দেখে হো-হো ক’রে হাসে।’ এই বিপন্ন আততায়ীকে চিহ্নিত করার ভাষা আজও আমরা খুঁজে পাইনি। আমরা নিজেদের সংস্কারে কেবলই একজন উদাসীন রোমান্টিক কবিকে অনুমান করে গিয়েছি। কিন্তু আপাতনিরীহ এই বাঙালি কবি যে সচেতন ভাবে উপাসনা করে গিয়েছেন দূরগামী হিংস্রতার, তার আঁচ পাইনি বা আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধ ছক আত্মহননের সেই উত্তাপ ধারণ করতে ভয় পেয়েছে।

কাব্যকৃতি: জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’-এর প্রচ্ছদ।

এ ভাবে এক দিন বিকেলের আলো ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে নিভে যায়। জীবনানন্দ বুঝতে পারেন বিস্ময়ে পরাগ সংযোগ ছাড়া কবির জন্য কোনও বিকল্প নিয়তি নেই। ট্রাম লাইনে কিয়স্কের পাশে থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে পড়ে থেকে তিনি আমাদের বিস্মিত করে রেখে গেলেন চিরদিনের মতো। লেখক সত্যবাদী, সত্যনিষ্ঠ কিন্তু তিনি সন্ন্যাসী নন। আমার মনে হয়, ধর্মপ্রাণ যুধিষ্ঠিরের মতোই স্বর্গাভিযান তাঁর। যখন যুধিষ্ঠির পাশা খেলায়, তখন তিনি মোহে আচ্ছন্ন। ভাষাশিল্পীও সে রকম শাপগ্রস্ত। সত্য আর নিয়তি, বলা ভাল মৃত্যু আর স্বপ্নের মধ্যে ভূতগ্রস্ত তিনি সর্বনাশের আশায় চেয়ে থাকেন। আমেরিকান ঔপন্যাসিক হেনরি মিলার এক বার বলেছিলেন, যে সব শ্রেষ্ঠ পুরস্কার মানুষ মানুষকে দেয়, যেমন, ক্রুশবিদ্ধ করা অথবা ঝলসে পোড়ানো, তার একটি চলচ্চিত্রকার বুনুয়েলকে দেওয়া যেতে পারে।

আমার মনে হয় কবিতার জন্য সহজীবীরা জীবনানন্দকে এমন একটি শাস্তিই দিতে চেয়েছিলেন: নির্বাসন। এমনকি যে রবীন্দ্রনাথ সাধারণত অতি নমনীয়, এমনকি বহু হীনবল সাহিত্যকর্মীও যাঁর কাছ থেকে অনায়াসে শংসাপত্র পেয়েছেন, তিনিও যুবক জীবনানন্দকে বস্তুত তিরস্কারই করেছিলেন: “তোমার কবিত্ব শক্তিআছে তাতে সন্দেহমাত্র নেই। কিন্তু ভাষা প্রভৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝতে পারি নে। কাব্যের মুদ্রা ‘দোষটা’ ওস্তাদিকে পরিহাসিত করে। বড় জাতের রচনার মধ্যে একটা শান্তি আছে, যেখানে তা ব্যাহত দেখি সেখানে স্থায়িত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ জন্মে। জোর করে দেখানো যে জোরের প্রমাণ তা নয় বরঞ্চ উলটো।”

যদিও ‘কবিতা’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা পাঠ করে তিনি সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুকে জানান যে ‘জীবনানন্দ দাশের চিত্ররূপময় কবিতাটি আমাকে আনন্দ দিয়েছে।’ অথচ উত্তরকালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সম্পাদিত ‘বাংলা কাব্য পরিচয়’-এ এই ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতাটিকে সম্পাদনা করে নিয়েছিলেন। এই সম্পাদনায় ব্যথিত হয়ে ‘কবিতা’ পত্রিকার আশ্বিন সংখ্যায়, ১৩৪৫ সালে, সক্ষোভে বুদ্ধদেব লেখেন, “দয়ার গ্রহণের চাইতে স্পষ্ট উপেক্ষার বর্জন অনেক সম্মানের।” রবীন্দ্রনাথ মৌনীই ছিলেন। জীবনানন্দ বরং ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ বিষয়ে যাতে রবীন্দ্রনাথ লেখেন এমন সানুনয় প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। তাতে রবীন্দ্রনাথ অবশ্য উত্তর দেন, যাকে তাৎক্ষণিক প্রশংসাবাক্য বলা যায়, কিন্তু কাব্যালোচনা কখনোই নয়। তিনি পত্রপ্রাপ্তির এক সপ্তাহের মধ্যেই লেখেন, “তোমার কবিতাগুলি পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার লেখায় রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।” এমনকি ব্রাহ্মসমাজের অন্দরমহলের দিকে তাকালেও বোঝা যায়, কুসুমকুমারী ও সত্যানন্দের পুত্রের প্রতি কোনও উচ্ছ্বাস দেখাননি রবীন্দ্রনাথ। ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র রিভিউ করার জন্য জীবনানন্দ সকাতর আবেদন রেখেছিলেন প্রমথ চৌধুরী সমীপে। ‘সবুজ পত্র’ সম্পাদক পরিচ্ছন্ন ভাবে উপেক্ষা করেছিলেন তরুণ কবির অনুরোধ শরীর খারাপের অছিলায়। অবশ্য বিধিসম্মত সান্ত্বনাবাক্য ছিল যে, ‘একটু বৃষ্টি পড়লেই লেখায় হাত দেব।’ বলা বাহুল্য এমন বারিপতনের শব্দ প্রমথ চৌধুরী আমৃত্যু শুনতে পাননি। সহজীবীদের মধ্যে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত আলোচনা করলে জীবনানন্দ সবচেয়ে প্রীত হতেন। কিন্তু প্রসিদ্ধ ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটির মুদ্রণ ছাড়া সুধীন্দ্রনাথ জীবনানন্দের প্রতি তেমন কোনও সহৃদয়তা দেখাননি। অনুজ সমর সেন ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ আলোচনার সময় সাম্প্রতিক কবিদের প্রথম সারিতে তাঁকে জায়গা দিয়েও নিষ্ঠুর মন্তব্য করেন— “পৃথিবীর ক্ষান্তিহীন সংগ্রাম তাঁকে স্পর্শ করে না।”

কাব্যকৃতি: জীবনানন্দের ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’-এর প্রচ্ছদ।

তবু সামান্য তাচ্ছিল্য, বিদ্রুপ ও সুপরামর্শ সত্ত্বেও জীবনানন্দ সমাদৃত ছিলেন। তাঁর ম্লান হেমন্তসন্ধ্যার অবসাদ, জলতলের কলমিলতা ও ডাহুক, কেশবতী কন্যারা তাঁকে আড়ালে থাকার সুযোগ করে দিয়েছিল। লোকে তাঁকে নির্জনতার কবি ভাবত। তখনও তিনি নিঃসঙ্গ ও নিরাপদ ভাবে অরাজনৈতিক। কিন্তু গালিলেও মধ্যযুগের ইউরোপে যে দুঃসাহস দেখিয়ে দণ্ডিত হয়েছিলেন, বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে তেমনই ‘ব্ল্যাসফেমি’তে জড়িয়ে পড়লেন জীবনানন্দ। নিয়তির অমোঘ নির্দেশে ‘সাতটি তারার তিমির’ (১৯৪৮) এক হ্যাঁচকা টানে আমাদের সংস্কৃতির স্নিগ্ধ কুললক্ষ্মীকে রৌদ্রে, জনপরিসরে নগ্ন করে দিল।

‘গালিলেওর জীবন’ নাটকে বের্টোল্ট ব্রেখট এক জায়গায় লেখেন— “অনেক সময় আমি ভাবি যে সানন্দে ভূগর্ভের অতল তিমিরে বন্ধ থাকব। যদি পরিবর্তে জানতে পারি— আলো বলতে কি বোঝায়?” জীবনানন্দ আলো-অন্ধকারের স্তরান্তর মুছে ফেলে কতটা তিমির আলোর সহযাত্রী হতে পারে ভাবলেন গালিলেওর মতোই। আমরা আজ নিঃসঙ্কোচে বলতে পারি ‘সাতটি তারার তিমির’ রাত্রির উপনিষদ, যেখানে আলো-অন্ধকার রীতিসম্মত ভাবে ক্রমবিন্যস্ত নয়, সহ-বিন্যস্ত। মাথার ভিতরের এই বোধ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’তেও ছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থে এ রকম অভিসন্ধিমূলক দৃষ্টিপাত বাংলা কবিতার পক্ষে অনাস্বাদিতপূর্ব। এই যে জীবনানন্দ কবি ও গোয়েন্দাকে প্রায় সমগোত্রের প্রাণী ভাবলেন, বোদলেয়ারের ‘প্যারিস স্প্লিন’ ও লোরকার নিউ ইয়র্কের কবিতার বাইরে এমন দৃষ্টান্ত আর কোথায়?

সুতরাং জীবনানন্দের জন্য দণ্ডাজ্ঞা ঘোষিত হল। যদি শুধু সজনীকান্ত দাস বা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর মতো পরিহাসমদির বিদ্বজ্জন তিরস্কার বা তুলনা করতেন, বলার কিছু ছিল না। কিন্তু তাঁর গভীরতম অনুরাগী বুদ্ধদেব বসু ১৯৪৬ সালে জীবনানন্দ বিষয়ে অনাস্থা ব্যক্ত করলেন— “জীবনানন্দ দাশ আমাদের নির্জনতম স্বভাবের কবি... কিন্তু পাছে কেউ বলে তিনি এস্কেপিস্ট, কুখ্যাত আইভরি টাওয়ারের নির্লজ্জ অধিবাসী, সেই জন্য ইতিহাসের চেতনাকে তাঁর সাম্প্রতিক রচনার বিষয়ীভূত করে তিনি এইটেই প্রমাণ করবার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন যে তিনি ‘পেছিয়ে’ পড়েননি।” আর অশোক মিত্র (যিনি উত্তরকালে জীবনানন্দের ঋণ নিয়েই আত্ম-বিবরণী লিখবেন ‘আপিলা-চাপিলা’) আরও অব্যর্থ তির ছুড়লেন তিন বছর বাদে ‘কবিতা’ পত্রিকার পাতাতেই: “অনেক ক্ষেত্রেই এ গ্রন্থের কবিতা রূপ নিয়েছে নিছক দার্শনিকতায় এবং সে দর্শনও অবোধ্য। বুদ্ধদেব বসুর মতে, জীবনানন্দের আত্মস্খলনের কারণ তাঁর সাম্প্রতিক তৎকালপ্রবণতা।”

কাব্যকৃতি: জীবনানন্দের ‘সাতটি তারার তিমির’-এর প্রচ্ছদ।

বুদ্ধদেব বসু আদ্যন্ত রোমান্টিক বলেই উত্তর-‘বনলতা সেন’ জীবনানন্দকে বুঝতে অসফল হয়েছিলেন। জীবনানন্দ যে বুর্জোয়া সভ্যতার অন্দরমহলে গুপ্তঘাতকের মতো প্রবেশ করতে পারেন। রাত্রিতে তাঁর একাকী পর্যটন যে ‘ফ্যানটাসম্যাগোরিয়া’-কে শনাক্ত করার জন্যই, এ কথা বুদ্ধদেব বসু-সহ বাঙালি কাব্যরসিকদের গরিষ্ঠ অংশই বুঝতে পারেননি। আজও, তাঁদের দ্বিধা ও অনিশ্চয়তায়, বুঝতে পারেন না যে, ইতিহাস নিজে যাকে নির্বাচন করে সে, প্যারিস ও কলকাতায়, বোদলেয়ার ও জীবনানন্দের মতো: নির্মল, নিষ্পাপ ও মৃদু লিরিক লেখা তাঁর কাজ নয়। সৃষ্টির তীরে বা ‘সোনালি সিংহের গল্প’ কবিতার সীমা ছাড়িয়ে পতনোন্মুখ সভ্যতার এমন ধারাবিবরণী হয়ে ওঠে যে আমাদের সংস্কৃতিবেত্তারা তার নাগাল পান না চট করে। জার্মান পণ্ডিত ওয়াল্টার বেঞ্জামিন তাঁর ‘আরকেড প্রকল্প’-এ যেমন বুর্জোয়া সভ্যতায় এক জন কবির অবস্থান প্রসঙ্গে মন্তব্যের সময় বোদলেয়ারকে খেয়াল রাখেন, তেমন কোনও পরিসর বাংলা সাহিত্যে ছিল না। পরিতাপের কথা, চল্লিশের দশকের উত্থিত আধুনিকতা ও পুঁজিবাদী নগরায়ণের সঙ্গে শিল্পের কথোপকথন যে জীবনানন্দই অনেকটা নির্ধারণ করে দেন, আমরা তা বুঝতে চাইনি। অর্থাৎ কবিতার বৃত্তের বাইরে সাংস্কৃতিক প্রতিবেদন হিসেবে জীবনানন্দকে গ্রহণ করার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। যাঁরা শব্দশিল্পী হিসেবে জীবনানন্দের প্রতিরূপ নির্মাণ করেছেন, তাঁরা অনুমান করতে পারছেন না, জীবনানন্দ সময়ানুক্রমিক অবস্থানের জন্য আধুনিক নন। তাঁর রচনার মাধ্যমে এক ধরনের পরিকল্প আমাদের চেতনায় উপস্থিত হয়, যা দেখার পদ্ধতিটি পাল্টে দিতে চায়। প্রায় একই রকম ন্যাবা রোগ থেকে বামপন্থীরাও তাঁকে আঘাত হেনেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর আগের বছর ‘পরিচয়’ পত্রিকায় সুভাষ মুখোপাধ্যায় সদম্ভে লেখেন, “মিছিলকে তিনি ছত্রভঙ্গ করেন নির্জনতার নিঃসঙ্গ বিচ্ছিন্নতা দিয়ে। তাঁর কল্পনার স্বাধীনতা মানুষের হাতের শৃঙ্খলকে চিরস্থায়ী করে।... প্রাচীনকালের গৌড়ীয় শুঁড়িখানায় থাকত এক রকমের চিহ্ন। সেই চিহ্ন দেখে ভেতরে ঢুকতেন পানরসিকেরা। জীবনানন্দের কবিতার দুর্বোধ্য সঙ্কেত অনেকটা সেই চিহ্নের মতো।” প্রগতিমত্ত সুভাষ খেয়ালই করেননি যে, এমনকি পাটিগণিতের রাজনীতির হিসাবেও তাঁর পাণ্ডুলিপি আর তত ধূসর নয়, অন্ধকারের স্তন ও যোনি থেকে বেরিয়ে এসে জীবনানন্দ অনেক সময়ই চোখ রেখেছেন আলোকিত খবরের কাগজে।

তা হলে জীবনানন্দের বদলে যাওয়াটা কী রকম? শুধু গ্রাম থেকে শহরে আসার গল্প? জীবনানন্দ সিনেমার মতো দ্রুত অপস্রিয়মাণ ইমেজে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি আর নিবদ্ধদৃষ্টি থাকবেন না। ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থের ‘পথ হাঁটা’ কবিতা থেকে জীবনানন্দের লেখায় একটি নাগরিক পরিব্রাজনার চরিত্র তৈরি হল। এই চলমান পরিক্রমা যে ধরনের দৃষ্টি নির্মাণ করে, তাতে এক রকমের ‘রেটরিক অব ওয়াকিং’ বা পায়ে হাঁটার অলঙ্কারশাস্ত্র রচিত হয়। যে দর্শক নিজেকে ভিড়ের হৃদয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে, অথচ ভিড়কে নথিভুক্ত করে; আমাদের সমালোচনা তত্ত্ব তাকে ‘ফ্লান্যোর’ নামে চেনে। যেমন উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী প্যারিসে বোদলেয়ারের বিখ্যাত নৈশভ্রমণ আমাদের আধুনিকতার উপত্যকাটি স্পষ্ট করে দেয়, জীবনানন্দের পর্যটনব্রত তেমনই ইতিহাসচেতনা বিষয়ক ধারণা, যা অন্তর্বর্তীকালীন, ক্ষণপ্রভ ও আকস্মিক— এমন তাকানোকে সঙ্গী করে জীবনানন্দ এমন শহর দেখবেন, যা সমকালীন অ-পশ্চিমি দুনিয়ায় অপর কেউ দেখেননি। এই চল্লিশ দশকের কলকাতা তাঁর পক্ষে একটি ‘ইম্যাজিনড এনভায়রনমেন্ট’ বা বাস্তব-অতিরিক্ত পরিবেশ। আর এই চিন্তায়নের সাম্রাজ্যের জীবনানন্দ দাশ এক জন আদর্শ ফ্লান্যোর। এই ফ্লান্যোরি বা পথ-পরিক্রমার চরিত্র কেমন? বোদলেয়ার বা জীবনানন্দ জনপরিসরে প্রকাশ্য পরিবেশে নিজেকে আড়ালে রাখেন, কিন্তু কখনওই ধরণীর এক কোণে নিরালা অবকাশ খোঁজেন না। ‘হি ইজ় দ্য ম্যান হু ইজ় অনলি অ্যাট হোম এগজ়িসটেনশিয়ালি হোয়েন হি ইজ় নট অ্যাট হোম ফিজ়িক্যালি।’ জীবনানন্দ নিঃসঙ্গ পরিত্যক্ত হওয়ার ঝুঁকি নেন। তিনি জনতার এক জন, তবু জনতান্তর্গত নন। অর্থাৎ তিনি জনস্রোতের মধ্যে বা কোনও গোপনীয়তা থেকে একা ও নিরাসক্ত অবলোকনে অভ্যস্ত। বোদলেয়ার লেখেন, ‘দি ম্যান হু ইজ় আনএবল টু পিপল হিজ় সলিটিউড ইজ় ইকোয়ালি আনএবল টু বি অ্যালোন ইন আ বাসলিং ক্রাউড।’ জীবনানন্দের নির্জনতাও কোনও একাকিত্ব নয়, বরং চূড়ান্ত জনতাগভীর নির্জনতা। এই জন্যই হ্যারিসন রোডের গভীর অসুখ শুধু নির্ণয় করেন না, প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউসের মেসবাড়ি থেকে জানলার খড়খড়ি তুলে সযত্নে এই দেখাকে লিপিবদ্ধ করেন— “বিকেলের বারান্দার থেকে সব জীর্ণ নরনারী/ চেয়ে আছে পড়ন্ত রোদের পারে/ সূর্যের দিকে;/ খণ্ডহীন মণ্ডলের মতো বেলোয়ারি।” আধুনিক শিল্পী বিষয়ে তাঁর বিখ্যাত রচনায় বোদলেয়ার সেই ১৮৬০ সালেই লিখেছিলেন, “তিনি এই বিশাল শহরের নিসর্গচিত্রের দিকে তাকান— পাথরের নিসর্গকে আদর করে সরে যায় কুয়াশা, বিতরিত হয় সৌরকিরণ।” অলোকসামান্য কবি বলেই জীবনানন্দ প্রায় আশি বছর বাদে লেখেন: “শতাব্দীর শেষ হলে এ-রকম আবিষ্ট নিয়ম নেমে আসে।” বোদলেয়ারের ভূতগ্রস্ততাকেই বেঞ্জামিন অনুসরণ করেছিলেন। জীবনানন্দকে হায়! আমরা পয়ার ছাড়াতে দিইনি।

রাস্তায় যিনি ঘুরে বেড়াবেন তিনি দ্রষ্টা এই অর্থে যে, বিরাট শহরে তিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখে সর্বত্রগামী। কবি যদি ছদ্মবেশী ও অদৃশ্য না হয়ে যেতে পারেন, তবে তিনি অন্যকে দৃশ্য ভাবতে পারবেন না। এই যে পরস্পরবিরোধী ধারণা— ভিড় বিষয়ে আগ্রহ ও ভিড়ে রাজকীয় নির্লিপ্তি— বোদলেয়ার কবিকে স্ববিরোধিতার এই উত্তরাধিকার সমর্পণ করেছেন। বোদলেয়ারের প্যারিস কী ধরনের শহর? নিতান্ত ফরাসি রাজধানী নয়, বস্তুত সমগ্র মহাদেশের কেন্দ্রভূমি। সম্রাট ও সৈনিক, ভবঘুরে, লম্পট ও গণিকা ও নানা ধরনের আগন্তুক সমাবেশে উত্তর-শিল্পবিপ্লব সমাজে লুম্পেন প্রলেতারিয়েতের একটি নতুন প্রতিকৃতি রচিত হয়েছে, যা গতিশীল। শিকড়শূন্য এক জনসমাজ যারা গৃহস্থ নয়, যা সরাইখানায়, মদে, উকুনে, সর্বনাশে মজে আছে। এরাই নতুন সভ্যতার ষড়যন্ত্রী— গন্ধর্ব ও কিন্নর। মার্ক্স এদের কথা অসামান্য ভাবে লিখে গেছেন লুই বোনাপার্টের অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার রচনায়।

জীবনানন্দের চল্লিশের দশকের কলকাতার সঙ্গে উনিশ শতকীয় প্যারিসের কিছু সাদৃশ্য আছে। ‘এই শহর’ নামের এক ইংরেজি নিবন্ধে জীবনানন্দ লিখেছিলেন, ‘কিছু গুরুত্বপূর্ণ’ ফারাক সত্ত্বেও কলকাতা এবং প্যারিসের মধ্যে বেশ কিছু মিলও রয়েছে। ওই লেখাতেই স্থাপত্যের নৈরাজ্য সত্ত্বেও কলকাতাকে তাঁর ‘নট সো গ্রেসলেস’ বলে মনে হয়েছিল। যুদ্ধকালীন পরিবেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় নগরী হওয়ায় কিছু উজবুক ভাগ্যান্বেষী, কতিপয় সন্দেহভাজন অন্যদেশি, বেশ কিছু আমেরিকান সৈন্য, দোআঁশলা রমণী ও অনেক পল্লিবাসী এ শহরকে অন্য মাত্রায় কসমোপলিটান করে তুলেছিল, যা পূর্ববঙ্গের বরিশাল শহরের শ্যামলিমায় ছিল না। উপরন্তু বরিশালে তাঁর স্থায়ী আশ্রয় ছিল, গৃহ ছিল। কলকাতায় তাঁর আস্তানা কখনও উত্তরের মেসবাড়িতে, কখনও দক্ষিণের ভাড়াবাড়িতে। বোদলেয়ার হোটেলে থাকতেন ও নৈশভ্রমণে অভ্যস্ত ছিলেন। অন্য দিকে স্থায়ী ও নিরাপদ বৃত্তির অভাবে জীবনানন্দকে বেছে নিতে হয় উদ্দেশ্যহীন পথচলা। ফরাসি কবি জেরার্ড দু নেরভালের যা মনে হয়েছিল, জীবনানন্দের পথ হাঁটা সম্বন্ধে তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য— “যা আমার দরকার তা ঠিক নিঃসঙ্গতা নয় কিন্তু এলোমেলো হেঁটে বেড়ানোর স্বাধীনতা।” অসুখী দাম্পত্যজীবন তাঁর অন্দরের পরিসরকে দুর্বিষহ করে তোলে,ফলে তিনি অপরকে খুঁজে পান বাইরে। বন্ধুহীন, স্বজনহীন এই একাকী পথ হাঁটা শতাব্দীর স্মারক এক প্রাচ্যপন্থী ‘ফ্লান্যোরি’ যা সড়কের মানচিত্রকে টেনে নেয় ইতিহাসে।

জীবনানন্দ ‘পরিত্যক্ত ও উচ্ছিষ্ট’দের খুঁজে পাওয়ার জন্য বাঙালি ভদ্রলোকের থেকে দূরে ন্যাতাকুড়ুনি ও লোল নিগ্রোদের সমাবেশে যোগ দিলেন। রাজাবাজার, নিমতলা ও ফিয়ার্স লেনের রাত্রিতে যে অনিশ্চয়তার শাস্ত্র, তা বেঞ্জামিনের আরকেড প্রকল্পে ‘লিটারারি মন্তাজ’কে মনে পড়ায়। লোরকার ‘হার্লেমের রাজা’সদৃশ ক্রোধ ও চাপা গোঙানি তাতে নেই, কিন্তু ‘রাত্রি’ বা ‘সৃষ্টির তীরে’ জাতীয় অনশ্বর মন্ত্রাবলি পাঠ করলে দেখা যায়, নগরীর মহৎ রাত্রি জুড়ে সন্দেহভাজনদের ভিড়, প্রান্তিক চরিত্রদের বিন্যাস, আলোর আচ্ছন্ন তাপ ও দাঁড়িয়ে থাকা কবিতার চন্দনের বন তছনছ করে গোয়েন্দা কাহিনির মেজাজ এনে দিয়েছে। বেঞ্জামিন মার্ক্সের অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার থেকেই ইশারা পেয়ে প্যারিসের নিচুতলার মানুষজনের কথা লিখেছিলেন। প্যারিসে ভবঘুরে ও পেশাদার ষড়যন্ত্রকারীরা যে সমস্ত সরাইখানায় জমায়েত হত, সেখানে বোদলেয়ারের যাতায়াত ছিল। জীবনানন্দের কলকাতায় নরকের সরাইয়ের চায়ের কথাও পাওয়া যায়। হেমন্তের অনেক বেলাবেলি দিন তিনি চায়ের নির্দোষ ক্যান্টিনে শেষ করে দিতেন। আধুনিকীকরণের আগে ও পরে প্যারিসের প্রান্তে যে ভিক্ষুকদের বোদলেয়ার নথিভুক্ত করেছিলেন, জীবনানন্দের কবিতায় বাদুড়বাগানে বা আহিরীটোলায় তাদের নুলো হাত পাওয়া যায়।

“এইখানে সরোজিনী শুয়ে আছে; / জানি না সে এইখানে শুয়ে আছে কিনা।”

সম্ভাব্যতার এই নন্দনতত্ত্ব শুধু স্ববিরোধিতার অধিকারকেই মৌলিক করে তোলে না, কোয়ান্টাম বাস্তবের প্রতিও তর্জনী তোলে। আসলে কিন্তু সন্দেহভাজন ওই নারীর অতীত ও বর্তমান অবিচ্ছিন্ন নয়, রয়ে গেছে শূন্যতার একটি অবতল, যা প্রস্তাব ও তার সমালোচনা, জানা ও না-জানার অন্তর্বর্তী স্তর, যা আধুনিকতার গূঢ় প্রকল্প। কবির প্রতি শর্তহীন আনুগত্য ছুড়ে ফেলে বহুগামিনী সরোজিনী ক্রমেই কবিতার ঘাত-প্রতিঘাতে দাবি করেছে পাঠকের রতিমুখরতা। আমরা বড়জোর সালঙ্কারা এক জন রমণীকে চাইছিলাম, পরিণামে পেলাম মারাত্মক হাড়ের স্থাপত্য।

লোকপ্রিয় কাব্যের ঐতিহ্যে আস্থা হারিয়ে জীবনানন্দ দেখতে পাচ্ছিলেন যে, দীর্ঘ কবিতা ও শ্লেষে লিখিত মহাকবিতা আসতে চলেছে এবং বাংলা কবিতার আসন্ন ভবিষ্যতে নাট্যজাতীয় বাক্যের যে ব্যবহার হবে, তা সত্যত, ধর্মে মিশ্র, নন-লিনিয়ার ও পলিফোনিক। ‘শব থেকে উৎসারিত স্বর্ণের বিস্ময়’ যে চালু কাব্যভাষায় প্রকাশ করা যায় না, এই বিষয়ে তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন। যদি আমরা ‘সৃষ্টির তীরে’ নামক কবিতার প্রণয়প্রার্থী হই, তবে কী পাব? সসম্ভ্রমে আবিষ্কার করব পণ্ডিতরা যা আজ পর্যন্ত ধরতেই পারেননি। এই কবিতার আবরণ হয়তো পরাবাস্তবতা কিন্তু উৎসবিন্দু ১৮৮৮ সালের শরৎকালীন আর্লে শহরের গ্লাস দু ফোরামের ভ্যান গখের সেই বিখ্যাত নৈশ কাফের চিত্রটি। দূর আকাশের তারাদের স্বাভাবিক নৈসর্গিক মৃদু স্বচ্ছতা কুয়াশায় হরণ করেছে গ্যাসলাইট (জীবনানন্দের অনেক কবিতার যা রূপক হয়ে ফিরে আসে)। এই রাত্রি দিনের অধিক। লাল ও সবুজ রঙে ধরা পড়ে মানুষের মর্মন্তুদ বাসনা। ভ্যান গখের নৈশ কাফে ও জীবনানন্দের কবিতার শেষ বিকেলে যে অনির্বচনীয় ক্যান্টিন, তা প্রকাশিত হয়ে চলে ভ্যান গখের চিঠির ভাষায়— “এমন স্থান যেখানে কেউ নিজেকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে, কেউ পাগল হয়ে যেতে পারে, অপরাধ করতে পারে।” জীবনানন্দের ‘গণিকার বার’ বা সমস্ত নাগরিক বৃত্তান্ত অনুরূপ উন্মাদাশ্রম, জীবনানন্দ, আশ্চর্য ভ্যান গখের নাম পর্যন্ত করেননি। তিনি এক বার পল গগ্যাঁর দ্বিমাত্রিকতার দিকে তাকিয়েও ‘গগ্যাঁর চেয়ে গুরু হাত থেকে’ বলা মাত্রই আমরা বুঝি জীবনানন্দের বেদনা তাহিতি দ্বীপপুঞ্জে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য নয়, তিনি পার্থিব যন্ত্রণা ভোগ করবেন বলেই ভ্যান গখকে অধিকতর মর্যাদায় স্থাপন করেন। আর্লে শহরে ভ্যান গখ ও গগ্যাঁর ব্যর্থ বন্ধুত্ব এই কবিতায় যেন অনুঘটক, যেন ফুলকির মতো উড়ে আসে। শুধু এই একটি কবিতার জন্যই বাঙালি জন্ম সার্থক মনে হয়। ফ্যাসিবাদ-বিরোধিতা মুদ্রার এক পিঠ, এই কবিতা নরকের নৈরাজ্য দিয়ে সাজিয়ে তোলে জরায়ুর তিমির।

সবাই জানে যে, কবিরা প্রায়ই জানেন না যে তাঁরা কী বলছেন, তবু কী করে যে তাঁরা আসল কথা অন্যদের আগে বলে ফেলেন! কথাটা সুররিয়ালিস্টদের প্রমাণিত বন্ধু মনস্বী জাক লাকাঁ-র। জীবনানন্দ যে প্রত্যাখ্যাত ও অবান্তর হয়ে থাকা সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক আবহমণ্ডলের ঘনীভূত নিম্নচাপ, সমবেত রাজন্যবর্গের মধ্যে সবার আগে টের পেলেন, তাও বিস্ময়। কলকাতায় তাঁর রাত্রিযাপনের ইতিবৃত্ত কমিউনিস্ট ইস্তাহারের থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ দলিল নয় আধুনিকতার চরিত্র নির্ণয়ে। দু’টি বই-ই কৃশতনু। আর দু’টি সন্দর্ভই নশ্বর মানুষের জন্য অমরতার অন্তিম প্রসাধনশালা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন