স্মৃতিসাক্ষ্য: বর্তমানে রান্সউইক হাউস। ছবি: সোমনাথ ভট্টাচার্য।
বাংলাতে ভ্রমণবিলাসীদের জন্য অতি পরিচিত একটা শব্দ— দিপুদা। অর্থাৎ, দিঘা, পুরী আর দার্জিলিং। হাঁটি-হাঁটি পা-পা বাঙালি, যার হয়তো সবে ভ্রমণে হাতেখড়ি, এই তিনটে জায়গায় এক বার না এক বার সে গিয়েই থাকে। এর মধ্যে কলকাতার সবচেয়ে কাছে দিঘা, যার ইতিবৃত্তান্তও ভারী চিত্তাকর্ষক। এক বার মনে করা যাক সেই সব মানুষের কথা, যাঁদের হাত ধরে এক কালের জনহীন এই সমুদ্রসৈকত আজ বাঙালির অন্যতম জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট।
অষ্টাদশ শতকের আশির দশকের কথা। ব্রিটিশরা এ দেশে ঘাঁটি তৈরি করে ফেলেছে পুরোদমে। ব্রিটেন থেকে প্রতি জাহাজেই আগমন ঘটছে ব্রিটিশদের। তারা কলকাতায় নানা উচ্চপদে তো আসীন হচ্ছিলই, কিন্তু বিদেশি জল-হাওয়ায় অভ্যস্ত মানুষগুলোর এ দেশের জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে বেগও পেতে হচ্ছিল। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে নানা রোগ তাদের আক্রমণ করছিল। তাই খোঁজ পড়ছিল নিরিবিলি শৈলশহর কিংবা সমুদ্রতীরের। এই জায়গাগুলো ব্রিটিশরা ব্যবহার করত স্যানাটোরিয়াম হিসেবে। জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল শিমলা ও দার্জিলিং।
ভারতের প্রথম গভর্নর-জেনারেল ও ভাইসরয় ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। মিরজাফরকে সরিয়ে মিরকাশিম নবাব হওয়ার পর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মেদিনীপুর জেলা উপহার দিয়েছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। ১৭৬৩ সাল থেকে হেস্টিংস কলকাতা অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রধান হন। সেই সূত্রে তিনি বার বার বাংলা-ওড়িশা উপকূলীয় এলাকায় সফর করেছিলেন। সম্ভবত সেই সফরগুলোর কোনও একটায় নিরিবিলি সমুদ্রতীর সন্ধানের তাগিদে কাঁথির কাছে আবিষ্কার করেন এক মনোরম সমুদ্রসৈকত। চার পাশে ম্যানগ্রোভ অরণ্য দেখে ভালবেসে হেস্টিংস এই জায়গার নাম দেন ‘প্রাচ্যের ব্রাইটন’।
হেস্টিংস বীরকুলে তাঁর জন্য একটি বাংলো নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু হেস্টিংসের আমলের পর বীরকুল ক্রমে ক্রমে পরিত্যক্ত হতে থাকে। কলকাতা থেকে বীরকুল যাতায়াত ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তার উপর উপকূলবর্তী অঞ্চলে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়। হেস্টিংসের প্রাচ্যের ব্রাইটন আরও এক শতাব্দী জঙ্গলাকীর্ণ, পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকে।
উনিশ শতকের শেষ দিকে কলকাতায় আসেন সেই মানুষটি, যাঁর হাত ধরে দিঘা আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করে। তাঁর নাম জন স্নেথ। এক আদর্শ ব্রিটিশ, অভিজাত, প্রকৃতিপ্রেমী ব্যবসায়ী এবং সেকালের বিখ্যাত হ্যামিলটন জুয়েলারি কোম্পানির মালিক। তিনি প্রকৃতিপ্রেমী হওয়ার সুবাদে নানা নির্জন কিন্তু ভ্রমণোপযোগী জায়গার সন্ধানে থাকতেন। জুয়েলারি ব্যবসার সুবাদে কলকাতা, তথা বাংলার বেশির ভাগ সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত পরিবারের সঙ্গেই ছিল তাঁর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। তেমনই এক জন ছিলেন বালিশাহির জমিদার। তিনিই স্নেথকে কাঁথির কাছে বীরকুল সমুদ্রসৈকতের কথা জানান।
জানার পর কালবিলম্ব করলেন না স্নেথ। নতুন সমুদ্রসৈকত আবিষ্কারের উত্তেজনায় ১৯২১ সালে তিনি বেলদা হয়ে কাঁথি এসে হাতির পিঠে চড়ে বীরকুল গ্রামে পৌঁছন। তখনকার সমুদ্রতীর আজকের দিঘা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে ছিল। দিঘা প্রথম দর্শনেই স্নেথকে মুগ্ধ করেছিল। এই অকৃতদার, প্রকৃতিপ্রেমী ব্রিটিশ পুরুষ দিঘার প্রেমে পড়ে গেছিলেন। সেই প্রেম এতই গভীর যে, তিনি দিঘায় স্থায়ী বাসস্থান নির্মাণের কথা ভাবেন। কলকাতা থেকে দিঘা যাতায়াতের জন্য তিনি কেনেন একটি দু’আসনের বিমান, যার প্রপেলার আজও সংরক্ষিত আছে দিঘায়, স্নেথের বাসভবনে। সরকার তাঁর জন্য সাড়ে এগারো একর জমি বরাদ্দ করে দিঘায়। স্থপতি এইচ এ ক্লয়-এর তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠে ‘রান্সউইক হাউস’। সমুদ্রপথে বাড়ি তৈরির জিনিসপত্র আনা হয়, ইট তৈরি করা হয় স্থানীয় ভাবে।
জন স্নেথ-এর সমাধি। ছবি: সোমনাথ ভট্টাচার্য।
প্রেমিক স্নেথ তাঁর প্রেমিকাকে আপন করে নিতে দিঘাতেই স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। গয়নার ব্যবসার দায়িত্ব তুলে দেন ভাইপো চার্লস অ্যান্ড্রু ফ্ল্যানিগানের হাতে। নিজে দিঘায় বসান জেনারেটর, সাজিয়ে তোলেন ‘রান্সউইক হাউস’, চাষবাস শুরু হয় দিঘায়।
ফ্ল্যানিগান প্রতি সপ্তাহে বেহালা ফ্লাইং ক্লাব থেকে বিমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস দিঘায় নিয়ে আসতেন। ব্রিটিশ আভিজাত্য ভোলেননি স্নেথ, আর তাই ক্রমে ক্রমে তাঁর দিঘার বাংলো হয়ে ওঠে অতিথি-আপ্যায়নের অন্যতম কেন্দ্র। ক্রমশ স্নেথ মন দিলেন দিঘা শহরকে ঢেলে সাজানোয় এবং তাকে এক সহজলভ্য ভারতীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দিকে। কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনে ব্যস্ত ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৭-এর আগে এই বিষয়ে আর আগ্রহ দেখায়নি।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর স্নেথের উদ্যোগ সাফল্যের মুখ দেখে। আর তাঁকে সর্বতোভাবে সহায়তা করেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়। ধীরে ধীরে দিঘায় তৈরী হয় চিপ ক্যান্টিন, বে-কাফেটেরিয়া, সারদা বোর্ডিং ও সরকারি পর্যটন আবাস। ষাটের দশক থেকে দিঘা পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।
অন্য দিকে স্নেথের বয়স বাড়ছিল। বেশির ভাগ ব্রিটিশ তত দিনে ভারত ছেড়ে ফিরে গেছেন তাঁদের জন্মভূমিতে। কিন্তু স্নেথ অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে পড়েছেন এই দিঘার সঙ্গে। ছেড়ে যাওয়ার কথা তো ভাবতেই পারেন না, বরং মৃত্যুর পরও এই প্রেমিকার বুকেই যেন তাঁর শেষশয্যা রচিত হয়, এই ছিল তাঁর ইচ্ছে। বাংলোর এক কোণে, যেখানে প্রতিদিন প্রথম সূর্যরশ্মি পড়ত, সেখানেই শেষ বিশ্রামের ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি।
১৯৬৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন স্নেথ। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভাইপো ফ্ল্যানিগান ছিলেন রান্সউইক হাউস দেখাশোনা করার দায়িত্বে। সত্তরের দশকে তিনি ভারত ছেড়ে ফিরে যান ইংল্যান্ডে। যাওয়ার আগে এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে রান্সউইক হাউস রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদকে বিক্রি করে দেন তিনি।
আজ জন স্নেথ বিস্মৃতপ্রায়। অবহেলায়, লোকচক্ষুর অন্তরালে, নির্জনতায় তাঁর শেষ শয্যা রয়ে গেছে, আজও সূর্যের প্রথম রশ্মি ছুঁয়ে যায় সেই স্থানটি। তবু যত দিন দিঘা থাকবে, তত দিন দিঘার সমুদ্রতটে প্রতিটি ঢেউয়ের ছোঁয়ায় লেখা হবে জন স্নেথের নাম। দিঘার রূপকার থেকে যাবেন তাঁর প্রাণপ্রিয় সমুদ্রের সোনালি বেলাভূমিতে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে