মুকেশ: সহবাগ-সহ চার শিকার।
জীবনের প্রথম রঞ্জি ম্যাচে বীরেন্দ্র সহবাগকে পেয়ে গেলে কেমন লাগবে?
বাংলার কোনও উঠতি পেসারকে জিজ্ঞেস করা হলে নিঃসন্দেহে সে প্রশ্নকর্তাকে উন্মাদ ভাববে। আর যে ছেলে ক্লাব ক্রিকেটেই এখনও বড় নাম নয়, যে গত বছরের অর্ধেক খরচ করেছে চোট সারিয়ে প্রত্যাবর্তনে, তার বোধহয় ব্যাপারটা দিবাস্বপ্ন মনে হওয়া উচিত!
কিন্তু মুকেশ কুমার নাকি বীরেন্দ্র সহবাগকে ক্রিজে শনিবার দেখার চেষ্টাই করেননি। ভাবেননি, উল্টো দিকে যে লোকটা দাঁড়িয়ে টেস্টে তাঁর দু’টো ট্রিপল হান্ড্রেড আছে। খুঁজেছেন নিজের একটা ভাল বল, যা তাঁকে দিতে পারে একটা স্বপ্নের উইকেট।
‘‘রণ স্যর (বাংলার বোলিং কোচ রণদেব বসু) আমাকে এ দিন সকালে কথাটা বললেন। বললেন যে, সহবাগ দেখবি না। বরং নিজের বলটা খোঁজ। দেখবি, উইকেট পেয়ে যাবি,’’ হরিয়ানা থেকে ফোনে কথাটা যখন বলছিলেন মুকেশ, গলায় কোনও যৌবন-সুলভ বাড়তি আবেগ নেই। নাটকীয়তাও না।
অথচ বঙ্গ পেসারের জীবনের প্রথম রঞ্জি ম্যাচ নাটকীয়। ঠিক যতটা নাটকীয় তাঁর উত্থান।
সোজাসুজি বললে, লাহলির সবুজ পিচে এই যে বাংলা হরিয়ানা-বধের স্বপ্ন দেখছে, তার নেপথ্যে কিন্তু বঙ্গ পেসের নতুন অস্ত্র। যিনি অভিষেক রঞ্জি যুদ্ধে শুধু বীরেন্দ্র সহবাগকে বোল্ড করলেন না, সহবাগ সহ চার উইকেট তুলে (৪৯ রানে) হরিয়ানাকে তাদের মাঠেই কোণঠাসা করে ছাড়লেন। বাংলার প্রথম ইনিংসে তোলা ৩২৯ রানের জবাবে হরিয়ানার প্রথম ইনিংস এখন ১৮৬-৮ স্কোরে ধুঁকছে। রবিবার যদি শেষ দু’টো উইকেট তাড়াতাড়ি তুলে নেওয়া যায়, লিড যদি রাখা যায় একশোর কাছাকাছি, লাহলি থেকে ম্যাচের বাকি দু’দিনে পুরো ছ’পয়েন্ট তুলে ফেরার সম্ভাবনা কিন্তু প্রবল ভাবে থেকে যাবে।
এবং মুকেশ তার হুঙ্কারও দিয়ে রাখছেন। ‘‘কাল সকালে ওই দু’টো উইকেট তাড়াতাড়ি চাই। চেষ্টা করতে হবে যতটা সম্ভব বড় মার্জিনে ম্যাচটা জেতার,’’ বলছিলেন মুকেশ। বাংলা শিবিরের কেউ কেউ এমনও ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে, শেষ দু’টোর একটা মুকেশের নামের পাশে বসছেই বসছে! সহবাগের (২৮) মতো ব্যাটসম্যান যার বল ছাড়তে গিয়ে বোল্ড হয়ে যান, তার চারটে নয়। নিদেনপক্ষে পাঁচটা পাওয়া উচিত।
মজার হল, বছরখানেক আগেও মুকেশকে কেউ চিনত না। কেউ জানত না যে, ছেলেটা খেলে কোন ক্লাবে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় মস্তিষ্কপ্রসূত ‘ভিশন ২০২০’ প্রোজেক্ট সবে তখন শুরু হয়েছে। ওয়াকার ইউনিস প্রোজেক্টের তৎকালীন বোলিং কোচ। সেখানেই নাকি উদ্দেশ্যহীন ভাবে একদিন ঘুরতে দেখা যায় মুকেশকে। আর পাঁচ জন নেট বোলারের মতো বল করছিলেন। তা-ও কেড্স পরে। স্পাইকস কেনার পয়সা ছিল না। কিন্তু তাঁর বোলিং আচমকা চোখে পড়ে ভিশনের তৎকালীন সহকারি কোচ রণদেব বসুর। শোনা গেল রণদেবই আবিষ্কার করেন যে, মুকেশের বল খেলতে রীতিমতো অসুবিধে হচ্ছে বাংলা ব্যাটসম্যানদের। ওয়াকারকেও নাকি ডেকে ব্যাপারটা দেখান। প্রাক্তন পাকিস্তান পেসারেরও দ্রুত নাকি পছন্দ হয়ে যায় মুকেশকে। ওই মাঠ থেকেই তাঁর জন্য স্পাইকস কিনতে পাঠান টাউন কর্তা দেবব্রত দাস। নতুন ক্লাবও ঠিক হয়ে যায়— টাউন।
কিন্তু তার পরেও জীবন মসৃণ ছিল না। বিহারজাত বঙ্গ পেসারের সংসারে অভাব ছিল। বাবা শহরে ট্যাক্সি চালান। জানবাজারে এক স্বল্প পরিসর ঘরে থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন। গত বছর বুচিবাবু টুর্নামেন্টে একটা ম্যাচে চার উইকেট পান ঠিকই, কিন্তু সঙ্গে হাড়ের চোট নিয়েও ফিরতে হয়। শোনা গেল, চোট একটা সময় এতটাই কাবু করে ফেলেছিল মুকেশকে যে ক্রিকেটটাও ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। শোনা গেল, রণদেব এবং বাংলার ফিজিও কমলেশ জৈন সেই সময় পড়ে ছিলেন মুকেশের রিহ্যাব নিয়ে। তৎকালীন সিএবি যুগ্ম-সচিব সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সর্বাত্মক সাহায্যও পাওয়া গিয়েছিল।
যে পথ ধরে শেষ পর্যন্ত মহানাটকীয় রঞ্জি অভিষেক। ময়দান বলছে, বছর কুড়ির মুকেশের তিনটে ব্যাপার অসম্ভব ভাল। এক, তাঁর মসৃণ রান-আপ। দুই, অফ দ্য পিচ ভয়ঙ্কর। তিন, ভাল আউটসুইং দেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু যে জিনিসটা ভয়াবহ তা হল, আনপ্রেডিক্টেবিলিটি। হাফ ভলির পর চকিত এমন একটা আসতে পারে যা ব্যাটসম্যানকে নড়ার সময় দেবে না। শুধু উইকেট নিয়ে চলে যাবে! আর মুকেশ— নিজের বোলিং নিয়ে নিজে কী বলছেন?
ব্রেট লি-র অন্ধ ভক্ত শুধু বললেন, ‘‘কিছু করিনি আমি। কিছু হইওনি। যতটুকু যা দেখছেন, সব রণ-স্যরের জন্য!’’
সংক্ষিপ্ত স্কোর: বাংলা প্রথম ইনিংস ৩২৯ (চাণ্ডিলা ৬৫, পঙ্কজ ৫৪, প্রজ্ঞান ৫১, দিন্দা ৪৫) হরিয়ানা প্রথম ইনিংস ১৮৬-৮ (রোহিত ৫২ ব্যাটিং, মুকেশ ৪-৪৯)।