Kolkata Book Fair 2026

বইয়ের মেলা, মনের মেলা

বইমেলা মানেই মেলা বই। বহু বইসন্ধানীর মিলনক্ষেত্রও। অজস্র অসংখ্য বই দেখা, ইচ্ছে-তালিকায় তুলে রাখা এবং নিজের বহুকাঙ্ক্ষিত, প্রিয় কোনও বই হাতে পেয়ে এক অপার্থিব ভাল লাগায় ডুবে যাওয়া— বইমেলা সেই অনাবিল তৃপ্তির আনন্দনিকেতন।

রাতুল বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৫
Share:

বইয়ের জগৎটা বেশ রোমাঞ্চকর। এক কালে শ্রুতি-স্মৃতির কালে মানুষ শুনে শুনে মনে রাখত আর তা বলে বলে অন্যকে শোনাত, সেভাবেই প্রবাহিত হয়ে চলত মানুষের সারস্বত সাধনা। ধ্রুপদী কিংবা লোকসাহিত্য— দু’ধারাতেই প্রচলিত ছিল মৌখিক সাহিত্য বা ওরাল লিটারেচারের ধারা। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তখন সাহিত্যের প্রচারের পরিধি ছিল সীমিত। কোনও লিখিত রূপ না থাকার জন্য সেগুলি লোকমুখে পরিবর্তিত হতে থাকত। এই কারণেই সেগুলির মান্য পাঠ নির্ণয় করা কঠিন। আমরা যদি আমাদের দু’টি মহাকাব্যের দিকে তাকাই তা হলেই এই সমস্যাটার কথা বুঝতে পারব। একই রামায়ণের কত রকম পাঠ। সেরকম ভাবেই আমাদের প্রাচীন লোকসাহিত্য রূপকথাগুলোরও অঞ্চলভেদে নানা রকমের পাঠ আমরা দেখতে পাই।

হাতে লেখা পুঁথি আসায় এই সীমাবদ্ধতা কিংবা পাঠবিভ্রাট কিছুটা কমল। আমরা সবাই জানি, হাতে লেখা পুঁথিরও সীমাবদ্ধতা ছিল। ছাপাখানা এসে মানুষের সারস্বত-চর্চার জগৎটাকে আমূল বদলে দিল। লেখক তাঁর চিন্তার বিষয়কে একযোগে অনেকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারলেন মুদ্রিত বইয়ের মাধ্যমে। মুদ্রিত বইয়ের প্রচার আর প্রসারের তাগিদ থেকেই এগুলির বিক্রির ব্যবস্থা, এবং তার হাত ধরেই আধুনিক কালের বিপণনের মাধ্যম মেলা এল। বইমেলা লেখক পাঠক আর প্রকাশক বা বিক্রেতার ত্রিবেণিসঙ্গম।

শুরুর সেদিন

আমাদের কলকাতা বইমেলাও তার ব্যতিক্রম নয়। ১৯৭৬ সালে কিছু প্রকাশক ভাবনা-চিন্তা করেছিলেন, আমরা সংগঠিত ভাবে একটি বইমেলা করলে কেমন হয়। যেখানে আমরা আমাদের বই নিয়ে সাময়িক দোকান সাজাব; পাঠকরা আসবেন, আসবেন লেখকরাও— যেখানে এঁদের মধ্যে একটা সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। অর্থাৎ ‘ডিরেক্ট কমিউনিকেশন’। কী ভাবে এল এই ভাবনাটা, এ প্রসঙ্গে একদা এম সি সরকার-এর কর্ণধার সুপ্রিয় সরকার তাঁর ‘প্রকাশকের ডায়েরি’তে লিখেছেন, “দৈনন্দিন জীবনের মতো প্রকাশনা জগতেও সমস্যা লেগেই আছে। সবচেয়ে প্রবল সমস্যা— বিপণন। ১৯৭৫ সালে কয়েক জন প্রকাশক এক জায়গায় মিলিত হলেন সমস্যাগুলি সম্বন্ধে আলোচনা ও তার কিছু প্রতিকারের উপায় নির্ধারণ করার উদ্দেশ্যে। জন্ম হল ‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড’-এর যাঁরা ‘কলিকাতা পুস্তক মেলা’ পরিচালনা করেন। আমিও তার একজন শরিক। অনেক আলোচনা তর্ক-বিতর্কের পর সবাই মিলে সাব্যস্ত করলেন বইমেলা করা হবে। ১৯৭৬ সালের মার্চের গোড়ার দিকে ময়দানে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের গা ঘেঁষে ‘কলিকাতা পুস্তক মেলা’ শুরু হল। এই মেলার চরিত্র সম্পূর্ণ নিজস্ব, বিদেশি মেলার সঙ্গে এর কোনও মিল নেই শুধু আইডিয়াটি ছাড়া। অপ্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া গেল জনসাধারণের কাছ থেকে। এই মেলায় মিলিত হলেন প্রকাশক, লেখক ও পাঠকেরা। এই প্রথম মুখোমুখি হলেন তিন সম্প্রদায়। প্রকাশকরা বুঝতে আরম্ভ করলেন, যে-বই তাঁরা প্রকাশ করেছেন কিংবা করছেন, তা পাঠকদের কাছে গ্রহণীয় কিনা এবং পাঠকদের চাহিদারও একটা আভাস পেলেন। আর লেখকরাও পেলেন পাঠকদের রুচির একটা ছবি। একটা নতুন যোগাযোগ সৃষ্টি হল। প্রকাশকেরা লাভবান হলেন প্রচুর বই বিক্রি করে। বোঝা গেল পাঠকদের সামনে বই তুলে ধরলে বিক্রি হয়।”

‘মিত্র ও ঘোষ’ এর সবিতেন্দ্রনাথ রায় বা ভানুবাবুও ১৯৯৭ সালে বইমেলার সময় আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর একটি লেখায় একই রকম ভাবনার কথা বলেছেন, “১৯৭৫ সালে একাদেমি অফ ফাইন আর্টসে এন বি টির মেলার সাফল্য, এখানকার প্রকাশকদের উৎসাহিত করেছিল একটি পুরোদস্তুর বইমেলা করার। এর পরই প্রকাশকদের সংঘবদ্ধ সংগঠন পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের উদ্যোগে ১৯৭৬ সালের ৩ মার্চ থেকে বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের উল্টো দিকের ময়দানে কলিকাতা পুস্তকমেলারসূচনা হয়।”

এর পর অবশ্য বইমেলা এক জায়গায় থাকেনি। কলকাতা ময়দান, পার্ক স্ট্রিট, মাঝে সল্ট লেক স্টেডিয়াম, মিলনমেলা প্রাঙ্গণ হয়ে এখন করুণাময়ীর মেলা প্রাঙ্গণে থিতু হয়েছে। এক সময় পার্ক সার্কাস ময়দানের কথাও ভাবা হয়েছিল, কিন্তু পরে তা বাতিল হয়। কলকাতা বইমেলার এই স্থানবদল বা পরিক্রমণ পথ জুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা তর্ক-বিতর্ক, নানা সংশয়। সে অবশ্য বঙ্গ-সংস্কৃতির অঙ্গ। তবে এই পরিক্রমণ বইমেলার জনপ্রিয়তাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারেনি।

বই চাই গো! বই চাই!

কলকাতা বইমেলার সূত্রপাত বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বইমেলাকে কেন্দ্র করেই কলকাতা তথা বাঙালির জীবনে একটা উন্মাদনা এল, যে-কারণে অনেকে একে বই-পার্বণও বলতে শুরু করলেন, যেমন বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ! এই মেলাকে উপলক্ষ করেই প্রকাশকরা বই প্রকাশ করা শুরু করলেন। আগে মূলত পয়লা বৈশাখেই প্রকাশকরা বই প্রকাশ করতেন, কিন্তু বইমেলা প্রকাশনার সময়ের সে অভিমুখ ঘুরিয়ে দিল। বইমেলাকে প্রকাশকেরা বই প্রকাশের আদর্শ সময় বলে বেছে নিলেন। অনেক বইতে প্রথম প্রকাশের কাল হিসেবেও কোনও মাস নয়, বইমেলা এত সাল বলে উল্লেখ দেখা যায়, এটাও এক অর্থে অভিনব বইকি। এর পাশাপাশি শুরু হল গ্রন্থপ্রকাশ অনুষ্ঠান, গ্রন্থপাঠ, কবিতা পাঠ, বই নিয়ে সেমিনার ইত্যাদি। এক কথায় বইয়ের বিপণন-ব্যবস্থাপনার এই উদ্যোগ বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠল। প্রকাশকরা উন্মুখ হয়ে থাকলেন, লেখক, পাঠকরাও উন্মুখ হয়ে থাকলেন বাৎসরিক এই মেলার জন্য।

ছবি: অমিতাভ চন্দ্র।

একটা সময় বেশ কিছুকাল হয়েছিল ‘বইয়ের জন্য হাঁটুন’ নামে একটি পদযাত্রা। বিপুল উৎসাহ ও সাড়া পাওয়া গিয়েছিল এই পদযাত্রায়। বহু মানুষ, ছাত্রছাত্রী এতে অংশগ্রহণ করত বই নিয়ে নানা রকম স্লোগান লেখা পোস্টার হাতে। সেই রকম একটি পোস্টারের জন্য আনন্দ পাবলিশার্সের বাদলবাবুর অনুরোধে স্লোগান লিখে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়, যা বাদলবাবু তাঁর ‘পিওন থেকে প্রকাশক’ বইতে উল্লেখ করেছেন— ‘বই কিনবই!/ বই পড়বই!/ বই কেনা/ চাই বৈকি!’ এ সবই আজ ইতিহাস! রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা প্রতিবাদের পদযাত্রা বাদে বই নিয়ে এই রকম পদযাত্রা সত্যিই দুর্লভ।

বইমেলার ইতিহাসে আগুন লেগে মেলার অনেকাংশ ভস্মীভূত হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি আজও চোখে জল এনে দেয়। দিনটি ছিল ১৯৯৭-এর ৩ ফেব্রুয়ারি। লক্ষ লক্ষ বই সেদিন আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হয়েছিল সকলকে সেই মর্মান্তিক দৃশ্য। দু’দিনের মধ্যেই সরকারের সহযোগিতায় পুনর্বার মেলা চালু হয়, কিন্তু সেই দিনটি আমাদের বইমেলার জীবনে গভীর কালো ছায়া ফেলে রেখেছে। এর পরেই মনে আছে কবি জয় গোস্বামী একটি কবিতা লিখেছিলেন, স্মৃতি থেকে যতটা মনে পড়ছে, ভুল হলে মার্জনা করবেন— ‘এখানে বসেছিল মেলা/ এখানে বসেছিল হাট/ চোখের পলকে সব শেষ/ পড়ে আছে অঙ্গারের মাঠ।’ পরে কবিতাটার খোঁজ করেছিলাম, কিন্তু কবির কাছেও এর কোনও কপি নেই। আগে খাবার স্টলগুলো চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকত। যত্রতত্র আগুন জ্বালিয়ে খাবারদাবার তৈরি হত। ক্রমশ সেই ব্যাপারগুলোতে বিধিনিষেধ আরোপ করে কিছুটা সংহত করা হয়েছে।

এ ছাড়া ১৯৮৩ সালে বইমেলায় ‘যাযাবর অমনিবাস’ এর প্রথম প্রকাশ অনুষ্ঠানের সময়, মঞ্চে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখার সময় আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক অশোককুমার সরকারের অসুস্থ হয়ে পড়ে প্রয়াত হওয়ার ঘটনাও ছিল অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

বইমেলা— ঘরে ঘরে দ্বারে দ্বারে

কলকাতা বইমেলার সাফল্য আরও অনেক বইমেলাকে সম্ভব করে তুলেছে। এরই কাছাকাছি সময়ে শুরু হয় বর্ধমানের অভিযান গোষ্ঠীর বইমেলা, আসানসোল বইমেলা— প্রাচীনত্ব এবং জনপ্রিয়তার নিরিখে এগুলিও কম নয়। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলা বা অঞ্চলভিত্তিক বইমেলাগুলোকেও কলকাতা বইমেলার উত্তরসূরি বলা হয়তো অসঙ্গত হবে না। এক সময় সরকারি উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গ গ্রন্থমেলা বলে আরও একটি মেলা কলকাতাতেই হত। রাজ্য সরকারের সাহায্যপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারগুলো এই মেলা থেকে বই কিনত। কিন্তু তা কলিকাতা পুস্তক মেলার পাশে এত ম্রিয়মাণ ছিল, যে তা কালক্রমে উঠেই গেল।

কলকাতা বইমেলার এই জনপ্রিয়তা এটাকে একটা বড়সড় মেলার চেহারা দিল বটে, কিন্তু সেখানে বই-বহির্ভূত জিনিসের সমাগম বাড়তে থাকল। যা আনন্দদানের বদলে পীড়াদায়ক হল। কেননা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিবাদের, ধর্মপ্রচার, রাজনৈতিক দলের প্রচারস্থান হিসেবেও এই মেলা প্রাঙ্গণকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এর অবশ্য একটা দুর্দমনীয় কারণ হল, এ সব কিছুর সঙ্গেই বই কোনও না কোনও ভাবে যুক্ত। ইদানীং ডিজিটাল মিডিয়া, ব্যাঙ্ক, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, জুয়েলার্স, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, গুঁড়ো মশলা সবাইকে এক প্রাঙ্গণে পাওয়া যায়, সেই অমোঘ যুক্তিতে যে, সব কিছুর সঙ্গেই আছে বই। আর আছে কিছু দূর বাদে বাদেই আপনার কর্ণকুহরকে নন্দিত করে বিভিন্ন প্রচারকেন্দ্রিক মাধ্যমের চিল চিৎকার!

পথে পথে খাবার ছড়ানো...

একই ভাবে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে বইমেলায় ক্ষুন্নিবৃত্তির আয়োজনও। খালি পেটে যেমন ধর্ম হয় না তেমনি শিক্ষা-সংস্কৃতিও হয় না। কাজেই যাঁরা পদব্রজে স্টল ঘুরে ঘুরে বই কিনবেন, তাঁদের তো খিদে পাবেই। আর খিদে পেলে শুধু মুড়ি-বাতাসা দিয়ে তো পেট ভরবে না। ফলে ঠান্ডা পানীয়রা, চা-কফিরা, চপ-কাটলেটরা ক্রমান্বয়ে এসে বইয়ের দু’ধারে থেকে বইয়ের মূল বডিটাকে ধরে রাখা পুস্তানির মতো ঘিরে ফেলতে লাগল।

কালপরম্পরায় সেগুলো বইমেলার আদিযুগের তাকে তাকে সজ্জিত ধূলিলাঞ্ছিত ঢাকাই পরোটা, পাপড়ি চাটকে পিছে ফেলে একালের রসনা-রোচক চাউমিন, মোমো, সর্বোপরি বিরিয়ানি সহযোগে বইমেলার ইন্টারন্যাশনালিটির সঙ্গে সঙ্গে তা কন্টিনেন্টাল রসনারঞ্জনে মেলায় আগত পাঠককে আপ্যায়িত করতে থাকল। যা-ই পড়ি, যা-ই খাই, কিংবা যা-ই পরি, আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠাটা খুব জরুরি! বইমেলার এই পরিসরে ভোজের আয়োজনে ‘পাঠ্যং মধুরম্’ করে তোলার জন্য এসে গেল নামীদামি মিষ্টি। শীতের বইবাসরে পিঠেপুলি তো কবেই এসে গেছে, তাতে বাদ পড়ল না নবদ্বীপের ক্ষীর দইও। কিছু নিন্দুক বলতে থাকলেন, বইমেলায় বইয়ের থেকে খাবারের আয়োজন বেশি। অনেকে নাকি বইমেলায় ঘুরে ফিরে খেয়ে চলে যান, বই-ই কেনেন না। কেউ বলেন বই কিনব কী করে? কী দাম বইয়ের! এক খেঁকুড়ে বইওয়ালা উত্তর দেন, ‘এক কাপ কোফি খাইতে পারেন দ্যাড়শো ট্যাকা দিয়া, বই কেনতে গ্যালে জত্ত জ্বালা!’

আমার বেশ মনে পড়ে, প্রথম দিককার বইমেলায় বাইরে থেকে চা-ওয়ালারা হাতে থলিতে চা নিয়ে ঢুকতেন। অন্যান্য খাবারও আসত। আস্তে আস্তে সেগুলো বন্ধ হল। খুব স্বাভাবিক ভাবেই যারা ভিতরে খাবার স্টল দিয়েছেন, অনেক পয়সা খরচ করে, তাঁরা কেন মেনে নেবেন? তবে আমরা, যাদের বইমেলা শুরুর বেশ কিছু দিন আগে থেকেই মাঠে পড়ে থাকতে হয় স্টল তৈরির কাজে, তাঁদের এখনও এই সব বাইরে থেকে আসা তীব্র চিনি আর পাউডার দুধের ঈষৎ পোড়া গন্ধ-যুক্ত চা, মুড়িই প্রধান ভরসা।

তবে মাঘের স্তিমিত তাপিত সূর্যের আলোকে গা ভাসিয়ে বইমেলায় বেশ একটা পিকনিক-পিকনিক ভাব এসে যায়। বই কেনার পাশাপাশি খাবার কিনে এক জায়গায় বসে খানাপিনার ছবিটা বেশ লাগে।

অযাচিত ভ্রান্তিবিলাস

হ্যাঁ, এটাও আমাদের কলকাতা বইমেলার বৈশিষ্ট্য। দলে দলে মানুষ আসছেন, বই কিনছেন, দেদার খাচ্ছেন, ছোটরা বেলুন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বাঁশি বাজাচ্ছে, বেশ একটা কার্নিভ্যাল-কার্নিভ্যাল চেহারা। তার মধ্যেই এক উদাসী পাঠক স্টলের সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চায়ের কাপ হাতে শাড়ি সামলাতে সামলাতে চলা কোনও তরুণীর সঙ্গে বেমক্কা ধাক্কা খেয়ে ‘স্যরি’র বন্যা বইয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন, কিংবা মাঠের গর্তে বা ভুঁইফোঁড় কোনও বস্তুতে হোঁচট খেয়ে টাল সামলাতে সামলাতে অনির্দিষ্ট কারও বাপান্ত করছেন। আজকাল অবশ্য পাকা রাস্তায় এই উচাটনের ব্যাপারটা খুব একটা ঘটে না। তবে অন্য স্ত্রীর পাণিধারণ বইমেলায় খুব কমন ব্যাপার! স্বামী আর স্ত্রী দু’জনে মিলে স্টলে বই দেখছেন, স্ত্রী কখন ফস করে পাশে সরে গেছেন, স্বামী খেয়ালই করেননি, বই দেখে চলেছেন আপনমনে। হঠাৎ কী একটা খুঁজে পেয়ে আর্কিমিডিসের মতো উৎসাহে ‘হ্যাঁ গো’ বলে যার হাত ধরলেন, তিনি অন্য স্ত্রীলোক! ‘কী লজ্জা! কী লজ্জা’ মুখ করে তখন সত্যিই নিজের স্ত্রীর প্রতি বিরক্ত ভদ্রলোক! আর সেই মহিলার পাশে দাঁড়িয়ে কটমট করে তাকিয়ে তাঁর ‘হ্যাচ বোল্ট’!

এটা অবশ্য বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও হয়, বই দেখতে দেখতে বেখেয়ালে ‘মা এই বইটা কিনি না,’ বলে হাত ধরল অন্য মায়ের! তখন আবার সেই মায়ের বাচ্চা ভীষণ বিরক্ত! বইমেলার মাঠে এরকম ভ্রান্তিবিলাস চলতেই থাকে! সম্পর্কের বেড়াজাল ছিন্ন করা এই অযাচিত ভ্রান্তিকে ভ্রান্তিবিলাস ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়! বইয়ের টাকা দিয়ে বই না নিয়ে চলে যাওয়া কিংবা অন্যের বইয়ের প্যাকেট নিয়ে চলে যাওয়া, বইয়ের স্টলে মানি ব্যাগ, ব্যাগ, বিশেষ করে ব্যাঙ্কের কার্ড ফেলে যাওয়ার ঘটনা তো ভূরি ভূরি!

বহুযুগের ওপার হতে

এরই পাশাপাশি যখন দেখা হয়ে যায় কলেজ-জীবনের কোনও বন্ধু বা বান্ধবীর সঙ্গে, ‘ভুলে যাওয়া কুহেলিকার অন্তরাল’ ভেদ করে যাকে পড়েছে মনে… সে এক অনির্বচনীয় অবস্থা! আশা করি যাঁরা বছরের পর বছর ধরে বইমেলা যান, তাঁদের সকলেরই এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি এই রকম ভাবেই ত্রিশ বছর পর খুঁজে পেয়েছিলাম আমার স্কুলে পাশাপাশি বসা বন্ধুকে, যে বর্তমানে মস্কো প্রবাসী, এই বইমেলার সূত্র ধরেই। আবার কিছু কিছু বইমেলার বন্ধুও হয়ে যায়, যারা শুধু বইমেলাতেই মিলিত হন। সারা বছর হয়তো আর দেখাসাক্ষাৎ হয় না। আমরা যারা বই বেচি, আমাদেরও এমন অনেক দেশ-বিদেশের পাঠক বন্ধু হন, যাঁদের সঙ্গে শুধু বইমেলাতেই দেখা হয়! কী আশ্চর্য! আমরা বলি বই সবচেয়ে বড় বন্ধু, আবার বইও কী রকম করে বন্ধু জুটিয়ে দেয়।

বইয়ের ক্রেতারা খুব সহজেই বন্ধু হয়ে যান। তাই ব্যবসায়িক লেনদেন যা-ই থাকুক না কেন, বিজ়নেস টার্মস অনুযায়ী এঁদের কাস্টমার বলতে মন চায় না, আমরা বলি রিডার বা পাঠক। বিভিন্ন পাঠক বিভিন্ন রকম। অনেকেই বেশ পড়াশোনা করে খোঁজখবর করে বই কিনতে আসেন। অনেকে আবার কী ধরনের বই পড়তে চান জানিয়ে আমাদেরই বই বেছে দিতে বলেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের, তাঁরা অনেক সময়ই পরে বই পড়ে ফোন করেন কিংবা পরের বছর এসে বলেন কেমন লাগল। আমার জীবনে এরকম কয়েক জনকে পেয়েছি, যাঁরা পাঠক হিসেবেই এসেছিলেন, কিন্তু আলাপচারিতায় জেনেছিলাম তাঁদের নানা কাজকর্ম আর অভিজ্ঞতার কথা। সেগুলো শুনে মনে হয়েছিল, এই বিষয় নিয়েও তো বই হতে পারে। কয়েক জন তাতে সাড়া দিয়ে লিখেওছিলেন। আনন্দের কথা, সে রকম কোনও বই পুরস্কৃতও হয়েছিল পরে। এ জাতীয় অভিজ্ঞতা অন্যান্য প্রকাশনাকর্মীর জীবনেও হয়তো ঘটেছে।

তাই প্রথমেই বলেছিলাম বইয়ের জগৎটা খুব রোমাঞ্চকর, যার পরতে পরতে গল্প লুকিয়ে থাকে। তাই প্রকাশক, লেখক এবং পাঠক— এই সম্পর্কের রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। আজকাল এই সম্পর্কগুলোর মধ্যে মাঝে-মাঝেই বেসুর বাজছে। শুনতে পাই অনেক প্রকাশক লেখকের স্বত্বকে নানা ভাবে বিঘ্নিত করছেন, কিংবা গ্রন্থস্বত্বের আইনকে নিজের নিজের মতো ব্যাখ্যা করছেন। অনেক ক্ষেত্রে লেখক বা স্বত্বাধিকারীরা নিজেরাই আইনের জ্ঞানকে বিসর্জন দিয়ে নানাবিধ প্রকাশনাকে উৎসাহিত করছেন। গ্রন্থ প্রকাশনায় আইনের বাইরেও একটা বিষয় আছে, সেটা হল নৈতিক দায়িত্ব, সেটা সর্বত্র পালিত হচ্ছে না। এটা বর্তমানে বেশ চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যেক ব্যবসাতেই একটা গবেষণা ও উন্নয়নের ব্যবস্থা থাকে, যা ব্যবসাকে উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায়। বাংলা গ্রন্থ প্রকাশনাও সীমিত পরিসরে অসংগঠিত ভাবে নিজের নিজের মতো করে সেই রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্টের কাজ করেছে। কিন্তু আজ সেই ধারায় যেখানে জোয়ার আসার কথা ছিল, সেখানে ভাটা নজরে আসছে। এটা কাম্য নয়।

বই ও মনের দেওয়া-নেওয়া

বইমেলা তো শুধু বইমেলা নয়, মন-মেলাও! কত মন এসে মেলে এই বইমেলাতে। কত যুগের কত কালের কত মন এসে সন্নিবিষ্ট হয়েছে এই অঙ্গনে। তাঁদের সেই গোপন রাখা গভীর চলার মধ্য দিয়ে আমাদের চিন্তাচেতনার ধারাকে সচল রেখেছেন।

এ মেলা মন দেওয়া-নেওয়ার মেলাও বটে। কত প্রেমিক-প্রেমিকারা সেজেগুজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আমাদের অল্প বয়সে আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি, এর পরে আমাদের ছেলেপুলেরা নাতিনাতনিরা ঘুরে বেড়াচ্ছে বইমেলায় বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে, বইকে কেন্দ্র করে তাদের এই মনকে মেলে দেওয়ার ছবি— আমাদের যৌবনের কতশত স্মৃতি মনের প্যাঁটরা খুলে বেরিয়ে আসে। এক মুহূর্তের জন্যে ফিরে যাই সেই দিনগুলোয়, যখন আমরা বন্ধুরা দল বেঁধে মেলায় যেতাম আর প্রত্যেক দিন একটা করে বই কিনব বলে সঙ্কল্প করতাম। এ বইগুলো খুব কম দামেরও হত। মনে পড়ে, খুব হিড়িক ছিল বিশ্বভারতীর পঞ্চাশ পয়সা কিংবা এক টাকার ‘বিশ্ববিদ্যাসংগ্রহ গ্রন্থমালা’র বই কেনার, কিংবা আমাদের প্রিয় কবিদের অথবা কবিবন্ধুদের নতুন কবিতার বই কেনার।

স্মৃতিসরণির মণিমুক্তো

দু’টি ঘটনা বেশ মনে পড়ে। আশির দশকে কলকাতার নাট্য-সংস্কৃতিতে ব্রেখট একটা বিশেষ স্থান অধিকার করেছিলেন। সেই সময় আমরাও মেতে উঠেছিলাম ব্রেখট চর্চায়। কলকাতা বইমেলায় তখন স্ট্যান্ডার্ড লিটারেচার বেশ সাজানো-গোছানো স্টল করত। সেখানে চার খণ্ডের ব্রেখটের একটা ‘কালেক্টেড প্লেজ়’ এসেছে, কিন্তু তার দাম চারশো টাকা। সেটা আমার কাছে স্বপ্নের মতোই। অগত্যা বাবার শরণাপন্ন হলাম। এটাও জানালাম, বইটা ইএমআইতে কেনা যাবে। আমি আমার টিফিনের পয়সা থেকে যা শোধ করে দেব। বাবা দয়াপরবশ হয়ে আমাকে বইটি কিনে দিয়েছিলেন, ইএমআই-এর শরণাপন্ন হতে হয়নি।

আর এক বার বেশ একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল, আমাদের এক বন্ধু খুব সস্তায় একটা দামি বই হস্তগত করার আনন্দে তার বান্ধবীকে বইমেলাতেই আলিঙ্গনাবদ্ধ করে ফেলেছিল, সেই আশির দশকে মাঠে ঘাটে বাটে যেটা খুব একটা প্রচলিত ছিল না। আরও আশ্চর্যের, বইটি কোনও গল্প, উপন্যাস বা প্রবন্ধ নয়, দু’খণ্ডে প্রকাশিত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা অভিধান ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’। আরও আশ্চর্যের, বইটির দাম তখন ছিল মাত্র একশো টাকা, পাওয়া গিয়েছিল পঞ্চাশ টাকায়! আজ অনেক দামি দামি বই কিনি, অন্যকে উপহারও দিই, কিন্তু সেই আনন্দের দিন আর ফিরে পাই না।

এক বার আমরা কয়েক জন তরুণ-তরুণী মিলে ঠিক করেছি, বইমেলায় আমরা পুরোদস্তুর কবিতার একটা পত্রিকা বার করব। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তখন আমাদের ভাবনাচিন্তা লাগামছাড়া। ভাবছি এটা হবে বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকার মতো কিংবা ‘পোয়েট্রি’ ম্যাগাজ়িনের মতো। আজ ভাবতে ভাল লাগে, আমাদের সেই যৌবনের দিনগুলো মিথ্যে হয়ে যায়নি। আজও অনেক তরুণ-তরুণী দুরন্ত প্রাণবন্যার অদম্য উৎসাহে নতুন পত্রিকা বার করে আমাদের মতোই হাতখরচের পয়সা জমিয়ে। জানি, এক দিন হয়তো এই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাবে, জীবন-জীবিকার তাড়নায় সকলে ছিটকে যাবে যে যার কক্ষপথে, আর তার পর অবিরাম ঘূর্ণনের পারে পড়ে থাকবে আজকের যৌবনবাউলটি। তার পর কোনও এক বইমেলায় হঠাৎ দেখা হয়ে মনে করিয়ে দেবে সেই যৌবনবেদনারসে উচ্ছল দিনগুলোর কথা। এই কলকাতা বইমেলা কিন্তু এরকম অনেক ছোট ছোট স্বপ্নের জন্ম দিয়ে চলেছে।

সাজ-সংস্কৃতি

বইমেলা সংস্কৃতির বিশেষ বিশেষ সাজও কালে কালে অলিখিত ভাবে তৈরি হয়ে গেছে। মেয়েদের সুন্দর আঁচলওয়ালা তাঁতের শাড়ি, হাতে তৈরি পোড়ামাটি, ডোকরা, কাপড় কিংবা কাগজের গয়না, কপালে এক টাকার কয়েনের মতো বড় একখানা টিপ, সব মিলিয়ে বইমেলার একটা আলাদা ধরনের সাজ কিন্তু চোখে পড়ে। ছেলেদের মধ্যেও তার ব্যতিক্রম নেই। বিচিত্র ধরনের পাঞ্জাবি থেকে শুরু করে হাতে তৈরি পাগড়ি, টুপি, সুদৃশ্য ঝোলা, নানা কিছু চোখে পড়ে। সব মিলিয়ে এই বইমেলার নতুন নতুন এক একটা স্টাইল স্টেটমেন্ট তৈরি হয়ে যায়।

বই চুরি! চুরি কি?

বইমেলার কথা হবে অথচ বই চুরির প্রসঙ্গ আসবে না, এ হয় না। বই চুরি এবং বইচোরেরা এই মেলাকে মহিমান্বিত করে রেখেছে। সোনা নয়, রুপো নয়, টাকা নয়, পয়সা নয়, মলাট গ্রন্থিত কয়েকটি কালি মাখানো পাতা। একে ঠিক চুরি বলা যায় কি? এ নিয়ে পণ্ডিত-মহলে মতভেদ আছে। কারণ এই চৌর্যবৃত্তির মধ্যে যাঁরা জড়িত, দেখা গেছে, তাঁরা অনেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপণ্ডিত! আগে গুরুজনরা বলতেন, ‘পড়াশোনা করো, তোমার সব কিছু হরণ হলেও বিদ্যা হরণ করা যাবে না।’ কিন্তু এ তো আর বিমূর্ত নিরাবয়ব বিদ্যা নয়, একেবারে বাস্তব বই। সে তো চুরি হতেই পারে। তবে বইমেলায় বই চুরি একটা অন্য মাত্রা পেয়ে গেছে। এক দিকে হাজার চোখের নজর এড়িয়ে এই কর্মটি যেমন দুরূহ, তেমনই কষ্টসাধ্য। কারণ এটা তো বই, ছোট্ট মানি ব্যাগ নয়। বেশ বড়সড় একটা ব্যপারকে লোকচক্ষুর অন্তরাল করা! ব্যাপারটা কিন্তু খুব সোজা কাজ ভাববেন না। আর প্রত্যেক স্টলেই বেশ কিছু সতর্ক চোখের পাহারা থাকে, তারাও সেই মানবসমুদ্রের মধ্যে তস্কর-মুক্তোটিকে নিরন্তর খুঁজে চলেছে। এই চার চক্ষুর মিলন হয়ে যায় কদাচিৎ। হয়ে গেলে, অর্থাৎ চুরি ধরা পড়লে বেশ একটা কৌতুককর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। চারিদিকে কুতূহলী জনতার মাঝে সেই চৌর্যবৃত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তি কিছুটা অধোবদন হলেও খুব একটা কুণ্ঠিত হন বলে মনে হয় না।

এক বার এক যুবকের, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করেছেন, তাঁর ব্যাকপ্যাক থেকে বেশ ক’টা মোটাসোটা বই বেরোল। তিনি অম্লানবদনে বললেন, এই সব বই তাঁর কেনা। কিন্তু তাঁর কাছে কোনও ক্যাশমেমো নেই। কবে কোত্থেকে কেনা— এই সব নানা জিজ্ঞাসার উত্তরে তিনি অবশেষে স্বীকার করলেন যে, তিনি বইগুলি তাক থেকে নামিয়ে ব্যাগে ভরেছেন। এ অবশ্য সিসিটিভি-পূর্ব যুগের কথা। আজকাল আমাদের আনন্দ পাবলিশার্সের স্টলে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা থাকে, যার ফলে এ-জাতীয় ঘটনা (বা দুর্ঘটনা) কম হয়। তবে আমাদের স্টলের এই সিসিটিভি ফুটেজ অনেক সময় আরক্ষাকর্মীদের সাহায্য করে বইমেলায় আগত পকেটমারদের ধরতে।

যাকগে, যে কথা হচ্ছিল, বই চুরির কথা। যিনি ধরা পড়লেন, তাঁকে কী করা হবে? না না, পুলিশ-টুলিশ নৈব নৈব চ। তাকে ‘ওহে সুন্দর চোর’ বলে বন্দনা করে, যা বই সে তুলেছে (বইমেলায় বই চুরিকে ‘বই তোলা’ বলা হয়, অনেকটা ফুল তোলার মতো!) তাকে সব বই পুরো দামে কিনে নিতে বলা হয়, বইমেলার ছাড় তাকে দেওয়া হয় না। এর যুক্তি আছে। বইগুলো থেকে তাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে না। শুধু ছাড়ের সুবিধেটি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

বইমেলার চুরির ঘটনা লিখতে গিয়ে আমার বইওয়ালা জীবনের সেই অমূল্য অভিজ্ঞতাটার কথা মনে পড়ছে। এর আগেও সেই ঘটনার কথা লিখেছি, বলেওছি অনেককে। এক তরুণী বাজি ধরে আমাদের স্টল থেকে বই তুলেছিল এবং ধরা পড়েনি পাহারা থাকা সত্ত্বেও। আমি অবাক হয়েছিলাম তখন, যখন সে নিজে এসে আমাকে সেই ঘটনা বলেছিল, যে শুধুমাত্র বন্ধুদের সঙ্গে বাজি রেখে কাজটা করেছিল। আর মেলা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের অফিসে এসেছিল তার দাম মিটিয়ে দেওয়ার জন্য। আমি তার সৎসাহসের প্রশংসা না করে পারিনি, যে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে বই চুরি করেছে, আবার সৎ ভাবে তা স্বীকার করে তার দাম দিতে এসেছে! আজও অচেনা অজানা সেই মেয়েটি আমার বইওয়ালা জীবনে একটা দাগ রেখে গেছে।

কৃতজ্ঞতা: আনন্দবাজার পত্রিকা আর্কাইভ,আনন্দ পাবলিশার্স আর্কাইভ

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন