FIFA World Cup 2026

কোনও মতে বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টারে আর্জেন্টিনা, মন জিতল কাবো ভার্দের লড়াই, মেসিদের দুর্বলতা দেখিয়ে দিলেন ভোজ়িনহারা

বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টারে উঠে গেল আর্জেন্টিনা। তবে যে ভাবে তাদের জয় অর্জন করে নিতে হল, তা কোনও ভাবেই খুশি করবে না। কাবো ভার্দের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনাকে লড়াই করতে হল ১২০ মিনিট। শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে জিতেছে আর্জেন্টিনা।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ ০৬:১৪
Share:

গোলের পর মেসির উচ্ছ্বাস। ছবি: রয়টার্স।

আর্জেন্টিনা ৩ (মেসি, লিসান্দ্রো, বোর্জেস-আত্মঘাতী)
কাবো ভার্দে ২ (দুয়ার্তে, লোপেজ়)

Advertisement

বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টারে উঠে গেল আর্জেন্টিনা। তবে যে ভাবে তাদের জয় ‘অর্জন’ করে নিতে হল, তা কোনও ভাবেই খুশি করবে না সমর্থক থেকে ফুটবলারদের। সাড়ে পাঁচ লক্ষের দেশ কাবো ভার্দের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনাকে লড়াই করতে হল ১২০ মিনিট পর্যন্ত! দু’বার এগিয়ে গিয়েও তা ধরে রাখতে পারেনি গত বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নেরা। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর গোল জয় নিশ্চিত করে। ৩-২ গোলে জিতেছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু এই জয়ে মেসিদের খুশি হওয়ার কোনও কারণ নেই। প্রি-কোয়ার্টারে তারা খেলবে মিশরের বিরুদ্ধে।

এ বারের বিশ্বকাপে উজ়বেকিস্তান, জর্ডনের মতো দেশের পাশাপাশি অভিষেক হয়েছিল কাবো ভার্দের। বাকি দলগুলি সে ভাবে ছাপ ফেলতে পারেননি। কিন্তু প্রথম বারেই কাবো ভার্দে যা খেলল তা অবাক করার মতোই। গত কয়েক বছরে ফুটবলে প্রভূত উন্নতি করেছে তারা। সে কারণেই বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে আর্জেন্টিনার মতো ধারে-ভারে অনেকটা এগিয়ে থাকা দলের সঙ্গে যে তারা এ ভাবে চোখে চোখ রেখে শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত লড়াই করবে, তা কেউ ভাবতে পারেননি। মায়ামি থেকে মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছে কাবো ভার্দে। আগামী দিনে অনেক লড়াইয়ে স্বপ্ন দেখিয়ে গেল তারা। পাশাপাশি, যে সব ছোট দেশ এখনও ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখে, তাদের কাছেও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকল কাবো ভার্দের লড়াই।

Advertisement

লিসান্দ্রোর পাস, মেসির গোল

কাবো ভার্দের রক্ষণে বার বার আটকে গিয়ে কিছুটা অধৈর্য হয়ে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলেন ফুটবলারেরাও। তার মাঝেই ২৯ মিনিটের মাথায় লিসান্দ্রো মার্তিনেজ় যে পাসটি দিলেন তার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। মেসির গোলের ক্ষেত্রে যতটা মুনশিয়ানা রয়েছে, ততটাই বুদ্ধিমত্তা রয়েছে লিসান্দ্রোর পাসে। মাঝমাঠে বল পেয়েছিলেন তিনি। দূর থেকে দেখে নিয়েছিলেন মেসি কোথায়। লম্বা বল ভাসিয়েছিলেন। কাবো ভার্দের রক্ষণ সেই পাস আন্দাজই করতে পারেনি। মেসি বল অনুসরণ করে এক পায়ে তা রিসিভ করেন। এক সেকেন্ড সময় নিয়ে কাবো ভার্দের জালে জড়িয়ে দেন বল। প্রথম পোস্ট দিয়ে গোল হজম করেন ভোজ়িনহা। মেসির শটের গতি আটকাতে পারেননি তিনি।

কাবো ভার্দের প্রাথমিক আক্রমণ

টানেল থেকে বেরিয়ে মাঠে আসার সময় কাবো ভার্দের ফুটবলারদের দেখে মনেই হচ্ছিল না তাঁরা আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে খেলতে নামছেন। সাড়ে পাঁচ লক্ষের দেশের কাছে বিশ্বকাপ খেলাই অনেক বড় ব্যাপার। কিন্তু বিপক্ষ আর্জেন্টিনা বলে আবেগে ভেসে যাননি কোনও ফুটবলার। বাড়তি কোনও সমীহ দেখাতে চাননি মেসিদের। মাঠেও সেটাই দেখা গেল। আর্জেন্টিনাকে চমকে দিয়ে শুরু থেকে আগ্রাসী ফুটবল খেলতে থাকে কাবো ভার্দে। বেশ কয়েক বার আর্জেন্টিনার বক্সে উঠে যায় তারা। অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে গোল করতে পারেনি তারা। তবে ২৯ মিনিটে গোল হজম করার পর তাদের আক্রমণ আচমকাই কমে যায়। আর্জেন্টিনার আক্রমণ সামলাতে নীচে নেমে আসে তারা।

প্রতিপক্ষকে হালকা ভাবে নিয়েছিলেন মেসিরা?

ফ্লোরিডায় এ দিন প্রচণ্ড গরম ছিল। ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই মেসি-সহ বাকি ফুটবলারদের মুখে, গায়ে ঘামের বিন্দু দেখা যাচ্ছিল। কুলিং জ্যাকেট পরে নেমেছিলেন জাতীয় সঙ্গীতের সময়। হয়তো সে কারণেই মেসিরা ঠিক করেছিলেন, এই ম্যাচে সেরা খেলা না খেললেও চলবে। কিন্তু কাবো ভার্দে যে এ ভাবে তাঁদের নাকানি-চোবানি খাওয়াবে সেটা তাঁরা ভাবতেও পারেননি। কাবো ভার্দের কিছু হারানোর ছিল না। তাই নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিল তারা। মেসিরা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। তাল মেলাতে গিয়ে তাদেরও সেরাটা দিতে হল। অনেক সময় সেরাটা দিলেও সাফল্য পাওয়া যায় না। কিন্তু কাবো ভার্দে বোঝাল, মানসিকতা, সঙ্কল্প ঠিক থাকলে যে কোনও ফলাফলই সম্ভব। তাই মেসিকেও দেখা গেল ম্যাচের শেষে একের পর এক কাবো ভার্দে ফুটবলারদের জড়িয়ে ধরলেন। ধন্যবাদ জানালেন।

মেসিকে জ়োনাল মার্কিং

প্রথম গোলের সময় মেসিকে ঠিক মতো মার্ক করতে পারেননি কাবো ভার্দের ডিফেন্ডারেরা। ফলে সামান্য সুযোগ পেয়ে সেটাই কাজে লাগিয়েছিলেন মেসি। কিন্তু ম্যাচের বাকি সময়ে মেসিকে খুব একটা বিপজ্জনক হতে দিলেন না কাবো ভার্দের ফুটবলারেরা। নির্দিষ্ট কেউ নয়, বরং কাবো ভার্দের গোটা দলই মেসিকে মার্ক করল। তাঁকে আগাগোড়া জ়োনাল মার্কিংয়ে রাখা হল। মেসির মতো ফুটবলারকে মার্ক করে রাখা সহজ কাজ নয়। কিন্তু সেটাই সফল ভাবে করলেন কাবো ভার্দের ডিফেন্ডারেরা। তাই সতীর্থদের গোলের পাস বাড়াতে পারছিলেন না মেসি। তার মধ্যেও যে ক’টি সুযোগ তৈরি করেছিলেন তা আটকে দেন ভোজ়িনহা। তবে জয়ের গোলটি এল মেসির অ্যাসিস্ট থেকেই।

ভোজ়িনহার অদম্য লড়াই

কাবো ভার্দের গোলকিপার আসলে কে, কোথা থেকে উঠে এসেছেন, বয়স কত— তা গত কয়েক দিনে গোটা বিশ্ব জেনে গিয়েছে। এ দিন জানল, ৪০ বছরেও কী ভাবে হার-না-মানা লড়াই করা যায়। শুক্রবার ভোরে পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ দেখেছিল দুই ‘বুড়ো’, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এবং লুকা মদ্রিচের লড়াই। শনিবারের ভোর দেখল আরও দুই ‘বুড়ো’, মেসি এবং ভোজ়িনহার লড়াই। মেসির অন্তত তিনটি এমন শট বাঁচিয়েছেন ভোজ়িনহো, যা থেকে গোল হতে পারত। এ ছাড়া গোটা ম্যাচে এত সেভ তিনি করেছেন যে হাতে গুণে শেষ করা যাবে না। ভোজ়িনহার জন্যই খেলা গড়াল ১২০ মিনিটে। কখনও ডান দিকে ঝাঁপিয়েছেন, কখনও বাঁ দিকে। অনবরত সতীর্থদের নির্দেশ দিয়েছেন। এই বিশ্বকাপ মনে রাখবে ভোজ়িনহাকে।

কাবো ভার্দের ‘টাফ’ ফুটবল

বিশ্বকাপে আফ্রিকা থেকে ১০টি দেশ খেলেছে। তার মধ্যে ৯টি দেশ উঠেছিল নকআউটে। এখনও পর্যন্ত মরক্কো এবং মিশর বাদে ৬টি দেশ ছিটকে গিয়েছে। তার মধ্যে কঙ্গো, আইভরি কোস্ট, সেনেগাল গোল খেয়েছে একদম শেষের দিকে। কাবো ভার্দে সেখানে এক উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। শেষ দিকে যেখানে আফ্রিকার বেশির ভাগ দলের দম শেষ হয়ে আসছে, সেখানে কাবো ভার্দে আরও বেশি লড়াই করছে। আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়ে দু’বার সমতা ফেরানো সাম্প্রতিক কালে কেউ করতে পারেনি। শারীরিক হোক বা মানসিক, আফ্রিকার দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে ‘টাফ’ ফুটবল খেলেছে কাবো ভার্দেই। তাদের হাল না ছাড়া মনোভাব বাকিদের কাছে নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণা হতে পারে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement