Ancient Fossil

বিলুপ্ত লোমশ ম্যামথের জীবাশ্ম ভেবে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল জাদুঘরে! এত দিনে ভাঙল ৭০ বছরের ভ্রান্ত ধারণা

প্রায় সাত দশক ধরে রেখে দেওয়া ছিল জাদুঘরেই। সেটি ম্যামথের জীবাশ্ম বলে মনে করা হত। কিন্তু এখন দেখা গেল, তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রাণীর জীবাশ্ম। ম্যামথ বা হাতি গোত্রের কোনও প্রাণী তার ধারেকাছে নেই।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০০
Share:

আলাস্কা থেকে পাওয়া কিছু হাড়গোড় ম্যামথের ভেবে ভুল করেছিলেন জীবাশ্মবিদেরা। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

খোঁজ মেলে ৭৫ বছর আগে। প্রায় ৭০ বছর ধরে জাদুঘরেই শোভা পাচ্ছে জীবাশ্মটি। এত দিন ধরে মনে করা হত সেটি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ম্যামথের জীবাশ্ম। সেই ভুল ধারণা ভাঙল এত দিনে। নতুন গবেষণায় জানা গেল, সেটি আদৌ কোনও ম্যামথের জীবাশ্ম নয়। সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনও প্রাণীর জীবাশ্ম। তা-ও জলচর।

Advertisement

ম্যামথের কথা ভাবলে অনেকের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে ‘আইস এজ’ সিনেমার কথা। লোমশ চেহারা। বিরাট দাঁত। এখন যে সব হাতি দেখা যায়, তার চেয়ে তুলনায় অনেকটাই বড়। এই জীবাশ্মটিকে দেখেও তেমনই এক লোমশ ম্যামথের কথা ভেবে ভুল করেছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। জীবাশ্মটির সন্ধান মেলে ১৯৫১ সালে। আলাস্কায়। সেই থেকে আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরেই সংরক্ষিত ছিল জীবাশ্মটি। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এ নিয়ে বিশেষ নাড়াচাড়া হয়নি। শুধু জাদুঘরেই শোভা পেয়ে গিয়েছে জীবাশ্মটি। সকলে সেটিকে ম্যামথের জীবাশ্ম বলে ধরেও নিয়েছিলেন।

সম্প্রতি আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মিউজ়িয়াম অফ দ্য নর্থ’ ম্যামথদের নিয়ে গবেষণার জন্য অর্থসংগ্রহ শুরু করে। চালু করা হয় ‘অ্যাডপ্ট আ ম্যামথ’ (একটি ম্যামথকে দত্তক নিন) কর্মসূচি। এই কর্মসূচিতে ইচ্ছুক ব্যক্তি বা সংস্থা ম্যামথ নিয়ে গবেষণার জন্য আর্থিক সহায়তা করতে পারেন। মূলত ম্যামথের বিভিন্ন জীবাশ্মের বয়স নির্ধারণ করার জন্য গবেষণায় এই অর্থ ব্যয় হয়। পরিবর্তে জীবাশ্মের ছবি এবং তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার নাম উল্লেখ থাকবে জাদুঘরে।

Advertisement

১৯৫১ সালে পাওয়া সেই জীবাশ্মটিকেও এই কর্মসূচির আওতায় পরীক্ষা করা হয়। জীবাশ্মের রেডিয়োকার্বন ডেটিং করা হয় জীবাশ্মটির। তাতে দেখা যায় এই হাড়গুলি তিন হাজার বছরেরও পুরানো নয়। আনুমানিক ১৮৫৪ থেকে ২৭৩১ বছরের পুরানো ওই জীবাশ্ম। এখান থেকেই প্রথম প্রশ্ন দানা বাঁধে। কারণ, এত দিন জানা ছিল, বিরাট চেহারার এই প্রাণীরা আজ থেকে প্রায় ১৩ হাজার বছর আগেই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছে। তা হলে কি এই জীবাশ্ম সত্যিই ম্যামথের? যদি তা-ই হয়, তবে এত দিন যা মনে করা হত তার চেয়েও বহু বেশি দিন ম্যামথেরা ঘুরে বেড়াত পৃথিবীতে। সে ক্ষেত্রে এই প্রাণীদের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সময়রেখা নতুন করে আঁকতে হবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের।

এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ওই জীবাশ্ম পুনরায় পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। আলাস্কার ফেয়ারব্যাঙ্কস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাথিউ উলারের নেতৃত্বে এক দল প্রত্নতাত্ত্বিক নতুন করে গবেষণা চালান ওই জীবাশ্ম নিয়ে। সম্প্রতি ‘জার্নাল অফ কোয়াটারনারি সায়েন্স’-এ সেই গবেষণাটি বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায় হা়ড়গুলিতে নাইট্রোজন-১৫ এবং কার্বন-১৩ আইসোটোপের পরিমাণ অনেকটা বেশি। এই আইসোটোপগুলি স্থলচর প্রাণীর মধ্যে পাওয়া গেলেও সামুদ্রিক প্রাণীর মধ্যে এগুলি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। উলারের কথায়, “প্রাথমিক ভাবে তাতে আমাদের মনে হচ্ছিল নমুনাগুলি সম্ভবত কোনও সামদ্রিক পরিবেশ থেকে এসেছে।” পরবর্তী সময়ে জীবাশ্ম থেকে পাওয়া ডিএনএ-র নমুনাও বিশ্লেষণ করে দেখেন গবেষকেরা। তাতে তাঁরা নিশ্চিত হন এটি মোটেও কোনও ম্যামথের জীবাশ্ম নয়। বরং দুই ভিন্ন প্রজাতির তিমির জীবাশ্ম। একটি মিঙ্কে হোয়েল। অন্যটি নর্থ প্যাসিফিক রাইট হোয়েল। এই দুই প্রজাতির তিমির জীবাশ্মকেই গত ৭৫ বছর ধরে ম্যামথের জীবাশ্ম বলে মনে করা হচ্ছিল।

তবে আলাস্কার যে অঞ্চল থেকে এই জীবাশ্মগুলি পাওয়া যায়, তা-ও এক রহস্য বলা চলে। উপকূলরেখা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে এক সোনার খনি থেকে জীবাশ্মগুলি পাওয়া গিয়েছিল। উপকূল থেকে এত ভিতরের দিকে কী ভাবে এল তিমির জীবাশ্ম? তা হলে কি শুধু সমুদ্রেই নয়, এই তিমিরা নদীতেও ঘুরত? কী ভাবে উপকূল থেকে ৪০০ কিলোমিটার ভিতরে এই জীবাশ্ম এল, তা এখনও অজানা। এ বিষয়ে জীবাশ্মবিদেরা কিছু সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। কেউ কেউ অনুমান করেন, ইউকন এবং তানানা নদী দিয়ে স্থলভাগের ভিতরে প্রবেশ করেছিল তিমিগুলি। তবে মিঙ্কে হোয়েলের ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব মেনে নেওয়া গেলেও নর্থ প্যাসিফিক রাইট হোয়েলের ক্ষেত্রে তা কখনোই সম্ভব নয় বলে মনে করছেন অপর এক দল জীবাশ্মবিদ। কারণ, মিঙ্কে হোয়েল আকারে ছোট। কিন্তু নর্থ প্যাসিফিক রাইট হোয়েলের যা চেহারা, তাতে নদীপথে স্থলভাগের ভিতরের দিকে প্রবেশ করা একপ্রকার অসম্ভবই বলা চলে। অপর একটি তত্ত্ব হল, প্রাচীন কালে মানুষ এই হাড়গুলিকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহারের জন্য স্থলভাগের ভিতরে নিয়ে এসেছিল। তবে এই তত্ত্বগুলির কোনওটিই এখনও প্রমাণিত নয়। ফলে তিমির ওই হাড়গুলি উপকূল থেকে এত ভিতরে কী ভাবে পৌঁছোল, তা এখনও ধোঁয়াশাই রয়ে গিয়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement