FIFA World Cup 2026

হালান্ডের জোড়া গোলে বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের ছুটি, কোয়ার্টারে নরওয়ে! জঘন্য, দিশাহীন ফুটবলে লজ্জার হার সেলেকাওদের

কঙ্কালসার অবস্থা বেরিয়ে পড়ল ব্রাজ়িলের। আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে। আগের দু’টি বিশ্বকাপে ব্রাজ়িল ছিটকে গিয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। এ বার তার থেকে এক রাউন্ড আগেই ছিটকে গেল তারা।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ ০৩:৩৪
Share:

হতাশ করল নেমারের ব্রাজ়িল। ছবি: রয়টার্স।

ব্রাজিল ১ (নেমার-পেনাল্টি)
নরওয়ে ২ (হালান্ড ২)

Advertisement

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিরুদ্ধেই দুর্বলতা বোঝা গিয়েছিল। শেষ ৩২-এ জাপান দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। তা থেকে শিক্ষাই নিল না ব্রাজ়িল। সঙ্গত কারণেই বিশ্বকাপ থেকে ছুটি হয়ে গেল তাঁদের। ছুটি করে দিলেন আর্লিং হালান্ড, যিনি সাত গোল করে বিশ্বকাপে লিয়োনেল মেসি এবং কিলিয়ান এমবাপের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন।

নরওয়ে ছিল বাকি দুই দেশের থেকে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। তাদের বিরুদ্ধে কঙ্কালসার অবস্থা বেরিয়ে পড়ল ব্রাজ়িলের। আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল নরওয়ে। আগের দু’টি বিশ্বকাপে ব্রাজ়িল ছিটকে গিয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। এ বার তার থেকে এক রাউন্ড আগেই ছিটকে গেল তারা। নরওয়ের বিরুদ্ধে না জেতার ফাঁড়া এ বারও কাটল না।

Advertisement

বিশ্বকাপের নকআউটে কোনও না কোনও দলকে হারতেই হবে। সেটাই নিয়ম। কিন্তু অনেক সময় সেই হারেও থাকে গর্ব। যেমন কিছু দিন আগে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কাবো ভার্দে হারলেও মন জয় করে নিয়েছিল। কিন্তু এ দিন ব্রাজ়িল যে ফুটবলটা খেলল, তাকে জঘন্য, দিশাহীন, লজ্জাজনক বললেও কম বলা হয়। গোটা ম্যাচে এক বারও দেখে মনে হয়নি তারা জিততে পারে। পেনাল্টি নষ্ট করেন ব্রুনো গিমারায়েস। সেটি গোল করে ম্যাচ ড্র এবং অতিরিক্ত সময় হতে পারত। তা হয়নি ভাগ্যের পরিহাসেই। কারণ ব্রাজ়িল কোনও ভাবেই এই ফুটবল খেলে যোগ্য দল হিসাবে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার অধিকারী ছিল না।

‘ভাইকিং’ হালান্ড

বিশ্বকাপ তাঁকেই মনে রাখে, যিনি বড় ম্যাচে কাজের কাজ করে দেখাতে পারেন। ঠিক সেটাই করে দেখালেন হালান্ড। তাঁর বাবা আলফি বিশ্বকাপ খেলেছেন। ছেলের সাফল্যের ধারেকাছে যেতে পারেননি। হালান্ড দেখিয়ে দিয়েছেন, অনেক দূর যাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। নরওয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ না-ও জিততে পারে। কিন্তু হালান্ডের নাম লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে। কী অসাধারণ খেলাটাই না এ দিন খেললেন তিনি। আইভরি কোস্টকে হারিয়ে নরওয়ে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর হালান্ড স্বীকার করেছিলেন, ব্রাজ়িলের বিরুদ্ধে তাঁদের জয়ের সম্ভাবনা ‘খুবই কম’। কে জানত ব্রাজ়িল এ ভাবে তাঁদের সামনে প্লেটে করে জয় সাজিয়ে দেবে! প্রথম গোলটি করলেন হেডে। ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতায় হওয়ায় এমনিই বাড়তি সুবিধা পান। ব্রাজ়‌িলের দুই ডিফেন্ডারের মাঝে লাফিয়ে হেড করতে অসুবিধাই হয়নি। দ্বিতীয় গোলটি ব্রাজ়‌িলকে আরও লজ্জায় ফেলার মতো। অন্তত তিন জন ডিফেন্ডার দাঁড়িয়েছিলেন সামনে। তাঁদের পিছনে ছিলেন ব্রাজ়িলের গোলকিপার। বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাঁ পায়ে মাটি ঘেষা শট মারলেন তিনি। সকলকে টপকে বল জালে জড়িয়ে গেল। বাড়তি কোনও উচ্ছ্বাসই দেখা গেল না তাঁর মধ্যে। যেন এ রকম গোল বাজার যাওয়ার পথে হামেশাই করে থাকেন। ম্যাচের শেষে সমর্থক এবং সতীর্থদের সঙ্গে ‘ভাইকিং রো’ করতেও দেখা গেল তাঁকে। হালান্ড বোঝালেন, তিনি লম্বা রেসের ঘোড়া।

ব্রাজ়‌িলের রক্ষণাত্মক ফুটবল

এই কি সেই ব্রাজ়িল, যেখানে খেলে গিয়েছেন রোনাল্ডো, রিভাল্ডো, রোনাল্ডিনহোর মতো ফুটবলার? তিন জনেই এ দিন নিউ জার্সির স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন। অবসর ভেঙে তারা ফিরে এলে বোধহয় কাসেমিরো, ব্রুনোদের চেয়ে ভাল খেলতেন। অন্তত এ ভাবে মাথা নিচু করে, লজ্জা নিয়ে ফিরতে হত না। নরওয়ের কাছে আগেই নিজেদের সমর্পণ করে দিয়েছিল ব্রা‌জ়িল। শুরু থেকেই ভয় নিয়ে ফুটবল খেলেছে তারা। ভাবটা এমন, যেন সামনে ফ্রান্স বা আর্জেন্টিনার মতো দল খেলছে। এত রক্ষণাত্মক ফুটবল ব্রাজ়িল কবে খেলেছে তা মনে পড়া দুষ্কর। দু’গোলে পিছিয়ে থাকার সময়েও ব্রাজ়িল অনেকটা সময় কাটিয়েছে নিজেদের অর্ধে। নিজেদের মধ্যে পাস খেলে গিয়েছে। কোনও তৎপরতাই ছিল না গোল শোধ দেওয়ার।

কেন পেনাল্টি মারলেন গিমারায়েস

গোটা ম্যাচে দু’বার পেনাল্টি পেয়েছে ব্রাজ়িল। প্রথমার্ধে পাওয়া পেনাল্টি প্রথমে মাঠের রেফারি দেননি। পরে ভার-এর হস্তক্ষেপে সিদ্ধান্ত বদলান। কিন্তু ব্রুনো যে ভাবে শটটি নিলেন, তা পাড়ার ফুটবলেও দেখা যায় না। পেনাল্টি শট মারার আগে থেমে যাওয়া এখনকার ফুটবলে খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার। তার পরেও যদি গোলকিপারের হাতে বল তুলে দিতে হয় তা হলে মুশকিল। দেখেই মনে হয়েছে, ব্রুনো মোটেই পেনাল্টি মারতে পটু নন। কেন তাঁকে পেনাল্টি মারতে দেওয়া হল। ভিনিসিয়াস ছিলেন। তিনি মারতে পারতেন। হতে পারে তিনি নিয়মিত পেনাল্টি মারেন না। ব্রাজ়িল দলে রাফিনহা বা লুকাস পাকেতা ফিট থাকলে তাঁরাই পেনাল্টি মারতেন। কিন্তু দু’জনেই চোটে। তা হলে কেন আত্মবিশ্বাসী ভিনিসিয়াসকে দেওয়া হল না শট মারতে?

কোথায় সেই ইচ্ছাশক্তি, দায়বদ্ধতা?

আগে ব্রাজ়‌িলের বিরুদ্ধে খেলতে নামলে বিপক্ষ দলগুলির ফুটবলারদের পা কাঁপত। এখন ব্রাজ়িলকে সমীহ করে, এমন দল খুব কমই রয়েছে। বিশ্বকাপ খেলতে আসা ‘বুড়ো’ ব্রাজ়িল দল এই ম্যাচের আগে সমীহ করার মতো ফুটবল খেলতেও পারেনি। তবু ফুটবলে একটি ম্যাচ অনেক বার্তা দিয়ে যায়। তাই ব্রাজ়িলের কাছেও সুযোগ ছিল সব সমালোচনার জবাব দেওয়ার। উল্টে একরাশ লজ্জা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে। ব্রাজ়‌িলের খেলার মধ্যে সেই ঝাঁঝই দেখা যায়নি কোনও সময়। পিছিয়ে পড়ার পরেও তাদের খেলায় এমন আগ্রাসন দেখা যায়নি যা নরওয়েকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। হ্যাঁ, দু’-এক বার আগ্রাসী ফুটবল খেলে নরওয়ে গোলকিপারকে ব্যস্ত করেছে ব্রাজ়িল। কিন্তু নকআউট ম্যাচ জেতার জন্য সেটা যথেষ্ট নয়। ক্লাব ফুটবলে খেলোয়াড়েরা নিজেদের এতটাই নিংড়ে দেন যে দেশের হয়ে ভাবার সময় থাকে না? সেই দায়বদ্ধতা কি আর নেই?

একাধিক সুযোগ নষ্ট ব্রাজ়িলের

এমনিতেই নরওয়ে গোটা ম্যাচে ব্রাজ়িলের উপর দাপট দেখিয়েছে। ফলে সেলেকাওরা অনেকটা সময় খেলেছে নিজেদেরই অর্ধে। ম্যাচের শেষে দেখা গিয়েছে, ৬৬ শতাংশ বল নিয়ন্ত্রণ ছিল নরওয়ের পায়ে। ব্রাজ়িলের দ্বিগুণ পাস খেলেছে তারা। তবু সেলেকাওরা যে ক’টি সুযোগ তৈরি করেছিল, তা নষ্ট করেছে নিজেদের হাতেই। সবচেয়ে সহজ সুযোগটি পেয়েছিলেন এনদ্রিক। তিনি মাঠে নামার পর দু’মিনিটও কাটেনি। মাঝমাঠ থেকে দুর্দান্ত পাস বাড়িয়েছিলেন ভিনিসিয়াস। বল সুন্দর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করেও শেষ মুহূর্তে গিয়ে সময়ের গণ্ডগোল করে ফেলেন এনদ্রিক। বুটের বাইরে দিয়ে নেওয়া শট পোস্টের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়।

আনচেলোত্তির হাতে বিকল্পের অভাব

এই ব্রাজ়িল দলে গোল করবেন কে? বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর এ বার এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে পারেন কোচ কার্লো আনচেলোত্তি। সত্যিই তো, তিনি যে দল নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে এসেছিলেন সেখানে গোল করার লোক ছিল তো? পাঁচটি গোল এসেছে ভিনিসিয়াসের পা থেকে, যিনি মোটেও স্ট্রাইকার হিসাবে খেলেন না। একমাত্র ভাল স্ট্রাইকার যিনি ছিলেন, সেই রাফিনহাও গ্রুপ পর্বেই চোট পেয়েছেন। তাই আনচেলোত্তির হাতে বিকল্পের অভাব তো ছিলই। তিনি গা জোয়ারি করে নেমারকে নিয়েছেন ঠিকই। তাতে কি আদৌ কোনও লাভ হয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজ়‌িলের শেষ গোল এসেছে নেমারের পাস থেকে। ইতিহাসে শুধু এ টুকু ছাড়া আর কিছু লেখা থাকবে না।

অসাধারণ নাইল্যান্ড

এ বারের বিশ্বকাপে গোলকিপারেরা বিশেষ করে নজর কাড়ছেন। সেই তালিকায় রবিবার রাতের পর থেকে নিঃসন্দেহে ঢুকে যেতে পারে অর্জান নাইল্যান্ডের নাম। নরওয়ের এই গোলকিপার খেলেন স্পেনের ক্লাব সেভিয়ায়। ইপিএলে অ্যাস্টন ভিলা, বোর্নমাউথের মতো ক্লাবেও খেলেছেন। এ দিন অন্তত তিন থেকে চার বার দলের পতন রোধ করলেন। পেনাল্টি বাঁচিয়ে নায়ক হয়েছিলেন প্রথমার্ধেই। কিন্তু সাধারণত গোলকিপিংয়েও তিনি নিখুঁত। ভিনিসিয়াস, ব্রুনো, কাসেমিরোর শট বাঁচালেন।

এবং নেমার

৬৭ মিনিটে তিনি মাঠে নেমেছিলেন। তবে পেনাল্টি নেওয়ার আগে বোঝাই যায়নি যে তিনি মাঠে ছিলেন। প্রথম পেনাল্টি ব্রুনো মিস্‌ করার পর দ্বিতীয় পেনাল্টির সময় এগিয়ে যায় নেমারই। নিজের স্বাভাবিক কায়দায় শট নেওয়ার আগে বার বার থমকে গিয়ে গোলকিপারকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেন এবং সফলও হলেন। তার পরেই নাইল্যান্ডের কাছে গিয়ে মাথা উঁচিয়ে কী সব বললেন। সম্ভবত জবাব দিলেন কোনও কটাক্ষের। কিন্তু তত ক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। নেমারের গোলের মিনিট খানেক পরেই রেফারি ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজান। সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে পড়েন নেমার। প্রার্থনার ভঙ্গিতে দু’হাত তুলে মাথা নিচু করে কাঁদতে থাকেন। বেশ অনেক ক্ষণ তাঁর দিকে কেউ এগিয়েও আসেননি। পরে রাফিনহা এসে শান্ত করেন তাঁকে। ফেরত পাঠান সাজঘরে। নেমার অতীতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এই বিশ্বকাপ খেলতে সব কিছু করতে রাজি তিনি। সেই সুযোগও তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বরাবরের মতো আস্থার দাম দিতে ব্যর্থ তিনি। চারটি বিশ্বকাপ খেললেন। প্রতি বারই ফিরতে হল মাথা নিচু করে। ট্রফির ধারেকাছেও যেতে পারলেন না। বিশ্বকাপে ক’টি গোল করেছেন বা পরিসংখ্যান কী, রবিবারের পর সম্ভবত আর কেউ মনেও রাখবে না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement