আগুনের সঙ্গে লড়াই দমকল কর্মীদের। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক।
পেট্রাপোলের কাছে পুরসভার ট্রাক পার্কিংয়ে আগুন লাগার পর এলাকায় দমকল কেন্দ্র তৈরির দাবি আরও জোরালো হল। শনিবার রাতে নরহরিপুরে ওই পার্কিংয়ে আগুন লেগে ভস্মীভূত হল ন’টি ট্রাক। আগুনে ক্ষতি হয়েছে আরও কয়েকটি ট্রাকের। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ক্লিয়ারিং এজেন্ট এবং ট্রাক মালিকদের দাবি, পেট্রাপোল বন্দরে দমকল কেন্দ্র থাকলে এ দিন ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই এড়ানো যেত। এছাড়া পুরসভার পার্কিংয়ের নিরাপত্তা বাড়ানো ও ট্রাকের সঙ্গে চালক খালাসিদের থাকার দাবিও উঠছে।
পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং এজেন্ট স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, “পেট্রাপোল বন্দরে সেন্ট্রাল ওয়্যার হাউজ কর্পোরেশনের ট্রাক পার্কিং আছে। সেখানে ১৪০০টি ট্রাক থাকতে পারে। বন্দর সংলগ্ন নরহরিপুর এলাকায় পুরসভার পার্কিং আছে। ওই সব ট্রাকে তুলো-সহ বিভিন্ন দাহ্য মালপত্র থাকে। আগুন লাগলে দ্রুত নেভানোর পরিকাঠামো নেই। আমরা চাই বন্দর এলাকায় একটি স্থায়ী দমকল কেন্দ্র তৈরি করা হোক।” ব্যবসায়ীরা জানানা, পেট্রাপোল বন্দর বা সংলগ্ন এলাকায় আগুন লাগলে বনগাঁ শহর থেকে দমকলের ইঞ্জিন আসে। দূরত্ব ৪ কিলোমিটার হলেও যশোর রোড বেশিরভাগ সময় ট্রাকে অবরুদ্ধ থাকে। সে সব পেরিয়ে দমকলের গাড়ি ঘটনাস্থলে আসতে সময় লেগে যায়।
পেট্রাপোল এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পরিতোষ বিশ্বাস বলেন, “ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বন্দর এলাকায় দমকল তৈরি করতেই হবে। তাছাড়া কেন্দ্র সরকার পেট্রাপোল বন্দরে আসা সমস্ত রফতানি ট্রাকগুলিকে নিজেদের দায়িত্বে নিরাপত্তা দিয়ে রাখুক। কোনও পার্কিংয়ে আমরা ট্রাক রাখতে চাই না।” পেট্রাপোল নরহরিপুর এলাকার ছয়ঘরিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান প্রসেনজিৎ ঘোষ বলেন, “আমাদের এলাকায় দেশের বৃহত্তম স্থল বন্দর। হাজার হাজার ট্রাকের যাতায়াত। কিন্তু আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত পরিকাঠামো নেই। এখানে স্থায়ী একটি দমকল কেন্দ্র তৈরির আবেদন করব সরকারের কাছে।” নরহরিপুরে পুরসভার ট্রাক পার্কিংয়ের পরিকাঠামো বাড়ানোরও দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ী, ট্রাক চালকেরা। তাঁরা জানান, ওই পার্কিংয়ের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য সিসি ক্যামেরা বসানোর প্রয়োজন। সর্বক্ষণের নিরাপত্তা কর্মীও নিয়োগ করতে হবে। এছাড়া প্রাথমিক ভাবে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
এ দিন নরহরিপুর এবং খলিতপুরের বাসিন্দারা এগিয়ে না এলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ত। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, পণ্য নিয়ে এসে ট্রাক চালকেরা নরহরিপুরের পার্কিংয়ে ট্রাক রেখে চলে যান। যে দিন বন্দরে ঢোকার কথা থাকে, সেদিন তাঁরা ট্রাকে আসেন। ফলে আপৎকালীন পরিস্থিতি হলে ট্রাক সরানোর চালক মেলেনা। যেমনটা ঘটেছে শনিবার রাতে। গ্রামবাসীরাই ফোন করে বাইরের রাজ্য থেকে আসা ট্রাক চালক ও স্থানীয় চালকদের ডেকে এনে পার্কিং থেকে অনেক ট্রাক সরানোর ব্যবস্থা করেন। নাহলে আরও অনেক ট্রাক ভস্মীভূত হতে পারত। ট্রাক চালক হাজিবুল আনসারি, রঞ্জিত কুমার, বাপন মণ্ডল, রাশেদ মোল্লারা আগুনের মধ্যে নিজেদের জীবন বিপন্ন করে পার্কিং থেকে ট্রাক সরান। গ্রামবাসী জীবন কর বলেন, “বাড়িতে বসে টায়ার ফাটার আওয়াজ পেয়ে চলে আছি। দেখি দাউদাউ করে সব ট্রাক জ্বলছে। অন্য চালকদের ফোন করে ডেকে আনি। ট্রাকের কাঁচ ভেঙে, ব্যাটারি এনে ওঁরাই ট্রাক সরান।”
স্থানীয়রা জানান, রোজ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ট্রাক পণ্য নিয়ে বনগাঁ শহরে আসে। পুরসভার ট্রাক পার্কিং ছাড়াও শহর ও সংলগ্ন এলাকায় থাকা বেসরকারি পার্কিংয়েও ট্রাকগুলি দীর্ঘদিন দাঁড়িয়ে থাকে। অভিযোগ, বেসরকারি ট্রাক পার্কিংগুলিতেও আগুন নেভানোর কোনও ব্যবস্থা নেই।
বনগাঁর পুরপ্রশাসক গোপাল শেঠ বলেন, “নরহরিপুর ট্রাক পার্কিং এলাকায় স্থায়ী একটি মোটর ও পাম্প বসানো হবে। যাতে আগুন লাগলে দ্রুত নেভানোর ব্যবস্থা করা যায়।” তিনি আরও বলেন, “আমরা চেষ্টা করব এখন থেকে দাহ্য মালপত্র নিয়ে আসা ট্রাক পাকিংয়ে না রাখার। পচনশীল দ্রবের মতো দাহ্য দ্রব্যও দিনের দিন রফতানি করা হবে। এ বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলছি।”
আগুন লাগার কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বাসিন্দারা জানান, পার্কিংয়ের মধ্যে ট্রাকের কেবিনের পাশে বসে অনেক সময় স্টোভ জ্বালিয়ে চালক খালাসিরা রান্না করেন। তা থেকে আগুন লাগতে পারে। তবে শনিবার রাতে কেউ রান্না করেননি বলেই স্থানীয় সূত্রের খবর। তাছাড়া পার্কিংয়ের মধ্যে বিদ্যুতের লাইন নেই। তাই শট সার্কিটের আশঙ্কাও নেই। স্থানীয় সূত্রের খবর, পাকিংয়ে থাকা ট্রাক থেকে পণ্য চুরির চেষ্টা হয়েছিল কয়েকদিন আগে। চালক খালাসিরা ওই সময় চোর সন্দেহে কয়েকজনকে মারধর করেছিল। তারা বদলা নিতে আগুন লাগালো কিনা তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা। অন্তর্ঘাতের সম্ভবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।