FIFA World Cup 2026

ফুটবল বিশ্বকাপে চুঁচুড়ার স্নেহাংশু, মোহনবাগান সমর্থককে বিশেষ দায়িত্ব ফিফার

ফুটবলের প্রতি ভালবাসা, আবেগ থেকে আবেদন করেছিলেন চুঁচুড়ার তরুণ স্নেহাংশু দত্ত। ভাবেননি ফিফার অফিসিয়াল ভলান্টিয়ারের দায়িত্ব পাবেন। আসন্ন বিশ্বকাপে ভারত মাঠে না থাক, তাঁর হাত ধরে পাশে থাকবে।

Advertisement

অভিরূপ দত্ত

শেষ আপডেট: ২৮ মে ২০২৬ ০৮:৫৯
Share:

স্নেহাংশু দত্ত। ছবি: সংগৃহীত।

আসন্ন বিশ্বকাপ ফুটবলে গুরুদায়িত্ব সামলাবেন স্নেহাংশু দত্ত। ১০ লাখ আবেদনকারীর মধ্যে থেকে চুঁচুড়ার বাঙালি তরুণকে বেছে নিয়েছে ফিফা। বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ভলান্টিয়ারের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। নিছক ফুটবলের প্রতি ভালবাসা তাঁকে এই জায়গায় পৌঁছে দেবে ভাবেননি স্নেহাংশু।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম বুধবার যখন স্নেহাংশুকে প্রথম ফোন করে, তখনও ঘুম থেকে ওঠেননি। ডালাসের আকাশে তখনও আলো ফোটেনি ভাল করে। মিনিট ২০ পর নিজেই ফোন করলেন। এক বছর আগেও রাজারহাটে অফিস করতেন। আর পাঁচ জন চাকুরিজীবী বাঙালির মতোই চলত জীবন। অফিসই তাঁকে কাজের জন্য পাঠায় আমেরিকায়। স্ত্রী দীপান্বিতা দত্তকে নিয়ে গত এক বছর ধরে ডালাসের বাসিন্দা স্নেহাংশু। এ কথা ও কথা থেকেই শুরু হয়ে গেল বিশ্বকাপের গল্প।

আনন্দবাজার ডট কম: কী ভাবে ফিফার অফিসিয়াল ভলান্টিয়ার হলেন?

Advertisement

স্নেহাংশু: গত অক্টোবরে বিজ্ঞাপন দেখে অনলাইনে আবেদন করেছিলাম। রেকর্ড প্রায় ১০ লাখ মানুষ আবেদন করেছিলেন। ২২৬টি দেশের মানুষ ছিলেন আবেদনকারী হিসাবে। তাঁদের বয়স ১৮ থেকে ৯২। অনলাইন পরীক্ষা হয় একটা। সেটার রেজাল্ট বেরোতে চার-মাস লেগেছিল। ওই সময় একটু টেনশন হত। মাঝেই মাঝেই সাইট খুলে আমার নাম খুঁজতাম। সেখান থেকে ৬০ হাজার জনকে মুখোমুখি সাক্ষাৎকারের জন্য বেছে নেওয়া হয়। সেই তালিকায় আমার নামও ছিল। ফিফা এই নির্বাচন কী ভাবে করেছিল, সেটা জানি না।

আনন্দবাজার ডট কম: কী জানতে চাওয়া হয়েছিল আপনাদের কাছে? কী কী যোগ্যতা বাধ্যতামূলক ছিল?

স্নেহাংশু: খুব সাধারণ কিছু বিষয় জানতে চাওয়া হয়েছিল। যেমন, কেন বিশ্বকাপের স্বেচ্ছাসেবক হতে চাই। ফুটবল সম্পর্কে ধারণা। আমাদের দেশের ফুটবল সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। পেশাগত দক্ষতা, কী কী ভাষা জানি— এ রকম কিছু প্রশ্ন করা হয়েছিল। দেখা হয়েছিল, দলের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে পারে কিনা। আমি যেমন বলেছিলাম, ইংরেজি ছাড়া বাংলা আর হিন্দি জানি। তার পর প্রায় ছ’হাজার জনকে নির্বাচন করা হয়েছে।

আনন্দবাজার ডট কম: বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে ছ’হাজার স্বেচ্ছাসেবক?

স্নেহাংশু: না না, এটা শুধু ডালাসের। বিশ্বকাপে তিন দেশ মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন শুনেছি।

আনন্দবাজার ডট কম: আপনাকে কী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে?

স্নেহাংশু: আমায় হোস্ট সিটি ম্যানেজমেন্টে রেখেছে। ঠিক কী কাজ করতে হবে বা কোথায় কাজ করতে হবে, সেটা এখনও বলা হয়নি আমাদের। ৬ জুন থেকে আমাদের কাজ করতে হবে। মূল স্টেডিয়ামের ভিতরে বা বাইরে কাজ দেওয়া হতে পারে। ফিফার কোনও ফ্যান পার্কে দায়িত্ব পড়তে পারে। আবার কোনও দলের শিবিরেও কাজ করতে হতে পারে। যেখানে বলবে, সেখানেই কাজ করতে হবে। বিশ্বকাপের সময় হয়তো স্থানীয় পরিবহণে কিছু ছাড় বা সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। সেটাও নিশ্চিত নয়।

সতীর্থদের সঙ্গে স্নেহাংশু দত্ত (একদম ডান দিকে)। ছবি: সংগৃহীত।

আনন্দবাজার ডট কম: তা হলে তো খেলা দেখার সুযোগ না-ও হতে পারে। লাভ কী তবে?

স্নেহাংশু: একদমই তাই। ফিফার স্বেচ্ছাসেবক মানে বিনামূল্যে খেলা দেখা যাবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। হয়তো এমন জায়গায় কাজ করতে দেওয়া হল, যেখানে ১ সেকেন্ডও খেলা দেখার সুযোগ থাকবে না। আবার এমনও হতে পারে, আমার কয়েক ফুটের মধ্যে লিয়োনেল মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আনন্দবাজার ডট কম: এত বড় ফুটবলারদের সামনে থেকে দেখার সুযোগ হতে পারে। নিশ্চই নিজস্বী বা সই নিয়ে রাখবেন?

স্নেহাংশু: একদমই নয়। আমাদের কড়া ভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, এ সব করা যাবে না। কেউ একদম পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও সই চাইতে পারব না আমরা। ছবিও তুলতে পারব না। কেউ নিজে এসে সই দিলে আলাদা কথা। আমরা নিজেরা অনুরোধ করতে পারব না। ধরা পড়লেই স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। মোদ্দা কথা, সমর্থকদের মতো কোনও আচরণ করা যাবে না। অনেকটা পেশাদারের মতো কাজ করতে হবে।

আনন্দবাজার ডট কম: তা হলে কি স্বেচ্ছাসেবকদের পারিশ্রমিক দেবে ফিফা?

স্নেহাংশু: এক টাকাও দেবে না। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রম। যাঁরা অন্য দেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে আসছেন, তাঁরাও এখানে নিজেদের খরচে আসবেন। থাকবেন, খাবেনও নিজেদের খরচে। ফিফা আমাদের শুধু পরিচয়পত্র এবং কিটস দেবে কাজ করার জন্য। বিশ্বকাপ শেষ হলে একটা সংশাপত্র দেবে বলেছে। সতর্কও করে দিয়েছে। যেমন পরিচয়পত্রের ছবি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করা বারন। ধরা পড়লে বাতিল করে দেবে। এ সব ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি এখানে।

আনন্দবাজার ডট কম: ৪৫-৫০ দিন কাজ করতে হবে। রোজগারও হবে না। অফিস সামলাবেন কী করে?

স্নেহাংশু: আমি ফিফাকে জানিয়ে দিয়েছি, শুধু শনিবার আর রবিবার কাজ করতে পারব। সপ্তাহের অন্য দিন হলে অফিসের পর। দিনে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা কাজ করতে হবে। ফিফা এটা মেনে নিয়েছে। কারণ অধিকাংশ স্বেচ্ছাসেবকই কোনও না কোনও কাজ করেন। আমি যেমন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। স্বেচ্ছাসেবকেরা অধিকাংশই কোনও না কোনও পেশায় যুক্ত। যাঁরা ছাত্র বা অবসর নিয়েছেন, তাঁদের ব্যাপারটা আলাদা।

আনন্দবাজার ডট কম: এত দিন ধরে বিশ্বকাপ নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। আপনার অফিস আপত্তি করেনি?

স্নেহাংশু: অফিসের কোনও সমস্যা নেই। অফিসের সময় ঠিক মতো কাজ করলেই হল। অফিসের বাইরে কী করছি, তা নিয়ে ওদের কোনও মাথাব্যথা নেই। আমি তো অফিসের সময় এই কাজটা করব না। এটা করব আমার অবসর সময়ে। মনের আনন্দে।

আনন্দবাজার ডট কম: টাকা নেই, খেলা দেখার সুযোগ নেই! তা হলে ফিফার অফিসিয়াল স্বেচ্ছাসেবক হলেন কেন?

স্নেহাংশু: তেমন কিছু না। নিছক ফুটবলের প্রতি ভালবাসা, আবেগ থেকে। আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক। কলকাতায় অনেক বার মাঠে গিয়েছি খেলা দেখতে। মনে হল, ডালাসে যখন আছি, তখন এত বড় একটা ইভেন্টের সঙ্গে যদি কোনও ভাবে জড়িত থাকা যায়। খুব বেশি কিছু না ভেবেই অনলাইনে আবেদন করেছিলাম। তার পর ধাপে ধাপে সব হয়ে গেল। তবে হ্যাঁ, খুব আনন্দ হচ্ছে। স্বপ্নপূরণ বলতে পারেন। এতটা আমি ভাবিনি। যাই হোক, এত বড় একটা মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ তো পাচ্ছি। এটাই বা কম কী?

আনন্দবাজার ডট কম: নির্বাচিত হওয়ার পর আপনাদের নিশ্চই প্রশিক্ষণ হয়েছে। সেই পদ্ধতিটা একটু বলুন।

স্নেহাংশু: প্রশিক্ষণ তো হয়েছেই। প্রথমে কিছু দিন অনলাইনে প্রশিক্ষণ হয়েছে। পরে এক দিন স্টেডিয়ামে নিয়ে গিয়ে প্র্যাকটিক্যাল প্রশিক্ষণ হয়েছে। মনে হয়, বিশ্বকাপ শুরুর আগে আর এক দিন প্রশিক্ষণ হবে। এখনও ঠিক জানি না। এখানে সবটাই আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর। ভীষণ ভাবে এআই বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। আমার পেশার সঙ্গে মিল থাকায় সমস্যা তেমন হচ্ছে না। সব ঠিকই আছে।

আনন্দবাজার ডট কম: আপনাদের দলে কত জন স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন? এ দেশের আর কেউ আছেন?

স্নেহাংশু: এখন আমি যে দলটায় রয়েছি, তাতে ১০০ জন মতো রয়েছে। ভারতীয় কেউ নেই। নেপালের এক জন আছেন। জাপান বা ইন্দোনেশিয়ার এক জন আছেন। অধিকাংশই আমেরিকার। ইউরোপের বাসিন্দাও কয়েক জন রয়েছেন। আমরা এক সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করছি। কোনও সমস্যা নেই। কার দেশ খেলছে, কার দেশ খেলছে না, এ সব নিয়ে কোনও চাপ নেই। এখানে আমরা সকলে স্বেচ্ছাসেবক। টুর্নামেন্টটা সুষ্ঠু ভাবে উতরে দেওয়াই প্রধান লক্ষ্য। সকলে সকলকে প্রতিনিয়ত সাহায্য করছি।

আনন্দবাজার ডট কম: ফুটবল ভালবাসেন। আপনার এখনকার শহরে বিশ্বকাপ। অথচ আপনার খেলা দেখার নিশ্চিত সুযোগ নেই। স্বেচ্ছাসেবক হয়েই বিশ্বকাপ কাটিয়ে দেবেন?

স্নেহাংশু: স্ত্রীকে নিয়ে একটা ম্যাচ দেখতে যাব। ২৬ জুন জাপান-সুইডেন ম্যাচের টিকিট কেটেছি। সে দিন স্বেচ্ছাসেবকের কাজে ছুটি নিয়েছি। তাতেও আবার শর্ত রয়েছে। খেলা দেখতে যেতে হবে সাধারণ দর্শক হিসাবে। স্বেচ্ছাসেবকের পরিচয়পত্র বা কিট সঙ্গে রাখাও যাবে না। মানে বাড়তি কোনও সুবিধা নেওয়া যাবে না।

স্নেহাংশু দত্ত। ছবি: সংগৃহীত।

আনন্দবাজার ডট কম: ডালাসে তো আর্জেন্টিনার খেলাও রয়েছে? লিয়োনেল মেসির খেলা দেখবেন না!

স্নেহাংশু:হ্যাঁ, এখানে বিশ্বকাপের মোট ন’টা ম্যাচ হবে। প্রথমত এত ম্যাচ টিকিট কেটে দেখা সম্ভব নয়। একটা ম্যাচ বেছে নিয়েছি আমি আর আমার স্ত্রী। আর্জেন্টিনা ম্যাচের টিকিটের প্রচুর দাম। সম্ভব নয়। তাই চেষ্টাও করিনি। আমি ফিফার অফিসিয়াল ভলান্টিয়ার হওয়ায় আমার স্ত্রীও দারুণ খুশি। প্রথম থেকেই আমাকে সমর্থন করেছেন।

আনন্দবাজার ডট কম: বিশ্বকাপের স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে যে অভিজ্ঞতা হবে, তা ভারতীয় ফুটবলের জন্য কাজে লাগাতে চান? কোনও পরিকল্পনা আছে?

স্নেহাংশু: এখনই তেমন কোনও পরিকল্পনা নেই। আগে অভিজ্ঞতা অর্জন করি। পরে সুযোগ পেলে অবশ্যই দেশের কোনও স্পোর্টস ইভেন্ট সফল ভাবে আয়োজনে সাহায্য করব। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে ভাবে সুযোগ পাব, সে ভাবেই করব। ফুটবল বিশ্বকাপের মতো বড় ইভেন্টের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকব। এই অভিজ্ঞতার তো একটা মূল্য থাকবেই।

মোহনবাগান সমর্থক স্নেহাংশু আত্মবিশ্বাসী। যথাযথ ভাবে ফিফার অফিসিয়াল ভলান্টিয়ারের দায়িত্ব পালন করতে চান। আপাতত তাঁর ভাবনায় শুধু বিশ্বকাপ ফুটবল। ভারত বিশ্বকাপের মাঠে না থাকুক, বাঙালি তরুণের হাত ধরে পাশে থাকবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement