আয়মেন হুসেন। ছবি: রয়টার্স।
নরওয়ের গোলকিপারকে টপকে যখন আয়মেন হুসেনের হেড জালে জড়িয়ে গিয়েছিল, তখন সেটা শুধু একটা গোল ছিল না, ছিল তাঁর জীবনের কাহিনির একটা অংশ। যে জীবন গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঘাত-প্রতিঘাত, জেদ, দুঃখ-বেদনা এবং কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে।
মঙ্গলবার নরওয়ের কাছে প্রথম ম্যাচে ৪-১ গোলে হেরে গিয়েছে ইরাক। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নজর কেড়েছেন তাদের অধিনায়ক হুসেন। আল-আমারির ক্রসে হেড করে ইরাকের হয়ে সমতা ফেরান তিনি। যদিও পরের দিকে ম্যাচে সেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি ইরাক।
তবে হুসেনের কাছে বিশ্বকাপে আসাটাই একটা জয়ের সমান। ইরাকের আল সাফারা এলাকায় জন্ম হুসেনের। আশেপাশে সব সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি ছিল। ছোটবেলায় বড় হয়েছেন চারদিকে বন্দুকের গুলির আওয়াজ, বিস্ফোরণ এবং অনিশ্চয়তা নিয়ে। ফুটবল ছিল তাঁর কাছে পালিয়ে যাওয়ার একটা অস্ত্র। কিন্তু ১২ বছরেই তাঁর জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে বড় আঘাত।
বাবা কাজ করতেন ইরাকের সেনাবাহিনিতে। নিজের বাড়ি তৈরি করার সামগ্রী কিনতে বেরোনোর সময় তিনি আল-কায়দার হাতে খুন হন। সেই বাড়ি আর কখনও তৈরি হয়নি। অতীতে এক সাক্ষাৎকারে হুসেন বলেছিলেন, “ফুটবলে আসার মূল কারণ তারকা হওয়া ছিল না। ছিল অর্থ রোজগারের একটা উপায়, যাতে বাবার তৈরি করা অসমাপ্ত বাড়ি আমি সম্পূর্ণ করতে পারি।”
কষ্ট এখানেই শেষ হয়নি। নিজের পরিবার নিয়ে চিন্তায় ছিলেন হুসেন। তাঁর মা এবং বড় ভাই সেনাবাহিনিতে কাজ করতেন। তাঁদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলেন হুসেন। কেউই রাজি হননি। এক বার তুরস্ক থেকে জাতীয় দলের একটি অনুশীলন শিবির থেকে ফেরার সময় হুসেনের কাছে সেই বিধ্বস্ত করা খবর আসে। জানতে পারেন, আইসিস নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় তাঁর দাদাকে অপহরণ করা হয়েছে। এতে পুরোপুরি ভেঙে পড়েন হুসেন। ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার কথাই ভেবেছিলেন। বাধা দেন মা।
হুসেনকে স্বপ্নপূরণের জন্য ধাওয়া করার ব্যাপারে রাজি করান তাঁর মা। সেটাই তাঁর জীবন বদলে দেয়। এর পর ইরাকের বড় বড় ক্লাব থেকে প্রস্তাব পেতে শুরু করেন হুসেন। এক সময় লক্ষ লক্ষ টাকা বেতন পাওয়া শুরু করেন এবং কালক্রমে ইরাকের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠেন। ৪০ বছর পর ফিফা বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের পেছনেও রয়েছে হুসেনের ভূমিকা।
আমেরিকায় এসেও তাঁর যন্ত্রণা শেষ হয়নি। শিকাগো বিমানবন্দরে তাঁকে সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ফোন পরীক্ষা করা হয়। এর পরে সে দেশে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়। কয়েক দিন পরে হুসেন সেটাই করেছেন, যা গোটা জীবন ধরে করে এসেছেন। কঠিন পরিস্থিতিকে অতিক্রম করে লোকের মুখে হাসি এনে দেওয়া। আমেরিকার মাটিতে নরওয়ের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ ইরাকির আশার প্রতীক হিসেবে নেমেছিলেন হুসেন। ইরাকের সমতা ফেরানোর গোল শুধু তাঁর দলের নয়, আপামর ইরাকির মনেও গেঁথে গিয়েছে।
ইরাকের কাছে তিনি শুধু একজন অধিনায়কই নন। তিনি জেদের আর এক প্রতীক।