IPL 2026

অন্য দলে জায়গাই পেতেন না! সেই রানহীন রাহানেকে অধিনায়ক করে ডুবছে কেকেআর, আদৌ কি নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য তিনি?

যিনি কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে এর আগে ঘরোয়া প্রতিযোগিতাতেও অধিনায়কত্ব করেননি, সেই ‘বুড়ো’ রাহানের হাতে দল তুলে দিয়েছেন শাহরুখ খান, বেঙ্কি মাইসোরেরা। তার খেসারত দিচ্ছে কেকেআর।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ১১:০৬
Share:

অজিঙ্ক রাহানে। —ফাইল চিত্র।

ভারতের হয়ে শেষ টি-টোয়েন্টি খেলেছিলেন ২০১৬ সালে। ১০ বছর আগে। সেই অজিঙ্ক রাহানেই আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের অধিনায়ক। যিনি কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে এর আগে ঘরোয়া প্রতিযোগিতাতেও অধিনায়কত্ব করেননি, সেই ‘বুড়ো’ রাহানের হাতে দল তুলে দিয়েছেন শাহরুখ খান, বেঙ্কি মাইসোরেরা। তার খেসারত দিচ্ছে কেকেআর। যে রাহানে আইপিএলের অন্য কোনও দলে জায়গাই পেতেন না, তিনি কেকেআরকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার পরে কী ভাবে ভাল ফলের আশা করে কেকেআর? যা হচ্ছে, ঠিক হচ্ছে।

Advertisement

অতি সাধারণ টি-টোয়েন্টি কেরিয়ার

রাহানের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি কেরিয়ার মাত্র পাঁচ বছরের। এই পাঁচ বছরে ভারতের হয়ে ২০টি ম্যাচ খেলেছেন রাহানে। করেছেন ৩৭৫ রান। ২০.৮৩ গড়ে খেলেছেন তিনি। মাত্র একটি অর্ধশতরান করেছেন। ২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শেষ বার খেলেছিলেন। তার পর থেকে আর জায়গা পাননি।

রাহানে মোটেই টি-টোয়েন্টির ক্রিকেটার নন। সে কথাই মনে করেন শরদিন্দু মুখোপাধ্যায়। ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার আনন্দবাজার ডট কম-কে বললেন, “রাহানের টেকনিক নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গা নেই। তবে ও লাল বলের ক্রিকেটে বিশেষজ্ঞ। টি-টোয়েন্টিতে নয়। ও যা করছে, পাওয়ার প্লে-তে। এক বার পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার পর স্পিনারেরা আক্রমণে এলে রাহানে আর রান করতে পারছে না। অধিনায়কই যদি খারাপ খেলে, তা হলে দল আর কী ভাবে জিতবে।”

Advertisement

আইপিএলেও অতীতের ছায়া

আইপিএলে রাহানের কেরিয়ার খারাপ নয়। ২০১০ সাল ছাড়া প্রতি বছর কোনও না কোনও দলের হয়ে খেলেছেন তিনি। মোট ২০৩ ম্যাচে করেছেন ৫১৮৪ রান। ৩০.৬৭ গড় ও ১২৫.৬১ স্ট্রাইক রেটে রান করেছেন তিনি। আইপিএলে দু’টি শতরানও রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি ৩৪টি অর্ধশতরান করেছেন। গড় খারাপ না হলেও রাহানের স্ট্রাইক রেট টি-টোয়েন্টিতে বেমানান।

তবে রাহানের এই ৫১৮৪ রানের মধ্যে ৩৫৫২ রান হয়েছে ২০১২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে। সেই সময় রাজস্থান রয়্যালস ও রাইজ়িং পুণে সুপার জায়ান্টসের হয়ে খেলেছেন তিনি। তার পর দুই মরসুমেই ৩০০ রানের বেশি করেছিলেন রাহানে। ২০২৩ সালে চেন্নাই সুপার কিংস ও ২০২৫ সালের কেকেআরের হয়ে। কিন্তু ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেননি তিনি।

Advertisement

অতীতের সাফল্য দেখে বর্তমানে সিদ্ধান্ত নিলে তার ফল ভুগতেই হয়। সেটাই করছে কেকেআর। এই রাহানে অতীতের ছায়া মাত্র। শরদিন্দু বললেন, “রাহানে তিন বছর আগে চেন্নাইয়ের হয়ে একটা মরসুমে ভাল খেলেছিল। সেটা দেখেই তাকে দলে নিয়ে অধিনায়ক করা হল। এই সিদ্ধান্তের যুক্তি বুঝতে পারছি না। টি-টোয়েন্টি নতুন প্রজন্মের খেলা। সব দল সেই নিয়ম মানছে। শুধু কেকেআর অন্য পথে চলছে।”

অজিঙ্ক রাহানে। —ফাইল চিত্র।

পাটীদার, পরাগদের লিগে বেমানান

সব দল চলছে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে। কেকেআরই একমাত্র অতীত ছেড়ে বেরোতে পারছে না। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু রজত পাটীদারকে অধিনায়ক করেছে। পাটীদার ১৮ বছরের খরা কাটিয়ে তাদের চ্যাম্পিয়ন করেছেন। রাজস্থান রয়্যালস দায়িত্ব দিয়েছে রিয়ান পরাগকে। সেই সব দলে কি অভিজ্ঞ ক্রিকেটার নেই? আছেন। কিন্তু তরুণদের উপর ভরসা করেছে তারা।

সেখানে কেকেআর মজে রয়েছে পুরনোতেই। এই সিদ্ধান্তই বুঝতে পারছেন না ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেটার শ্রীবৎস গোস্বামী। তিনি বললেন, “কেকেআর যে কেন রাহানেকে অধিনায়ক করল ওরাই জানে। সব দল তরুণদের দিকে তাকাচ্ছে। বিরাট কোহলি থাকার পরেও বেঙ্গালুরু পাটীদারকে অধিনায়ক করেছে। রাজস্থান, চেন্নাই সব দলে তরুণ অধিনায়ক। সেখানে কেকেআর এমন একজনকে দায়িত্ব দিয়েছে, যার ভারতীয় দলে ফেরার কোনও সম্ভাবনাই নেই। পাটীদার, পরাগ, রুতুরাজদের তাগিদ আছে। ভাল খেললে জাতীয় দলে জায়গা পাবে। রাহানের তো সেই তাগিদই নেই।”

যত কাণ্ড নিলাম টেবিলে

রাহানেকে অধিনায়ক করার কোনও পরিকল্পনাই ছিল না কেকেআরের। ছিল কি? নইলে নিলামে কেন শেষ মুহূর্তে নেওয়া হল তাঁকে? পরিকল্পনা থাকলে তো শুরুতেই রাহানেকে নিত কেকেআর। রাহানের ন্যূনতম মূল্য ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকাতেই পেয়েছে কেকেআর। আর কোনও দল আগ্রহ দেখায়নি। বোঝাই যাচ্ছিল, রাহানের কী হাল।

কেন রাহানেকে শেষ মুহূর্তে নেওয়া হল তা বুঝতে পারছেন না শ্রীবৎস। তিনি বললেন, “নিলামের প্রথম পর্যায়ে রাহানেকে নেওয়া হল না। প্রথম দ্রুতগতির নিলামে নেওয়া হল না। দ্বিতীয় দ্রুতগতির নিলামে তাকে হঠাৎ কিনল কেকেআর। এই দুই নিলামের মাঝে কী এমন হল? কার ফোন এল? সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।”

অবশ্য কেকেআরের এই দলে বিকল্প কোনও অধিনায়ক নেই বলেও মনে করেন শ্রীবৎস। তিনি বললেন, “অবশ্য এই দলে তো বিকল্পও নেই। রাহানের বদলে কাকে অধিনায়ক করবে? রিঙ্কুকে জোর করে সহ-অধিনায়ক করা হয়েছে। ওর অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতাই নেই। বললাম না, নিলামেই গড়বড় করে ফেলেছে কেকেআর।”

