সুজাপুরের সাদ্দাম হোসেন খেলছেন হোমলেস ওয়ার্ল্ড কাপে। নিজস্ব চিত্র।
বাবা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভাঙা জিনিসপত্র, পুরোনো কাগজ কিনে বিক্রি করে। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর জোগাড়। খরচ না জোগাতে পারায় লেখাপড়ায় দু’বছর ছেদও পড়েছিল। এ হেন পরিবারের ছেলে সাদ্দাম হোসেন স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে বিশ্বকাপ খেলে এলেন। এমনকী, হারিয়ে এলেন আর্জেন্তিনাকেও! সেখানে অবশ্য শুধু তিনিই নন, হাজির ছিলেন এমনই গরিব ঘরের ছেলেমেয়েরা। প্রতিযোগিতাটাই যে গরিবদের নিয়ে!
সুজাপুরের ব্রহ্মোত্তর গ্রামের সাদ্দাম শুধু দলেই ছিলেন না, তিনিই ভারতের অধিনায়ক। সোমবার বাড়ি ফিরেছেন। মঙ্গলবার বিশ্বকাপের গল্পই শোনাচ্ছিলেন। যাঁদের মাথার উপরে ছাদ নেই, এমন ছেলেমেয়েদের নিয়ে এই প্রতিযোগিতা। নাম হোমলেস বিশ্বকাপ।
এই নামে একটি সংস্থা এই শতাব্দীর গোড়া থেকে প্রতিযোগিতাটি করে আসছে। এ বার ফুটবলের আসর বসেছিল গ্লাসগোয়। এগারো জনে এই খেলা হয় না। এর এক এক দলে থাকেন চার জন। তাঁদের এক জন গোলকিপার, বাকি তিন জন উঠে খেলেন।
সাদ্দামের এই বিশ্বকাপে যাওয়াটাও যেন হঠাৎই ঘটে গিয়েছে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলে আসক্ত সাদ্দাম। পেটে ভাত জুটত না ভাল ভাবে, মাথার উপরে ছাদ আছে কি নেই ঠিক ছিল না, পড়াশোনাও থেমে গিয়েছিল মাঝে। কিন্তু ফুটবল থামেনি। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সাদ্দামই বড়। সুজাপুরের নয়মৌজা সুভানিয়া হাই মাদ্রাসা থেকে পাশ করে কালিয়াচক কলেজে পড়েছেন তিনি। ফুটবল অন্তপ্রাণ সাদ্দাম মাদ্রাসায় পড়ার সময়েই জেলা ও রাজ্য স্তরের প্রতিযোগিতায় খেলে ফেলেন। কলেজে পড়ার সময় খেলেন আন্তঃ বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল প্রতিযোগিতায়।
শারীর শিক্ষা নিয়ে পড়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু গরিবের ছেলেকে বেশি দূর পড়াতে পারেননি বাবা। চাকরি নেন কলকাতায় একটি নির্মাণ সংস্থায়। তার পরে মাইনের টাকা বাঁচিয়ে ভর্তি হন শারীর শিক্ষা নিয়ে স্নাতকোত্তর কোর্সে। সেই পড়ার সময়েই অংশ নেন আন্তঃ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের ফুটবল প্রতিযোগিতায়। এটাকেই জীবনের টার্নিং পয়েন্ট বলছেন সাদ্দাম। ফেব্রুয়ারির সেই প্রতিযোগিতায় খেলার সময় তিনি চোখে পড়ে যান একটি সংস্থার।
হোমলেস ফুটবলের টিম তারাই তৈরি করছিল। সারা দেশের ৮০ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে থেকে তিনি নির্বাচিত হন। তার পরে তাঁকে ডাকা হয়ে চেন্নাইয়ের ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেই শিবিরে থাকার জন্য ইদে বাড়িতে পর্যন্ত আসতে পারেননি এ বার। শেষে জুলাইয়ের গোড়ায় পাড়ি দেন গ্লাসগোয়।
সাদ্দামের কথা মতো, এ বারের দুঃস্থ ও দরিদ্র বিশ্বকাপে ৬৪টি দেশ ছিল। তাঁরা আর্জেন্তিনা, কম্বোডিয়া এবং বুককিনাফাসোকে হারিয়ে পরের রাউন্ডে যান। কিন্তু সেখানে ইতালি, ইংল্যান্ড, আমেরিকা এবং পোল্যান্ডের কাছে চারটি ম্যাচেই হারে ভারত। সাদ্দাম জানালেন, স্ট্রাইকারে খেলে তিনি নিজে চারটি গোল করেন প্রথম রাউন্ডে। শেষে প্রতিযোগিতায় ২৪ নম্বর স্থান জোটে ভারতের।
তাতেও খুশি সাদ্দাম। বরং তিনি বলছেন, এই বিশ্বকাপ তাঁর সামনে নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের আর্থিক সহায়তায় সাদ্দাম বর্তমানে নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শারীর শিক্ষায় স্নাতোকোত্তর কোর্স করছেন। পাশাপাশি ফুটবল চালিয়ে যেতে চান তিনি। কারণ, ‘‘এটাই তো আমার জান-প্রাণ,’’ বলছেন সাদ্দাম।