ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।
তার আগে কখনও তার জীবনে তেমন সকাল আসেনি, যে সকালে আচমকা জানা যাবে প্রিয় মানুষটার আয়ু আর মাত্র কয়েক মাস। এন্ডোস্কোপির পর ডাক্তার তাঁর ঘরে ডেকে বলবেন, “খাদ্যনালিতে টিউমার। বায়োপসি হবে। রেজ়াল্ট মোটামুটি জানা। বেশি কিছু আশা করবেন না।”
তখনও জীবনে তেমন পরিস্থিতি আসেনি, যখন ডাক্তার কোনও ভূমিকা ছাড়াই বলবেন, “বড়জোর কয়েক মাস। তবে তার অনেক আগেই খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। তখন খাদ্যনালিতে একটা স্টেন্ট বসাতে হবে। তবে মাস কয়েকের জন্য সে সব করাবেন কি না, সেটা আপনাদের সিদ্ধান্ত।”
সহমর্মিতাহীন সেই সকাল এক ধাক্কায় অনেকটা ঝড়ঝাপটা সহ্য করার শক্তি দিয়েছিল এক সন্তানকে। তার মনে হয়েছিল, যে ডাক্তার এই অনিবার্য পরিণতির কথা শোনাচ্ছেন, এটা তাঁর পেশারই অঙ্গ। তবু একটু দরদ কেন থাকবে না তাঁর কথায়? একটু আশ্বাস, ভরসা, সে-ও কি এই পেশারই একটা শর্ত নয়?
সেই সকালে ব্যস্ত হাসপাতালে দাঁড়িয়ে চতুর্দিকে ব্যস্ত চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের ভিড়ে একলা হতে হতে তার মনে হচ্ছিল, এই যন্ত্রণার কথা কেউ অন্তত বুঝুক। কেউ এসে বলুক, ‘এত ভেবো না, সব ঠিক থাকবে।’
সে দিন কেউ ছিল না তার জন্য।
তারও অনেক বছর পর, অন্য রকম আরও কিছু সকাল-রাত ক্রমশ আসতে শুরু করে জীবনে, যখন সদ্য বলা কথাও সম্পূর্ণ মুছে যাচ্ছে আর এক প্রিয় মানুষের স্মৃতি থেকে। দু’মিনিট আগে ফোনে কথোপকথন শেষ হওয়ার পরেই আবার ফোন করে প্রিয় মানুষটা জানতে চাইছেন একই বিষয়ে। ওষুধ খাওয়ার পরেও তাঁর মনে হচ্ছে, ওষুধটা খাওয়ানো হয়নি। শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না মানুষটা। বড় জোর দুটো-তিনটে বাক্য, সেটাই ঘুরে ফিরে আসছে রোজকার কথোপকথনে। বাকি সময়টা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা। তখনও প্রায় রোজই তার মনে হয়, এই মানুষটাকে সে বা তার মতো অন্যরা একটু বুঝুক। তাকে হালকা করে জড়িয়ে ধরে বলুক, “কিচ্ছু বলতে হবে না তোমাকে, আমরা তোমার সবটা বুঝে নেব।”
অন্য কেউ দূরে থাক, সে নিজেও মানুষটাকে বলতে পারে না সে-কথা। বরং দৈনন্দিন একই অনুশীলনে ক্লান্তি আসতে থাকে তার। সে বুঝতে পারে, ‘সহমর্মিতা’ শব্দটা যত সহজে উচ্চারিত হয়, তত সহজে তার চর্চা করা যায় না।
আজ ৭ জুন। এই দিনটা গত কয়েক বছর ধরে ‘ওয়ার্ল্ড কেয়ারিং ডে’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। একটু যত্ন, একটু ছুঁয়ে থাকা, একটু পাশে থাকার বার্তা দেওয়ার দিন। অন্যের যন্ত্রণার মুহূর্তে যাঁরা কোনও না কোনও ভাবে পাশে থাকার চেষ্টা করেন অন্তর থেকেই, এই দিন তাঁদের জন্য উৎসর্গ করা। শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতায় জর্জরিত কোনও ব্যক্তি বা পরিবারের পাশে যখন কেউ এসে দাঁড়ান, তাঁদের খোঁজ নেন, কী ভাবে সাহায্য করতে পারেন, তা জানতে চান, তখন সেটাই অনেকখানি প্রলেপ হয়ে দাঁড়ায় ক্ষতে। খুব বেশি কিছু প্রয়োজন পড়ে না এ জন্য। শুধু জানতে চাওয়া। শুধু বুঝতে দেওয়া যে, সে একা নয় ওই বিপর্যয়ে। তার পাশে কেউ আছে।
শুরুটা হয়েছিল ২৯ বছর আগে। ১৯৯৭ সালের জুন মাসে আমেরিকায় অপরিণত অবস্থায় জন্মানো এক শিশুর চিকিৎসা চলাকালীন তাদের এক পারিবারিক বন্ধু একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। সেখানে শিশুটির চিকিৎসা, তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সব তথ্য পরিবারের লোক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা পেয়ে যেতেন। তাঁরাও চেষ্টা করতেন সব রকম ভাবে শিশুটি ও তার বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াতে। ভুলে গেলে চলবে না, আজ থেকে ২৯ বছর আগে এখনকার মতো ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ ছিল না। রুগ্ণ শিশুটির খবর জানতে মুহুর্মুহু ফোন করে পরিবারকে বিব্রত করা নয়, তার পরিবর্তে ওয়েবসাইটেই তার খবর পাওয়া ও পরিবারকে তা নিয়ে প্রয়োজনীয় বার্তা পাঠানোর এই ভাবনা তখন সব অর্থেই ছিল নতুন। তার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ওই ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ নিজের বা নিজের প্রিয়জনের প্রয়োজনে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারছেন।
এই প্রয়াস আরও বেশি করে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, পাশে থাকা মানেই সব ক্ষেত্রে কাউকে আর্থিক সাহায্য করা কিংবা আশ্রয় দেওয়া নয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সেগুলির প্রয়োজন পড়তে পারে ঠিকই, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যা দরকার হয়, তা হল সহমর্মিতা। ঠিক-ভুলের চুলচেরা বিচার না করে শুধু জানিয়ে দেওয়া, পাশে আছি। পাশে থাকব।
শুধু কি অন্যের? নিজের পাশে নয়? ‘কেয়ারগিভার’ শব্দটা এখন খুব পরিচিত। অসুস্থ মানুষের পরিচর্যা করেন যাঁরা, তাঁদেরই ‘কেয়ারগিভার’ বলা হয়। কিন্তু অন্যের খেয়াল রাখতে রাখতে সেই মানুষটার নিজের খেয়াল রাখার কথা কেউ গুরুত্বই দেয় না। তাঁরা নিজেরাও দেন না। তাঁদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি জমতে জমতে পাহাড় হয়। এই ‘কেয়ারগিভার’রা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের মানুষ। স্বামীর ক্ষেত্রে স্ত্রী, স্ত্রীর ক্ষেত্রে স্বামী, সন্তানের ক্ষেত্রে মা-বাবা, কিংবা বাবা-মায়ের জন্য সন্তান। কখনও কখনও আবার পেশাদার কর্মীদেরও নিয়োগ করা হয়। শ্রম দিতে দিতে কেয়ারগিভারদের ‘বার্ন আউট’ হয়। এর অর্থ শারীরিক, মানসিক এবং আবেগজনিত ভাবে নিঃশেষিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি, যা এক জন মানুষের ব্যক্তিত্বটাকেই বদলে দেয়। মারাত্মক ক্লান্তি, হতাশা। রাগ। চিন্তাভাবনার জায়গাগুলো ঝাপসা হয়ে যাওয়া। কারও কারও এর সঙ্গে নানা শারীরিক উপসর্গও দেখা দেয়। দীর্ঘস্থায়ী অসুখে ভুগছেন যাঁরা, তাঁদের পাশাপাশি তাঁদের দেখাশোনা করেন যাঁরা, তাঁদের জন্য খানিকটা বাড়তি যত্ন খুব দরকার।
যে প্রশ্নগুলো এই সূত্রেই বার বার সামনে আসা উচিত, তিনি কি দিনে একটানা ছ’ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পাচ্ছেন? তিনি কি দিনে অন্তত কিছুটা সময় একা কাটাতে পারছেন? দিনে-রাতে যে কোনও সময়ে প্রয়োজন পড়লে ফোন করার মতো কেউ কি আছে তাঁর? পরিবারে বা বন্ধুবৃত্তে এমন কেউ কি আছে, প্রয়োজনে যার কাছ থেকে তিনি আর্থিক সাহায্য বা ঋণ পেতে পারেন? এমন অন্তত এক জনও কি জীবনে আছে, যে তাঁর পরিস্থিতিটা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে?
নিজের কোনও জটিল অসুখ হয়েছে জানার পরে যেমন এক জন মানুষ ভিতরে-ভিতরে অনেকটাই ভেঙে পড়েন, ঠিক তেমনই প্রিয়জনের অসুস্থতার খবরও কাউকে অনেকটা দুর্বল করে দিতে পারে। মৃত্যু যে অনিবার্য, সে-কথা সবাই জানে। কিন্তু হঠাৎ এক দিন যদি জানা যায়, সে দিনটা খুব দূরে নেই, তা হলে? ঠিক এখানেই ‘কেয়ার’ অর্থাৎ যত্নের প্রয়োজন। কোনও সান্ত্বনা নয়। শুধু পাশে থাকাটা অনুভব করানো। যাঁর সামনে চাপ-চাপ অন্ধকার, তাঁর কাছে তো সব সান্ত্বনাই ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসবে। সেই মানুষটি তখন এমন কাউকে চাইবেন, যে মিথ্যা আশ্বাস দেবে না, শুধু যে কোনও পরিস্থিতিতে পাশে থাকার ভরসা জোগাবে। সেই মানুষটা ডাক্তার হতে পারেন, নার্স হতে পারেন, আত্মীয়-বন্ধু-প্রতিবেশী— যে কেউ হতে পারেন।
এই যত্নের প্রসঙ্গেই এখন ডাক্তার-নার্সদের বার্ন আউট নিয়ে বেশ কিছু সমীক্ষার কথা সামনে আসে। সামনে আসে তাঁদের কাজে যেতে অনিচ্ছা, ঘুম না হওয়া, অল্পে রেগে যাওয়া, অবসাদ, মনঃসংযোগে ঘাটতি, কোনও কিছুতে উৎসাহ না থাকার মতো উপসর্গের কথা। আমরা অনেকেই খবর রাখি না, কিন্তু অন্যের প্রতি যত্ন কখনও কখনও তাঁদেরও অবসাদের খাদে ঠেলে দেয়। এ নিয়ে কথা ওঠায় কলকাতার এক শিশুরোগ চিকিৎসক বলেছিলেন, “মানসিক ভাবে কারও সঙ্গে জড়িয়ে পড়ব না ভাবি। কিন্তু সেটা হয়ে ওঠে না। দীর্ঘ চিকিৎসার পর কোনও শিশু যখন মারা যায়, আমাদের মনের মধ্যে কী চলে তা কেউ বোঝেন না। তখন আমাদেরও মনে হয় কেউ সেটা বুঝুক। সেই মুহূর্তে খানিকটা সহমর্মিতা আমাদেরও প্রয়োজন হয়।”
বিভিন্ন পরিবারে কেয়ারগিভারদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে একটা সমীক্ষা চালিয়েছিল কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। ক্যানসার, ডিমেনশিয়া, স্ট্রোকে শয্যাশায়ী রোগীর কেয়ারগিভারদের নিয়ে এই সমীক্ষাটি হয়। মূলত কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার কয়েকশো রোগীর কেয়ারগিভারদের উপর এই সমীক্ষাটি চালানো হয়েছিল। তাতে দেখা যায়, রোগীর পরিচর্যা করতে করতে এঁদের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দটাই হারিয়ে গিয়েছে। অথচ চার পাশের মানুষেরা আর একটু সংবেদনশীল হলে ছবিটা অন্য রকম হতে পারত।
ক্যানসার-আক্রান্ত বৃদ্ধের দেখাশোনা করেন তাঁর স্ত্রী। স্নান করানো, খাবার খাওয়ানো, ওষুধ খাওয়ানো, সব কিছুর দায়িত্ব তাঁর। মুমূর্ষু মানুষটি শরীরে-মনে এতটাই ক্ষতবিক্ষত, তিনি অহরহ স্ত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। বৃদ্ধা স্ত্রীকে সেটা মুখ বুজে মানতে হয়। তাঁর কোনও জায়গা নেই, যেখানে তিনি নিজের কষ্টের কথা বলবেন, নিজের ক্লান্ত শরীর-মনকে দু’দণ্ড জিরোতে দেবেন। বরং তাঁর আরও কী কী করা করা উচিত, কোন কোন জায়গায় ত্রুটি হচ্ছে, সেই বিশ্লেষণ চলতে থাকে তাঁর সামনেই। চোখের জল ফেলারও স্বাধীনতা নেই তাঁর।
সন্তানেরা উল্টে বলবে, “এখনও তোমার এই মান-অভিমান চালিয়ে যেতে এতটুকু বাধছে না?”
পরিচিতেরা বাড়ি বয়ে এসে বলে যাবে, “তোমাকে তো একটু সহ্য করতেই হবে।”
কিন্তু তিনি কাউকে বলার সুযোগ পান না, তাঁর মন ভাল নেই। তাঁর কষ্ট হচ্ছে। তাঁর ঘুম পাচ্ছে। তাঁর ক্লান্ত লাগছে। তাঁর ইচ্ছে করছে কেউ তাঁর পাশে বসে গায়ে একটু হাত রেখে জানতে চাক, তাঁর কী দরকার, তিনি ঠিক কেমন আছেন।
অনেক কথা পর পর ভিড় করছে মনে। যে বৃদ্ধার কথা লিখলাম, তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার পরের দিন দেখা করেছিলাম তাঁর সঙ্গে। কেমন আছেন জানতে চাওয়ায় তিনি বলেছিলেন, “অনেক দিন পর কাল সারা রাত ঘুমিয়েছি। আজ সকালে বসে একবারে পুরো চায়ের কাপটা শেষ করেছি...” কথা শেষ করতে পারেননি তিনি। ঠোঁট কেঁপেছে। গলা বুজে এসেছে কান্নায়। সমাজ-নির্মিত শিক্ষা হয়তো তাঁকে বুঝিয়েছে, এমন সময়ে নিজের এই খাওয়া-ঘুমের কথা বলা তো দূর, ভাবাও অপরাধ। নিজের মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য তাঁকে পীড়া দিচ্ছিল, অপরাধবোধে ভোগাচ্ছিল। ওই সময়ে হয়তো তাঁর দরকার ছিল এমন কয়েকটি শব্দ, যা তাঁর ক্লান্ত মনকে একটু শান্তি দেবে। তিনি হয়তো চেয়েছিলেন কেউ তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলুক, ‘তুমি একটু নিজের খেয়াল রেখো।’
কলকাতার এক ক্যানসার হাসপাতালে ভর্তি এক শিশুর মায়ের গল্প শোনাই এবার। রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত সেই শিশুটিকে টানা আট মাস হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছিল। খবরের প্রয়োজনে সেই হাসপাতালে কয়েক বার যেতে হয়েছিল সেই সময়ে। সেই সূত্রেই দেখা ওই তরুণী-মায়ের সঙ্গে। চাকরি ছেড়ে মেয়ের সঙ্গে হাসপাতালেই থাকতেন তিনি। অনলাইনে আংশিক সময়ের কাজ করতেন একটি সংস্থায়। মেয়ের শয্যার পাশে ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকতে দেখে পরিবারের অন্যরা ভিজ়িটিং আওয়ারে এসে নানা তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে বিদ্ধ করতেন তাঁকে। ওই তরুণী বলেছিলেন, “আমি কাজের মধ্যে থাকলে ভাল থাকি। আমার সন্তানের ভাল থাকার জন্য আমার নিজের ভাল থাকাটা জরুরি। কারণ এটা লম্বা লড়াই। কিন্তু আমার কথাটা পরিবারের কেউ বোঝার চেষ্টাই করে না।”
তবে পরিবার সহমর্মী না হলেও হাসপাতালে অন্যদের পাশে পেয়েছিলেন তিনি। ওয়ার্ডে ভর্তি অন্য শিশুদের মায়েরা তাঁকে মনের জোর জোগাতেন। একাধিক বার সেই ওয়ার্ডে যাওয়ার সুবাদে বুঝেছিলাম, সেখানে মায়েরাই একে অপরের কেয়ারগিভার! জীবনে খুব অদ্ভুত ভাবে এমন সব সম্পর্ক তৈরি হয়, হয়তো সেই সম্পর্ক সাময়িক, কিন্তু একটা মানুষকে জীবনের খুব কঠিন কিছুমুহূর্তে টানটান ভাবে বাঁচিয়ে রাখতে এই সম্পর্কগুলো বড্ড জরুরি।
৭ জুন দিনটা পালনের ভাবনা শুরু মূলত মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যত্ন, সহমর্মিতা, সহানুভূতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরুত্ব তুলে ধরতে। হয়তো এই বিশ্বাসকে লালন করতে যে, পৃথিবীকে আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য করে তোলার জন্য বড় কোনও রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি ছোট ছোট মানবিক আচরণ— হয়তো এক জন অসুস্থ প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত বন্ধুর পাশে দাঁড়ানো, পথের পশুকে জল দেওয়া, কিংবা নিঃস্বার্থ ভাবে কারও কথা শোনা।
সল্টলেকের এক বেসরকারি হাসপাতালের রিসেপশনে বসেছিলাম। হঠাৎই দেখি, দুদ্দাড় করে সিঁড়ি বেয়ে নামছে বছর চার-পাঁচেকের একটা মেয়ে। হাতে চ্যানেল করা। পিছনে ছুটে আসছেন এক তরুণী (পরে জেনেছি শিশুটির মা), কয়েক জন নার্স। কী হয়েছে? জানা গেল, দুরারোগ্য এক রোগের চিকিৎসার যন্ত্রণা সইতে না পেরে হাসপাতাল থেকে পালাতে চায় ওই শিশু। রিসেপশনে সেই মুহূর্তে বসে থাকা সকলেই হতবাক। চোখে জল অনেকেরই। নিরাপত্তারক্ষী আটকালেন শিশুটিকে। হঠাৎই দেখলাম এক বৃদ্ধা, যাঁর স্বামীও ওই হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি, এগিয়ে গেলেন নিরাপত্তারক্ষীর সামনে আটকে যাওয়া শিশুটির কাছে। তাকে কোলে নিয়ে বললেন, “কোথায় যাচ্ছ দিদিভাই? তুমি চলে গেলে আমি গল্প শোনাব কাকে? আমার যে অনেক গল্প বলার আছে।” শীর্ণ হাত-পা, চোখের নীচে গভীর কালির সেই মেয়ের মুখে হাজার বাতি জ্বলে নিমেষে। বৃদ্ধা অনাত্মীয় শিশুকে কোলে করে এগিয়ে যান ওয়ার্ডের দিকে। ইশারায় শান্ত থাকতে বলেন মাকে। সেদিন ওই দৃশ্য দেখার পর মনে হয়েছিল, ওই মুহূর্তে পৃথিবীতে এর চেয়ে পবিত্র কোনও দৃশ্য কি হওয়া সম্ভব?
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কোভিডের সময়ে সাধারণ মানুষের পারস্পরিক সাহায্য, ঝুঁকি তুচ্ছ করে রক্তদানের জন্য এগিয়ে আসা, অনাত্মীয়ের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের নানা মুহূর্ত তো এভাবেই রচিত হয়েছিল। কিন্তু অন্য সময়ে তার এত অভাব কেন?
এক বন্ধু বলছিল, এখন মানুষ নিজেই সব সময়ে নানা ঝামেলায় এত জেরবার থাকে যে, অন্য কারও সমস্যা দেখলে তাদের মধ্যে পরিস্থিতি থেকে পালানোর একটা মনোবৃত্তি কাজ করে! কখনও আবার পাশের মানুষের খোঁজ নেওয়ার আগে, তার পাশে দাঁড়ানোর ভরসা দেওয়ার আগে মনের ভিতরে কাজ করে এক ধরনের আশঙ্কাও— “এই রে! সমস্যা জানতে চাইলেই আবার টাকা চাইবে না তো?” কিংবা “কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করলেই তো সমস্যার ঝুলি খুলে বসবে! এত ঘ্যানঘ্যান শুনলে ক্লান্ত লাগে।” তাই পাশের ফ্ল্যাটের তরুণীকে উদ্ভ্রান্ত অবস্থায় লিফটে দেখেও কেউ হয়তো চুপ থেকেছি। পরে খবর পেয়েছি, সে দিনই তার চাকরি চলে গেছে, তাই অমন উদ্ভ্রান্ত ছিল সে। অফিসের নিরাপত্তারক্ষীর স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ জেনেও পরের দিন কেউ হয়তো খোঁজ নেয়নি তিনি কেমন আছেন। আমরা আর কিছু করতে না পারি, দুটো ভরসার কথা শোনাতে পারতাম। বলতে পারতাম, “সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা সবাই আছি তোমার পাশে।”
সত্যি বলতে কি, এক অদ্ভুত রকমের নিষ্ঠুরতা, নিস্পৃহতার মুহূর্ত প্রতি দিন রচিত হয় আমাদের চারপাশে। আর তা খুব বেশি করে অনুভব করেন— কোনও রকম শারীরিক বা মানসিক সমস্যা রয়েছে এমন শিশুদের বাবা-মায়েরা। সন্তানকে নিয়ে বাইরে বেরোলে হাজার জনের অস্বাস্থ্যকর কৌতূহল, বিরক্তি, করুণার দৃষ্টি প্রতি মুহূর্তে তাঁদের ক্ষতবিক্ষত করে। আমার এক সহকর্মীর সন্তানের অটিজ়ম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার রয়েছে। তার কাছে শুনেছিলাম, ছেলেকে নিয়ে একটা দলের সঙ্গে ট্রেকিংয়ে গিয়েছিল সে। সেখানে তার সন্তানের অসুবিধের কথা টের পাওয়ার পর অন্য ছেলেমেয়েদের বাবা-মায়েরা তাঁদের সন্তানদের সেই ছেলেটির সঙ্গে মিশতে বারণ করে দিয়েছিলেন। এই বাবা-মায়েদের হয়তো খেয়ালই ছিল না, যে সহমর্মিতার শিক্ষা আজ তাঁরা নিজেদের সন্তানকে দিচ্ছেন না, অচিরেই হয়তো এমন একটা দিন আসবে, যে দিন সন্তানের এই শিক্ষার অভাব তাঁদেরই পীড়া দেবে সবচেয়ে বেশি।
এই নাগরিক কার্পণ্য আমাদের কত দূর আলাদা করে রাখে অন্যের থেকে, তার অজস্র নজির আমাদের চারপাশে। সহানুভূতি, সহমর্মিতা তো অনেক দূরের কথা, সাধারণ সৌজন্যটাই খুঁজে পাওয়া যায় না। এক বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুর মায়ের কাছে শুনেছিলাম তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। সন্তানের ওষুধের দাম তাঁদের সাধ্যের বাইরে। সরকারি সাহায্যের জন্য যখন তিনি হন্যে হয়ে ঘুরছেন, তখন প্রতিবেশী এক মহিলা তাঁকে বলেছিলেন, “ওষুধ পেলেও ক’দিনই বা বাঁচবে তোমার ছেলে? ওই টাকাটা অন্য বাচ্চাদের জন্য খরচ হলে বরং তাদের সুরাহা হবে।” তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, তাঁর কথায় কিছুসারবত্তা আছে, কিন্তু তার পরেও প্রশ্ন, কোনও মা-কে অবলীলায় তাঁর সন্তান সম্পর্কে এমন কথা বলা যায় কি?
লিখছি কথাগুলো, আর ভিতরে ভিতরে হতাশার চোরাস্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে। কারণ পারিপার্শ্বিক নানা ঘটনা বহু সময়েই প্রমাণ করে দিয়েছে, আমাদের অন্যের পাশে দাঁড়ানোর সময় নেই। কিন্তু কথায় কথায় অন্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সময় আছে বিস্তর।
ভেবে অবাক লাগে, এই কেয়ারিং ডে-র ভাবনাটা রূপ নিয়েছিল অনলাইনে। অথচ এখন এই অনলাইন মাধ্যমই বিচারসভা তৈরি করে কেড়ে নিচ্ছে যাবতীয় গোপনীয়তা, সম্মান, সহানুভূতি। সমাজমাধ্যমে কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে এক মুহূর্ত সময় লাগে না। সেই বিচারশালায় সব বিচারই হয় খুব দ্রুত। দিন কয়েক আগে বাংলার এক নামী চলচ্চিত্র-পরিচালকের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারকে ঘিরে যে বিচারসভা বসল, তা দেখে নিজেদের নিয়েই ভয় করে। শোকের সংজ্ঞা এখন ঠিক করে দেয় সমাজমাধ্যমই। ক’ফোঁটা চোখের জলের সঙ্গে কত বার ঠোঁট কাঁপা, পোশাকের কোন রং, কত দৈর্ঘ্য, রান্নার রেসিপির মতো সবটারই মাপ আছে। বুঝে চলতে পারলে ভাল, নয়তো সমাজমাধ্যম শূলে চড়াবে। কেউ জীবনের সঙ্গে যুঝে উঠতে না পেরে জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টাকরলে তাঁর ও তাঁর পরিবারের প্রতি এই যে সব মন্তব্যের ঝড় ওঠে, তাতে চারপাশের অন্ধকার আরও গাঢ় হয়।
আগলে রাখা দরকার। নিজেকে। অন্যদেরও। কেউ চলে যাওয়ার পর হা-হুতাশ বড় মূল্যহীন। কেন এভাবে চলে গেলে? কেন আমাদের কিছু বুঝতে দিলে না— সমাজমাধ্যমের দেওয়ালে এ কথা লেখার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, বুঝতে বা জানতে চেয়েছিলাম কি? যা করার, করতে হবে তার জীবিত অবস্থায়। ‘সে চলে গেল বলে গেল না, সে কোথায় গেল ফিরে এল না...’— বলে যায় না অনেকেই। কিন্তু হয়তো আশা করে থাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যে, কেউ তাকে বুঝবে। কেউ তাকে আগলে রাখবে চূড়ান্ত পরিণতি থেকে।
‘কেয়ার’ কি শুধু অসুস্থ, হাসপাতাল-বন্দি জীবনের জন্যই বরাদ্দ? এই মুহূর্তে ঠিক যে সময়টায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা, সেই পারিপার্শ্বিকতায় এ নিয়ে লিখতে বসে বার বার মনে হচ্ছে, এই দিনটাকে তার নিজস্ব গণ্ডি ছাড়িয়ে বার করা জরুরি। শুধু রুগ্ণ মানুষ ও তাঁদের পরিজনদের জন্যই নয়। কথায় কথায় এই খাপ পঞ্চায়েত বসানোর যুগে সহমর্মিতার চর্চা যে সব ক্ষেত্রেই কী প্রবল ভাবে জরুরি, তা মনে করিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা চলুক এই দিনটার উদ্যাপনের মাধ্যমে।
মেট্রোয় উঠে ইয়ারফোন লাগিয়ে মোবাইলে গান শুনছেন মহিলা। মধ্যবয়সি। পরিপাটি চেহারা, সাজগোজ। চোখ বন্ধ করে গান শুনতে শুনতে জল গড়াচ্ছে দু’চোখের কোণ বেয়ে। অপ্রস্তুত হয়ে দ্রুত মুছে নিচ্ছেন তিনি। চোখে পড়ল, পাশে বসা এক সমবয়স্কা সহযাত্রী হাতটা ধরে আলতো চাপ দিলেন। কারও মুখে কথা নেই। কেউ জানে না অন্য জনের যন্ত্রণার উৎস কী। তবু ওই আশ্বাসটুকু থাকল। সুমনের গানের অনুষ্ঠান। ‘সারা রাত জ্বলেছে নিবিড়...।’ প্রায়ান্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে অপরিচিত তরুণী অঝোরে কেঁদে চলেছেন। একটাও শব্দ বিনিময় হয়নি, তবু কোনও এক অদৃশ্য তরঙ্গ হয়তো পৌঁছেছে তাঁর পাশের জনের কাছে। পরস্পরকে বোঝাতে চেয়েছে কেউ একা নয়। হয়তো মনে করিয়েছে এমন কারও কথা, যার কাছে সব কষ্ট উজাড় করে দেওয়া যায়। মাথা রেখে কাঁদবার মতো কাঁধ, আর ভরসা করে ধরবার মতো হাত, আসলে তো জীবনের বড় সম্বল এটুকুই।
তাই আমরা বরং ‘ওয়ার্ল্ড কেয়ারিং ডে’-র মূল ভাবনার দু’পাশে ডানা লাগিয়ে তাকে একটু উড়তে দিই। সহমর্মিতার প্রলেপ লাগাই পাশের জনের ক্ষতে, সাধ্য অনুযায়ী চেনা-অচেনা মানুষের দিকে বাড়িয়ে দিই সাহায্যের হাত।
সহমর্মিতার কথা উঠলেই এক ঝটকায় যেমন মনে পড়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তালনবমী’-র কথা। জটি পিসিমাদের বাড়ি তালনবমীর নেমন্তন্ন পায়নি গোপাল। অথচ চূড়ান্ত দারিদ্রের সংসারে বেড়ে ওঠা, পেট ভরে খেতে না পাওয়া গোপাল সেই নেমন্তন্নের অপেক্ষাতেই ছিল। সে স্বপ্ন দেখেছে, জটি পিসিমার বাড়ি তাকে যত্ন করে খাওয়ানো হচ্ছে। এমন সব খাবার তার স্বপ্নে আসছে, যার নাম সে শুনেছে, কিন্তু কখনও খাওয়ার সুযোগ হয়নি। গোপাল ঠায় অপেক্ষা করে সেই নেমন্তন্নের। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট দিনে যখন তার সামনে দিয়ে গ্রামের বাছাই করা লোকেরা নিমন্ত্রণে যায় আর তার ডাক আসে না, তখন রাগে, অভিমানে দিশাহারা হয়ে যায় সে। “ওরা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে গোপালের চোখে জল এসে পড়ল— বোধহয় সংসারের অবিচার দেখেই। পথ চেয়ে সে বসে আছে কদিন থেকে! কিন্তু তার কেবল পথ চাওয়াই সার হল? তার সকল ঝাপসা দৃষ্টির সামনে পাড়ার হারু, হিতেন, দেবেন, গুটকে তাদের বাপ-কাকাদের সঙ্গে একে একে তার বাড়ির সামনে দিয়ে জটি পিসিমাদের বাড়ির দিকে চলে গেল।”
এই অসাম্যের দুনিয়ায় সংসারের যে অবিচার দেখে গোপাল অভিমানে দিশাহারা হয়েছিল, চারপাশে থাকা গোপালের মতো শিশুদের সেই অভিমান মুছিয়ে দিয়ে একটু যত্নের ব্যবস্থা তো আমরাই করতে পারি, যে যার সাধ্য মতো! সেটাও তো ‘কেয়ার’, যত্ন, সহমর্মিতা।
আজ তো ‘ওয়ার্ল্ড কেয়ারিং ডে’।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে