সোনার কারিগর। পনেরোশো মিটারে বাংলার সুগন্ধা। বিতর্কিত দ্যুতি দ্রুততমা।
পিঙ্কি প্রামাণিক মতোই তিনি ছেলে না মেয়ে তা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের ঝড় বয়েছিল এই সে দিনও।
দ্যুতি চাঁদ—নামটা কোনও মেয়ের হতে পারে বিশ্বাস করতে চাননি বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স সংস্থার কর্তারাও। তাঁকে পাঠানো হয়েছিল নির্বাসনে। পুরুষ সাজানোর চেষ্টা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও জেদ তাঁকে এগিয়ে দিয়েছে। পিঙ্কির মতো নিজেকে মাঠ থেকে দূরে সরিয়ে নেননি। দীর্ঘদিনের মেয়ে-বন্ধুরাও তাঁর সঙ্গে এক বিছানায় শুতে চাইতেন না। এক ঘরে থাকতে চাইতেন না। দমেননি তাতেও।
পিঙ্কিকে অপমানের জ্বালা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন ডাক্তাররা। আদালতও। আর দ্যুতিকে মুক্তি দিল তাঁর পারফরম্যান্স। তিনি মেয়ে, প্রমাণ হয়েছে কয়েকমাস আগেই। কিন্তু সেটা তো ছিল শুধুই টেকনিক্যাল মুক্তি। কিন্তু আসল মুক্তি হল বৃহস্পতিবার বারবেলায়। দেশের দ্রুততমার চেয়ার হেলায় ফের কেড়ে নিয়ে তিনি বোঝালেন, পারফর্মাররা পালিয়ে যান না। বরং সঠিক মঞ্চে রং মশাল জ্বালানোর জন্য অপেক্ষা করেন। সাই স্পোর্টস কমপ্লেক্সে জাতীয় ওপেন অ্যাথলেটিক্স মিট যখন দ্যুতিচাঁদের আলোয় ঝলমলে, তাঁর দিকে তাক করছে অসংখ্য ফোটোগ্রাফারের লেন্স তখন ওড়িশার মেয়ে বলছিলেন, ‘‘যন্ত্রণার সেই দিনগুলিতে যাঁরা আমার পাশে ছিলেন তাদের সবাইকে উৎসর্গ করছি এই সোনার পদক। কি অন্ধকার দিন গিয়েছিল তখন! কিন্তু আমি জানতাম পারবই,’’ বিশেষ করে দ্যুতি কৃতজ্ঞতা জানালেন কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রীকে।
আলোয় ফিরলেও রিও অলিম্পিক্সের যোগ্যতামান ছুঁতে পারেননি রেলওয়েজের হয়ে ট্র্যাকে নামা মেয়ে। ব্রাজিলের টিকিট পেতে মেয়েদের একশো মিটারে তাঁকে সময় করতে হত ১১.৩২। করলেন ১১.৬২। তা সত্ত্বেও দ্যুতির মুখে রিও। ‘‘কাজটা কঠিন। তবুও চেষ্টা চালিয়ে যাব অলিম্পিক্সের টিকিট পাওয়ার।’’
অ্যাথলেটিক্সের জাতীয় মিটে কত হাসি-কান্না আর আবেগের যে বিস্ফোরণ ঘটছে।
যেমন ঘটল বাংলার ঘরে প্রথম সোনা এনে দেওয়া সুগন্ধা কুমারীর ক্ষেত্রে। অনেকটা এলাম, দেখলাম, জয় করলাম—যেন ঘটে গেল সাইয়ের এই অষ্টাদশীর ছাত্রীর জীবনে। প্রথমবার পনেরোশো মিটারের সিনিয়র বিভাগে নেমেই সোনা। পাঁজর বেরোন লিকলিকে চেহারা থেকে উছলে বেরোচ্ছিল আনন্দাশ্রু। হাফাতে হাঁফাতে বলছিলেন। ‘‘সোনা পাব ভাবিনি। একটা মরিয়া চেষ্টা করেছিলাম শেষ ১৫০ মিটারে। আর সেই ধাক্কাতেই সোনা এসে গেল।’’ পাশে তখন তাঁর মাস্টারমশাই কল্যাণ চৌধুরী। যিনি মণিপুর থেকে তাঁকে নিয়ে এসেছেন বাংলায়, রেখেছেন নিজের কাছে সাইতে।
বিহারের যে গ্রামে সুগন্ধার বাড়ি সেখানে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছয়নি। বাবা ক্ষেতমজুর। তাঁর হাত ঘরেই আলো জ্বলল বাংলায়। সংগঠক কর্তাদের মুখেও হাসি। একই ইভেন্টে ব্রোঞ্জ জিতলেন লীলা দাশ। বাংলা এ দিন একটা রুপোও পেয়েছে। ৪০০ মিটারে দ্বিতীয় হলেন বেথুয়াডহরির দেবশ্রী মজুমদার।
মিটে এ দিন মোট তিনটি রেকর্ড হল। শটপাটে ইন্দরজিৎ সিংহ, তিন হাজার মিটার ট্রিপলচেজে ললিতা বাবর এবং জ্যাভলিন থ্রো-তে নিরজ মিশ্র সোনা জিতলেন আগের রেকর্ড মুছে দিয়ে। এর মধ্যে সবথেকে চমক রয়েছে রিও-র টিকিট পেয়ে যাওয়া হরিয়ানার ইন্দ্ররজিতের জয়ে। সতেরো বছর আগের বাহাদুর সিংহের রেকর্ড ভেঙে দিলেন তিনি। বলে দিলেন, ‘‘আমি যুক্তরাস্ট্রে ট্রেনিং নিতে যাওয়ার জন্য সাহায্য চেয়েছি। পেলে পদক আনবই।’’ বিশাল চেহারার ছেলেটির দাবি ভুল নয়। অলিম্পিক্সের পদক পাওয়ার জন্য দরকার একের পর এক রেকর্ড মুছে দেওয়া ইন্দরজিতকে ছুঁড়তে হবে ২১ মিটার। ইতিমধ্যেই ছুড়েছেন ২০. ৬৫। ‘‘আরে আর কিছু সেন্টিমিটার ছুড়তে হবে তাঁকে। কোনও ব্যপারই নয়।’’ বলছিলেন তিনি। এ দিন অবশ্য নতুন রেকর্ড গড়লেন ১৯. ৮২ ছুড়ে।
দ্রুততম পুরুষ মণিকান্দন রাজের চার মাস আগে গাড়ির ধাক্কায় হাঁটু দুমড়ে যাওয়া সত্ত্বেও সোনা জয়। ৪০০ মিটারের সোনাজয়ী আরোক্কো রাজীবের কার্গিল যুদ্ধের স্মৃতি। বা, দ্যুতি চাঁদের আসাধারণ কাম ব্যাক—প্রতিটি সাফল্যের পিছনে কত যে গল্প। সত্যিই চমকে যেতে।
ছবি: শঙ্কর নাগ দাস।