Insomnia

ঘুমগুলো সব গেল কোথায়

একটু ভাবলেই বোঝা যাবে, বড্ড বেশি জেগে আছি আমরা। যেটুকু ঘুমোচ্ছি সেটুকুর মানও সন্তোষজনক নয়। ওটিটি থ্রিলারের আর একটা পর্ব, কিংবা আরও কয়েকটা মজার রিল, অথবা অন্যের প্রোফাইলে উঁকিঝুকির অদম্য আগ্রহ ঘুমোতে দিচ্ছে না আমাদের। প্রাণায়াম, ধ্যান, ক্যামোমাইল চা— কিছুই কি কাজে আসবে না আর? এক দিন অনিদ্রা রোগই স্বাভাবিক হয়ে উঠবে? 

সপ্তর্ষি রায় বর্ধন

শেষ আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:২২
Share:

ঘুমের আয়াস বড় আয়াস!

‘ঘুম’ অতি স্পর্শকাতর বিষয়। শারীরবৃত্তীয় কারণে প্রাণিকুল নিদ্রামগ্নহয়, গাছগাছালিও এর ব্যতিক্রম নয়। রোগভোগের কালে অন্যতম হাকিমি নিদান ‘ঘুম’। সেই ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি ঘুমের থলে নিয়ে রেডি, ডাক দিলেই হল! স্কুলে পরীক্ষার আগে ঘুম নামত চোখ জুড়ে। অপক্ব বয়সে জুটেছিল গরম চা, ঘুম-তাড়ানিয়া পানীয়। তাতেও এক দিন ইমিউনিটি এসে গেল। নতুন দাওয়াই শিশি-ভরা হলুদরঙা শিরঃপীড়া হরণের মলম। ঢুলেছ কি আঙুলের ডগায় সে ভয়ঙ্কর জিনিস চোখে লাগাতে হত। মজার ব্যাপার, যে দিন পরীক্ষা শেষ, সে দিনই ঘুম ত্রিসীমানা থেকে উধাও!

ঘুমের ব্যাপারে অনেকের মতো শিব্রাম চকোত্তি কম যান না কিছু। ঘুম ছিল তাঁর বড় প্রিয়। মুক্তারামের (মুক্তারামবাবু স্ট্রিট) তক্তারামে (তক্তপোশ) শুয়ে কেটে যেত তাঁর দিনের একটা লম্বা সময়! ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’-র পাতায় তাঁর স্বীকারোক্তি, ‘সারা রাত ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এতো ক্লান্ত হয়ে পড়ি যে কহতব্য নয়’! এমনকি তারাপদ রায়, যাঁর লেখায় বঙ্গজীবনের সুখদুঃখের নানা নির্যাস পাওয়া যায়, তিনিও লিখেছেন, “ঘুমের মত এমন বেদনাহর, শান্তিদায়ক আর কিছুই নেই। রোগী-ভোগী, শিশু-বৃদ্ধ, সুখী-দুঃখী সকলেই ঘুম চায়… জীবনের সব দুঃখ, লাঞ্ছনা, যন্ত্রণা থেকে মৃত্যু মানুষকে চিরতরে পরিত্রাণ দেয়, তাই মৃত্যুর আর এক নাম চিরনিদ্রা। ঘুমও সাময়িক ভাবে মানুষকে দুশ্চিন্তা, দুঃখ, ক্লেশ থেকে রেহাই দেয়।”

‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’-র কাব্যিক অভিব্যক্তি বাদ দিলে আসলে এটা আমাদের আদি অকৃত্রিম এক অভ্যাস, যার কাছে আমাদের আশৈশব বশ্যতা। যার আলিঙ্গনে, প্রভাবে, আস্বাদনে দেহের ক্লান্তি মুক্তি। দিন-রাতের দৈনিক ছন্দ মেনে, বিছানা-বালিশের সোহাগে-আদরে ঘুমের কোলে ঢলে পড়াটাই দস্তুর ছিল এত দিন। দিনের পরিশ্রমের ও-পারে রাতের বিশ্রাম আসলে এক ভালবাসার প্রলেপ, সুখবিলাস, শরীরকে পুনরায় শক্তি জোগানোর রিচার্জ মেকানিজ়ম! ডাক্তারি মতে রোগীর ঘুমের অভাব বা অকালজাগরণ আসলে অন্য কোনও শারীরিক বা মানসিক সমস্যার কারণ। আর দীর্ঘ সময় ধরে তা চলতে থাকা মোটেই ভাল ব্যাপার নয়।

খবরে প্রকাশ, বিশ্বময় বিস্ময়কর ভাবে ঘুম কমে যাচ্ছে মানুষের জীবন থেকে। পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের চোখে ঘুম নেই, বা তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আবার ঘুমের পরিমাণ ভাল হলেও তার মান নাকি পড়ে যাচ্ছে সাঙ্ঘাতিক ভাবে! জীবনের নানা চাপে নাকি আমরা নিদ্রাহীন হয়ে পড়ছি। সাহেবদের এ রোগে আগেই ধরেছে। আমরা আমদানি করেছি বেশ কয়েক দশক পরে। জীবিকার চাপে আমাদের জীবন এখন রাত-দিন সাত দিনের রুটিনে বাঁধা। কল-সেন্টারের আধো আলো-ছায়ায় আধুনিক প্রজন্ম ‘গ্রেভইয়ার্ড শিফ্ট’-এ রাত জাগে, যাদের জন্য শরীরে এক অদৃশ্য চৌকিদার প্রহরে প্রহরে হাঁক দেয়, ‘জাগতে রহো’!

ডিজিটাল যুগে শোওয়ার ঘরের অন্দরেও ব্যস্ততা। মানসিক ক্লান্তির ধার সে ধারে না। ‘আয় ঘুম যায় ঘুম, দত্তপাড়া দিয়ে’ এই ঘুমপাড়ানি ছড়া বুঝি আজ ব্রাত্য। আসলে ঘুমের এখন অনেক বেশি সংখ্যক প্রতিদ্বন্দ্বী। ওয়েব সিরিজ়ের আর একটা এপিসোড, মোবাইলের পর্দায় আর এক বার স্ক্রলিং অথবা অন্য কারও জীবনে খানিক ভার্চুয়াল উঁকিঝুঁকি, না হলে টেক্সট মেসেজের একটা মৃদু বিপ আওয়াজ— এ সবই ঘুম-খেদানিয়া অনুঘটক। ‘প্রকৃত’ রাত বলে আজ আমাদের জীবনে কিছু নেই। টেলিভিশন বা মোবাইলের পর্দা বেয়ে আলো চুইয়ে নামে চোখে। আলোর ঝর্নাধারায় ভাসে শহরের রাজপথ, সে আলো অন্ধকার শুষে নেয়, শোওয়ার ঘরের কোণগুলোও বাদ যায় না। ঘুম, যা এক সময় অনায়াসে নামত চোখের পাতায় তার জন্য এখন ঘুমপাড়ানি সাধ্যসাধনা— মেলাটোনিন টোটকা, ক্যামোমাইল চা বা অক্সিজেন-মুখোশ। এক নিদ্রা-বিশারদ ভারী মজার কথা লিখেছেন সম্প্রতি, “স্লিপ ইজ় নাউ কিউরেটেড, স্টেজ ম্যানেজড, ফ্র্যাজাইল। ইট মাস্ট বি আর্নড, প্রিপেয়ার্ড ফর অ্যান্ড সাপোর্টেড বাই অ্যাকসেসরিজ়!” আধুনিক যুগে প্রকৃতিদত্ত ঘুমের হিসাব-নিকাশ কষে মুঠোফোনের অ্যাপস বা আঙুলে গলানো স্মার্ট-আংটি। কত ঘুম বা কেমন তার গতিপ্রকৃতি, সবই যন্তরের গলায় ঘোষিত হয়।

ঘুমের আর এক উপাদান হল উপাধান বা বালিশ। শিশুকাল থেকে দোলনায় বালিশের সঙ্গে সখ্য শুরু। তার পর বাল্য, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব, বার্ধক্য পেরিয়ে সে সখ্যের শেষ সেই শেষের দিনে। এর মাঝের পথটুকু স্নেহারামের পরশ গায়ে মেখে দিন-গুজরান এই শয্যাসঙ্গীর কোমল কোলে। হালে এক পাঁচ-তারকা হোটেলের ঘরে আবিষ্কার করেছিলাম একখানা ‘পিলো মেনু’! তার প্রথম পাতাতেই দলাই লামার উক্তি, ‘স্লিপ ইজ় দ্য বেস্ট মেডিটেশন’ এবং তার পরে কয়েকটা সাদা পাতা জুড়ে নানা ধরনের বালিশের বর্ণনা। সুখের কথা, একটা ‘বোলস্টার’ বা পাশবালিশের কথাও ছিল সেখানে। পাশবালিশের ব্যাপারে মোক্ষম স্ট্র্যাটেজি শাজাহান হোটেলের লিনেন ডিপার্টমেন্টের হেডবাবু নেত্যহরি ওরফে ন্যাটাহরির। সেখানে থাকতে-আসা সাহেবসুবোদের এমন নেশা ধরেছিল পাশবালিশের, সে নেশা নামা তো দূরে থাক, পাশবালিশের নামকরণও হল ‘ন্যাটাহরি পিলো’। পাশ বা কোলবালিশের যে মোহময়তা বাঙালিকে আবিষ্ট করে রেখেছে সেই কবে থেকে, তার পাশ কাটিয়ে, কোল ডিঙিয়ে যাওয়া ‘মুশকিল নেহি, নামুমকিন’! বালিশের মধ্যে যে আলসেমি আছে, হিন্দির ‘তাকিয়া’ বা ইংরেজির ‘পিলো’-তে তা নেই!

ঘুমের ব্যাপারে কোভিডকালে নানা রকম বাধাবিপত্তি এসেছে বলে শুনেছি লোকের মুখে। গৃহবন্দি জীবনে পরিশ্রম কম। তাই অল্প ঘুমিয়ে কাজ চলে যাচ্ছিল অনেকের। তার সঙ্গে আছে রাত জেগে সমাজমাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষার দায়, পিঠোপিঠি বায়োস্কোপ দেখার আকর্ষণ অথবা ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর তাড়নায় প্রয়োজনীয় কাজ সারা, যা-ই হোক, লোকজন দেরিতে ঘুমোতে যেত। হাড়ে-মজ্জায় দিনের ব্যস্ততাকে ধরে রেখে নিদ্রারহিত নিশিযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম আমাদের অনেকেই। ‘অ্যামেচার ইনসমনিয়াক’দের জন্ম হয়েছিল ঘরে ঘরে। শোনা যায় এই সময়ে নাকি তস্কর-মহলে ভারী অপ্রীতিকর এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। গৃহস্থের নিদ্রানাশা রাত্তিরের কথা ভেবে, দুশ্চিন্তায় তেনাদের দিবানিদ্রা উবে গেছিল।

এর মাঝেও কিছু ভাগ্যবান মানুষজন আছেন, যাঁদের কাছে ঘুম বশ্যতা স্বীকার করে। তাঁরা প্লেনে, ট্রেনে, বাসে, গাড়িতে, টোটোতে, অটোয় চান্স পেলেই ঘুমোন। বসে, দাঁড়িয়ে, অফিস-কাছারিতে, সিনেমাহলে, গানের জলসায়, সর্বত্র ঘুমিয়ে পড়তে পারেন তাঁরা। বছর দুয়েক আগে কলকাতার এক বিলাসবহুল মাল্টিপ্লেক্সে ‘ওপেনহাইমার’-এর মতো টানটান উত্তেজনা-ভরা সিনেমা দেখতে গিয়ে আমার পাশে বসা এক নিদ্রাতুর ছোকরাকে দেখে ভারী মায়া হয়েছিল। আহা বেচারা, কত খেটেখুটে এসেছে বুঝি! কিন্তু খানিক বাদে আড়মোড়া ভেঙে উঠে, এ দিক-ও দিক তাকিয়ে, সে আমার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে যখন শুধোল, “বইটায় একটা বোমা ফাটার ব্যাপার ছিল, সেটা কি অলরেডি ফেটে গেছে?” বুঝলাম, এ অন্য ধাতুতে গড়া!

আসলে ভাতঘুম বাঙালির এক বড় দুর্বলতা। পরশুরামের ‘বিরিঞ্চিবাবা’ গল্পে শ্যামনগরের বরদা মুখুজ্জের কথাই ধরা যাক। তিনি আড়াইটা থেকে সাড়ে চারটে পর্যন্ত ঘুমোতেন। ঘুম এলেও চেয়ার ছাড়তেন না। এক দিন লেজারে টিক দিতে দিতে যেই পাতার নীচে পৌঁছেছেন, ঘুম এল। নড়নচড়ন নেই, নাক ডাকা নেই, ঘাড় একটু ঝুঁকল না, লেজার টোটালের জায়গায় ঠিক কলমটি ধরা আছে, দূর থেকে দেখলে কে বলবে খুড়ো ঘুমোচ্ছেন!

বাঙালির সেই ভাতঘুমে এখন ভাটা পড়েছে। সামাজিক মেলামেশার তাগিদে উইকএন্ড, উৎসবের রাত এখন আমাদের জাগিয়ে রাখে। হইহুল্লোড়, খানাপিনা, আনন্দ-ফুর্তির মাঝে বেঁচে থাকাটাই এখন আসল সত্যি। নিশিযাপনের ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফেরা, ‘জাগরণে যায় বিভাবরী/ আঁখি হতে ঘুম কে নিল হরি’ উত্তরের কারণ এখন নতুন বাক্যবন্ধে বাঁধা পড়েছে— ‘সোশ্যাল জেটল্যাগ’!

ঘুম আমাদের খুঁজে পাওয়ার কথা ভুলে যায়নি। আমরাই ভুলে গিয়েছি দিনের শেষে তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে। এ এক কঠিন যুদ্ধ।

আর এক বার ‘হ য ব র ল’-র সেই লম্বা ঘুমটার কথা মনে পড়ল। ভাগ্যিস সে ঘুম এসেছিল, নইলে কোথায় বা ছিল শ্রীকাক্কেশ্বর কুচকুচে, গেছোদাদা, হিজিবিজবিজ, নেড়া বা সেই দুষ্টু লাল বেড়াল!

অতএব শরীরের কথা খানিক শোনা যাক। আসুন না, খানিক ঘুম ফুল হয়ে ছুঁয়ে যাক আমাদের চোখের পাতা! জেগে থেকেও তো ভাল নেই আমরা! বরং চলুন একটু বেশি করেই ঘুমোই, মস্তিষ্কের কোষে কোষে অক্সিজেন চলাচল স্বাভাবিক হোক। আর একখানা ভাল স্বপ্ন যদি দেখতে পেয়ে যান, তবে তো আর ভাল। অন্তত বলতে তো পারবেন, ‘স্বপন যদি মধুর এমন, হোক সে মিছে কল্পনা/ জাগিয়ো না, আমায় জাগিয়ো না...’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন