মৃত টির্যানোসরাসের মাংস খাচ্ছে শাবক টির্যানোসরাস। — প্রতীকী চিত্র।
আজ থেকে প্রায় সাড়ে ছ’লক্ষ বছর আগে পর্যন্ত পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াত ওরা। ছিল নিজেদের সময়ের সেরা শিকারী। কেউ কেউ বলেন, ওরা ছিল ডাইনোসরদের ‘রাজা’। সেই টির্যানোসরাস-রেক্স (সংক্ষেপে টি-রেক্স)-এর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে এ বার নতুন তথ্য উঠে এল। জানা গেল, তারা শুধু শিকারের উপরেই নির্ভর করত না। প্রয়োজনে মৃত প্রাণীর মাংস খেতেও ‘সংকোচ’ করত না।
ডাইনোসর যুগে ঠিক কোন সময়ে টির্যানোসরাসদের আবির্ভাব হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। জীবাশ্ম তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়, প্রায় সাত কোটি বছর আগে থেকে তাদের অস্তিত্ব ছিল পৃথিবীতে। তারও আগে ছিল কি না, সে বিষয়ে কোনও প্রমাণ্য তথ্য নেই। নিজেদের সময়ের সবচেয়ে হিংস্র স্থলচর ছিল টি-রেক্স। লাতিন ভাষায় ‘রেক্স’ শব্দের অর্থ রাজা। ডাইনোসর যুগে তাদের যে তেজ এবং দাপট ছিল, তার সঙ্গে সাজুয্য রেখেই নামকরণ হয়েছে টি-রেক্স। সম্প্রতি এমনই এক টির্যানোসরাসের জীবাশ্মের কম্পিউটার মডেল নিয়ে গবেষণা চালান ডেনমার্কের আরহুস বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওসায়েন্স বিভাগের গবেষকেরা। সেই গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘ইভলভিং আর্থ’ জার্নালে।
প্রায় সাত কোটি বছরের আগের টির্যানোসরাসের একটি জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে দেখেন গবেষকেরা। সেটি ছিল টির্যানোসরাসের মেটাটারসাল (পায়ের হাড়)-এর জীবাশ্ম। থ্রি-ডি স্ক্যান করে জীবাশ্মটিতে ১৬টি কামড়ের চিহ্ন পাওয়া যায়। প্রতিটি কামড়ই একটি অন্যটির চেয়ে আলাদা। গবেষকদলের প্রধান জোসেফিন নিলসেন এই প্রতিটি কামড়ের চিহ্ন বিশ্লেষণ করে দেখেন। বিশেষ করে প্রতিটির গভীরতা, কোন কোণে, কোথায় কামড় বসেছে— তা পরখ করে দেখা হয়। গবেষকদের অনুমান, কোনও ছোট টিরাইনোসরাস ওই বড় টিরাইনোসরাসটির মাংস খেয়েছিল। কিন্তু টি-রেক্সের হিংস্র প্রকৃতির নিরিখে ধরে নেওয়া যায়, বড় টি-রেক্সটি জীবিত থাকা অবস্থায় তার মাংস খায়নি ছোট টি-রেক্সটি। অর্থাৎ, খাবারের জন্য শুধু শিকারের উপর নির্ভর করত না এই হিংস্র ডাইনোসর প্রজাতিটি। প্রয়োজন হলে নিজের মৃত স্বজাতির মাংসও খেত তারা।
গবেষকদলের প্রধান নিলসেনের কথায়, “এই কামড়ের চিহ্নগুলো কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। এগুলো হল একটি ছোট টাইরানোসরের দাঁতে ছাপ। সে তার নিজের চেয়ে অনেক বড় মাপের এক ডাইনোসরকে খেয়েছিল।” এর থেকে বোঝা যায়, টি-রেক্সেরা খাবার নষ্ট করা ‘পছন্দ করত না’। এমনকি পচন ধরে যাওয়ার শেষ পর্বে যখন কোনও মৃত প্রাণীর শক্ত হাড়ের মধ্যে সামান্য মাংস লেগে থাকত, সেটুকুও খেয়ে নিত তারা। জীবাশ্মের থ্রি-ডি বিশ্লেষণের পরে এমনটাই জানা গিয়েছে বলে দাবি গবেষকদের।
পায়ের হাড়ে কামড়ের চিহ্নগুলি ধীরে ধীরে সেরে উঠছিল, এমনও কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি গবেষণায়। যা থেকে নিলসেন এবং তাঁর সঙ্গীরা আরও স্পষ্ট হয়েছেন যে বড় ডাইনোসরটি মারা যাওয়ার পরেই তার মাংস খাওয়া হয়েছিল।
যে ডাইনোসরের জীবাশ্মের থ্রি-ডি স্ক্যানের উপরে এই গবেষণাটি চলে, সেটির পায়ের মেটাটারসালের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১০ সেন্টিমিটার। তা থেকে গবেষকদের অনুমান, জীবদ্দশায় ডাইনোসরটি প্রায় ১০-১২ মিটার লম্বা ছিল এবং তার ওজন ছিল কয়েক টন। তবে এই গবেষণাটি আসল জীবাশ্মের উপর হয়নি। সেটি বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে আমেরিকার নর্থ ডাকোতায় ‘ব্যাডল্যান্ডস ডাইনোসর মিউজ়িয়ামে’। নিলসেন জানান, আসল জীবাশ্মটি নিয়ে কাজ করা নিঃসন্দেহে একটি অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা হত। কিন্তু ডাকযোগে সেটিকে ডেনমার্কে পাঠানোও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই জীবাশ্মের থ্রি-ডি মডেলের উপরেই গবেষণাটি চালান তাঁরা।
গত কয়েক দশকে টি-রেক্সদের নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে মনে করা হত, এরা ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকত। তবে সাম্প্রতিক অপর এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই ডাইনোসরদের গড় আয়ু ছিল ৩৫-৪০ বছর। গাছের কাণ্ডের বলয় দেখে যেমন কোনও গাছের বয়স নির্ধারণ করা যায়, এ ক্ষেত্রেও অনেকটা তেমনই। টি-রেক্সের পায়ের হাড়েও গাছের মতো বলয় থাকে। তা দেখে ওই ডাইনোসরের বয়স নির্ধারণ করা যায়।