বুঝতেই পারেন না পিচ

একজন অধিনায়কের প্রথম কাজ পিচ বোঝা। তার পর পিচ অনুযায়ী দল বাছা। টস জিতলে সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া। রাহানে তো পিচই বুঝতে পারেন না। গত বার ইডেনের পিচ প্রস্তুতকারক সুজন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাদ হয়েছিল রাহানের। ঘরের মাঠে স্পিন সহায়ক পিচ চেয়েছিলেন রাহানে। তা পাননি তিনি। প্রকাশ্যে তা নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন।

এ বারও পিচের অজুহাত দিয়েছেন তিনি। ঘরের মাঠে সানরাইজ়ার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে টস জিতে বল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ম্যাচ হেরে বলেছিলেন, “ভেবেছিলাম, দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং সহজ হবে। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে পিচ মন্থর হয়ে গেল। বুঝতে পারিনি।” পঞ্জাব কিংসের বিরুদ্ধে আবার বৃষ্টির আশঙ্কা থাকলেও টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রাহানে। ক্রিকেটের সামান্য জ্ঞান থাকলেও কেউ সেই পরিস্থিতিতে বোলিং নেবেন। পুরো খেলা হলে কেকেআর হয়তো সেই ম্যাচ হারত। রাহানের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন, হরভজন সিংহেরা। পরে অবশ্য রাহানে বলেছিলেন, “পুরো খেলা তো হয়নি। হলে ফল কী হত কে বলতে পারে।” যে অধিনায়ক পিচই বুঝতে পারেন না, তিনি টস জিতেই বা কী লাভ।

অজিঙ্ক রাহানে। —ফাইল চিত্র।

দল নির্বাচনে পরিকল্পনার অভাব

দল নির্বাচনে পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট। প্রথম একাদশই এখনও ঠিক করতে পারেননি রাহানে। কোন চার বিদেশিকে খেলানো উচিত, জানেন না। স্পিনার, পেসার, সব জায়গায় গড়বড় করছেন। কেকেআর যে খেলাটা খেলছে, তা কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে চলে না। যেখানে সব দল পাওয়ার প্লে-কে নিশানা করছে, সেখানে কেকেআর পাওয়ার প্লে-তে ধরে খেলছে। রাহানে আবার পাওয়ার প্লে-তে যেটুকু পারছেন রান করছেন। পাওয়ার প্লে শেষ হলেই তাঁর ব্যাটিং শেষ। এ ভাবে আর যা-ই হোক, ম্যাচ জেতা যায় না।

পরিকল্পনার অভাব চোখে পড়েছে শরদিন্দুরও। তিনি বললেন, “গ্রিন জীবনে কোনও দিন ছয় বা সাত নম্বরে নামেনি। কেকেআরের হয়ে নামছে। ওর সামনে স্পিনার এগিয়ে দিচ্ছে প্রতিপক্ষ। ব্যস, গ্রিন আউট। যারা রান করছে, তাদের তো বেশি বল দিতে হবে। তা না করে তাদের পরে নামানো হচ্ছে। শুরুতে রাহানে বল নষ্ট করছেন। এ ভাবে ম্যাচ জেতা যায় নাকি।”

শ্রীবৎস বুঝতে পারছেন না, কোন যুক্তিতে টিম সেইফার্ট বা রাচিন রবীন্দ্র দলের বাইরে রয়েছেন। তিনি বললেন, “গ্রিন গোটা কেরিয়ারে যা রান করেছে, তার থেকে বেশি রান এক মরসুমে করেছে সেইফার্ট। তার পরেও ওকে বাইরে রাখা হচ্ছে। চেন্নাইয়ের উইকেটে চোখ বন্ধ করে রাচিনকে খেলানো উচিত ছিল। ওর মতো সফল অলরাউন্ডারকে বাইরে রাখা হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি না, কার কথায় দল নির্বাচন হচ্ছে। কেকেআরই একমাত্র দল, যার প্রথম চার ব্যাটার ডানহাতি। বাকি সব দলের প্রথম তিনে ডানহাতি-বাঁহাতি ব্যাটার আছে। কেকেআরে একজন বাঁহাতি পেসারও নেই। তা হলে নারাইন আর বরুণের জন্য রাফ কে তৈরি করবে?”

ফুরিয়ে গিয়েছেন রাহানে

সত্যিই ফুরিয়ে গিয়েছেন রাহানে। এ বার তো ব্যাট হাতে রানও পাচ্ছেন না। ওপেন করুন, বা তিন নম্বরেই নামুন, এক অবস্থা। গুজরাত টাইটান্সের বিরুদ্ধেও প্রথম বলে শূন্য রানে ফিরেছেন। শরদিন্দু বললেন, “রাহানের মধ্যে পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। ফিল্ডিং ভুল সাজাচ্ছে। নেতিবাচক অধিনায়কত্ব করছে। আমি বুঝতে পারছি, চার জন বোলার নেই। কিন্তু যে দলের প্রধান বোলার বৈভব অরোরা, সেই দলের জেতা অসম্ভব। এখন তো ব্যাটটাও করতে পারছে না।” রাহানে ক্রমাগত চাপে পড়ছেন। এই চাপ তাঁর ব্যাটিংয়েও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

ছয় ম্যাচ জয়হীন

এ বারের আইপিএলে সকলের নীচে থাকা কেকেআরের প্রায় নিশ্চিত। ছ’ম্যাচে মাত্র ১ পয়েন্ট রয়েছে। তা-ও বৃষ্টির কৃপায়। আইপিএলের ইতিহাসে এই প্রথম কেকেআর প্রথম ছয় ম্যাচে জয় পায়নি। কেকেআর যা খেলছে তাতে এই মরসুমে কোনও ম্যাচ জেতা কঠিন। রাহানের শরীরী ভাষাতেই বোঝা যাচ্ছে, হাল ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। অধিনায়কের যখন শরীরী ভাষা এতটা নেতিবাচক, তখন দল কী ভাবে জিতবে।

দলে মনোমালিন্য

রাহানের সঙ্গে দলের বাকিদের সম্পর্ক কি ভাল রয়েছে? দল জিততে না পারলে ধীরে ধীরে অধিনায়কের উপর থেকে ভরসা চলে যায়। সেটা হচ্ছে না তো? এই প্রশ্ন তুলেছেন শ্রীবৎস। তিনি বললেন, “আগের দিন দেখলাম প্রধান কোচ অভিষেক নায়ার ও রঘুবংশীর সঙ্গে বসে রয়েছে রাহানে। তিন মুম্বইকর এক জায়গায়। আর বাকি সাপোর্ট স্টাফেরা পিছনে বসে। মনে হচ্ছে না, সাজঘরের পরিবেশ খুব একটা ভাল। লাগাতার হারলে এটা হয়।”

রাহানে হটাও স্লোগান

অনেক ধৈর্য ধরেছেন কেকেআর সমর্থকেরা। এ বার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে। রাহানেকে অধিনায়ক তো দূর, দলেই দেখতে চাইছেন না তাঁরা। রাহানে হটাও স্লোগান শুরু হয়েছে সমাজমাধ্যমে। ফলে চাপ বাড়ছে কেকেআরের উপর। এর আগেও মরসুমের মাঝে অধিনায়ক বদলের ইতিহাস রয়েছে কেকেআরে। দীনেশ কার্তিককে সরিয়ে অইন মর্গ্যানকে দায়িত্ব দিয়েছিল তারা। সেই হাল হবে না তো রাহানের?

তাতে অবশ্য ভুল কিছু নেই। টি-টোয়েন্টির জমানায় বেমানান রাহানে। যে ক্রিকেটার বাকি নয় দলের প্রথম একাদশেই জায়গা পেতেন না, তাঁকে অধিনায়ক করে ডুবেছে কেকেআর। এখন দেখার, এই যন্ত্রণা কোথায় গিয়ে শেষ হয়।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement