ICC T20 World Cup 2026

মানসিক সমস্যা, না টেকনিকে গলদ! বিশ্বকাপে কেন শূন্যের হ্যাটট্রিক অভিষেকের, কারণ খুঁজল আনন্দবাজার ডট কম

চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত একটিও রান করতে পারেননি অভিষেক শর্মা। কোথায় সমস্যা হচ্ছে তাঁর? টেকনিকে গলদ হচ্ছে? না মানসিক সমস্যায় ব্যর্থ হচ্ছেন তিনি?

Advertisement

দেবার্ক ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫১
Share:

অভিষেক শর্মা। ছবি: পিটিআই।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে অভিষেক শর্মার নাম বদলে দিয়েছিল সম্প্রচারকারী চ্যানেল। সেই ‘অভি-সিক্স’-এর তিন ম্যাচে রান এক বলে শূন্য, চার বলে শূন্য, তিন বলে শূন্য! আট বল খেলেছেন। একটি রানও করতে পারেননি আইসিসি ক্রমতালিকায় টি-টোয়েন্টির এক নম্বর ব্যাটার। কেন এই সমস্যা? কী কারণে বার বার ব্যর্থ হচ্ছেন তিনি? কারণ খুঁজে দেখল আনন্দবাজার ডট কম।

Advertisement

প্রতিযোগিতা শুরুর আগে অনেকেই বলছিলেন, এই বিশ্বকাপ অভিষেকের হতে চলেছে। এই অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপে কি ভেঙে পড়েছেন অভিষেক? বিশ্বকাপের শুরুতে পেটের সমস্যায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। কমে গিয়েছিল ওজন। খারাপ ফর্মের কি আর একটি কারণ তাঁর অসুস্থতা? শুরু হয়েছে আলোচনা।

প্রত্যাশার চাপ

বিশ্বকাপের আগে অভিষেক যে ফর্মে ছিলেন, তাতে প্রত্যাশা থাকা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যেখানে একের পর এক ম্যাচে তিনি ভারতকে জিতিয়েছেন, সেখানে সকলে তাঁর উপরেই বাজি রেখেছিলেন। এই প্রত্যাশার চাপ তাঁকে সমস্যায় ফেলেছে বলে মনে করেন সুনীল গাওস্কর। তিনি বলেন, “প্রত্যাশার চাপ হয়তো ওকে সমস্যায় ফেলছে। ও ভাবছে, প্রতিটা ম্যাচে দুর্দান্ত শুরু দিতে হবে। যদি সেই চাপ না থাকত, তা হলে হয়তো ছবিটা অন্য রকম হত।”

Advertisement

‘ভি’-তে খেলার পরামর্শ

কিন্তু বিশ্বের সেরা টি-টোয়েন্টি ব্যাটারের উপর প্রত্যাশার চাপ তো আগেও ছিল। তা হলে তখন কী ভাবে রান করতেন অভিষেক? তাঁর ব্যাটিংয়ে কিছুটা বদল নজরে পড়েছে ভারতের দুই প্রাক্তন ক্রিকেটার আকাশ চোপড়া ও হরভজন সিংহের। তাঁরা পরামর্শ দিয়েছেন, ‘ভি’ (উইকেটের সামনে লং অফ থেকে লং অন পর্যন্ত এলাকা)-তে খেলার।

হরভজন বলেন, “এই পরিস্থিতিতে মাথায় অনেক কিছু ঘোরে। আমি অভিষেককে পরামর্শ দেব, নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে। আমি জানি, যে দিন ওর ব্যাট কথা বলবে, সে দিন কাউকে দরকার পড়বে না। আশা করছি দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধেই সেই ইনিংসটা আসবে। অভিষেককে বলব, আপাতত মিড উইকেট এলাকা ভুলে যাও। উইকেটের সামনে খেলার চেষ্টা করো।”

ধারাভাষ্যকারের ভূমিকায় থাকা আকাশও সেই একই পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “অভিষেক আড়াআড়ি শট খেলার চেষ্টা করছে। ফলে বলের লাইন মিস্‌ করছে। এখন ওকে চেষ্টা করতে হবে সামনের দিকে খেলার। তাতে রান করার সম্ভাবনা বাড়বে।”

নেদারল্যান্ডস ম্যাচের আগে দেখা যাচ্ছিল, অনুশীলনে অভিষেককে সামনের দিকে শট খেলার পরামর্শ দিচ্ছেন ভারতীয় দলের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীরও। তিনি নিজে ব্যাট চালিয়ে অভিষেককে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন কোথায় খেলতে হবে। নেটে অভিষেকও সামনের দিকে খেলার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ম্যাচের সময় আবার আড়াআড়ি খেলতে গিয়ে আউট হয়েছেন তিনি।

সাফল্যের পাশে ব্যর্থতাও আসবে

ক্রিকেট কেন, যে কোনও খেলায় সারাজীবন সাফল্য পাওয়া যায় না। ব্যর্থতাও আসবে। অভিষেক ঝুঁকি নিয়ে ব্যাট করেন। যে দিন লাগে ছক্কা, নইলে আউট। কোনও ক্রিকেটার ব্যর্থতা কী ভাবে কাটিয়ে উঠছেন, সেটাই আসল। বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার শিবশঙ্কর পাল মনে করেন, অভিষেকও ফিরবেন। তিনি বললেন, “অভিষেক তো ঈশ্বর নয়। ক্রিকেট খেলতে গেলে এমনটা হতেই পারে। বাকিরা তো খেলে দিচ্ছে। অভিষেক ঠিক ঘুরে দাঁড়াবে। সুপার এইটে সুপার ব্যাটিং করবে।”

এই পরিস্থিতিতে অভিষেককে পুরনো ভিডিয়ো দেখে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন নাসের হুসেন। ইংল্যান্ডের প্রাক্তন অধিনায়ক বলেন, “আমার মনে হয়, আগামী কয়েক দিন হোটেলের ঘরে বসে ওর উচিত পুরনো ইনিংসের ভিডিয়ো দেখা। ওর খেলা ভাল ইনিংসের সংখ্যা কম নয়। সেগুলো দেখলে আত্মবিশ্বাস বাড়বে। মস্তিষ্ক সচল হবে। তা হলে দেখবেন, ওর খেলাটাই বদলে গিয়েছে।”

মানসিকতায় বদল

কঠিন পরিস্থিতিতে কি অভিষেকের মানসিকতায় বদল করা প্রয়োজন? তেমনটাই মনে করেন বাংলার ক্রিকেটার অনুষ্টুপ মজুমদার। তাঁর মতে, একই ধরনের ক্রিকেট থেকে সরে আশা উচিত অভিষেকের। অনুষ্টুপ বললেন, “বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে সকলেই তো পারফর্ম করতে চায়। কখনও-সখনও সেটা হয় না। তখন পথটাকে কিছুটা বদলে নিতে হয়। নিজের মানসিকতা বদলানো দরকার।”

একই কথা শোনা গিয়েছে গাওস্করের মুখেও। তাঁর পরামর্শ, অভিষেকের উচিত ব্যাট করতে নেমে কিছুটা সময় কাটানো। তাড়াহুড়ো না করা। গাওস্কর বলেন, “উইকেটের সব দিকে ও খেলতে পারে। তাই ব্যাট করতে নেমে ওর উচিত একটু সময় নেওয়া। প্রতি ম্যাচে চার-ছক্কা মেরে শুরু করা যায় না। প্রথমে একটা রান করতে হবে। তাতে আত্মবিশ্বাস আসে। অভিষেক যে ভাবে মেরে খেলতে পারে, তাতে যে কোনও সময় ও স্ট্রাইক রেট বাড়িয়ে নিতে পারবে। ওকে বুদ্ধি করে খেলতে হবে। সব ম্যাচ একই ভাবে খেললে হবে না।”

ঝুঁকিপূর্ণ ক্রিকেট খেললে যে আউট হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে তা সকলেরই জানা। সেই ফাঁদেই অভিষেক আউট হচ্ছেন বলে মনে করেন ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার শরদিন্দু মুখোপাধ্যায়। তবে তার জন্য খেলার ধরন বদলানোর পক্ষপাতী নন তিনি। শরদিন্দু বললেন, “অভিষেক বরাবরই হাই রিস্ক ক্রিকেট খেলে। যে দিন ওর ব্যাটে বল লাগবে, একাই ম্যাচ জিতিয়ে দেবে। আবার শূন্য রানেও আউট হতে পারে। ২০০ স্ট্রাইক রেটে খেলতে গেলে তো এ ভাবেই খেলতে হবে।”

আগামী ম্যাচগুলিতেও অভিষেক এ ভাবেই খেলবেন বলে মনে করেন তিনি। শরদিন্দু বললেন, “আমার মনে হয় না, ও পরের ম্যাচগুলোতেও খেলার ধরন বদলাবে। এটাই ওর স্বাভাবিক খেলা। বিশ্বকাপের মাঝে কিছু বদলাতে গেলে তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। বিশ্বকাপের শুরুতে ওর শরীর খারাপ হয়েছিল। সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা কঠিন। আমার মনে হয়, সুপার এইটে ও রান পাবে।”

ধরা পড়ে গিয়েছেন অভিষেক

অভিষেকের রহস্য ফাঁস হয়ে গিয়েছে বলে মনে করেন পাকিস্তানের প্রাক্তন ক্রিকেটার মহম্মদ আমির। অভিষেককে ‘স্লগার’ (চোখ বন্ধ করে যিনি ব্যাট চালান) বলে উল্লেখ করে আমির বলেন, “অভিষেক চায়, প্রতিটা বল ওর পছন্দের জায়গায় পড়ুক। যাতে ও চোখ বন্ধ করে ব্যাট চালাতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বা এক দিনের ক্রিকেটে বোলার তো সব সময় আপনার পছন্দের জায়গায় বল ফেলবে না। অভিষেককে কী ভাবে আউট করতে হবে, সেই রহস্য সকলে জেনে গিয়েছে।”

পাকিস্তানের সলমন আলি আঘা ও নেদারল্যান্ডসের আরিয়ান দত্তের বিরুদ্ধে একই ভাবে আউট হয়েছেন অভিষেক। বল মিডল স্টাম্পে পড়ে লেগ স্টাম্পের দিকে গিয়েছে। অভিষেক নিজের জায়গা থেকে সরে পিছনের পায়ে বড় শট খেলতে গিয়ে উইকেট হারিয়েছেন। বোঝা যাচ্ছে, রবিবার সুপার এইটের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাও একই পরিকল্পনা করবে। অভিষেকের বিরুদ্ধে শুরুতে বল করতে পারেন অধিনায়ক এডেন মার্করাম। তার মধ্যে কি সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে পারবেন বিশ্বের এক নম্বর টি-টোয়েন্টি বোলার? নইলে তাঁর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement