ঠাকুরবাড়ির হরিচাঁদ গুরুচাঁদ মন্দিরে প্রণাম মোদীর। নিজস্ব চিত্র ।
ওপার বাংলা থেকে আসা সমস্ত মতুয়া শরণার্থী মানুষকে ভারতের নাগরিকত্বের অঙ্গীঙ্কার করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাজ্যে দ্বিতীয় দফার ভোটের প্রাক্কালে তাঁর এই আশ্বাসে মতুয়া উদ্বাস্তু মানুষদের একাংশ আশ্বস্ত হলেও, অন্য অংশের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও হতাশা।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, “আমি সকল নমঃশূদ্র মতুয়া শরণার্থীদের বলছি, আপনাদের ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। ভারতের নাগরিকদের যে হক (অধিকার) মেলে, তা আপনারাও পাবেন। এটা মোদীর গ্যারান্টি।” এই ঘোষণায় বিশেষ করে এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তাঁদের একাংশ ভরসা খুঁজে পেয়েছেন। তবে একই সঙ্গে অনেকে আশা করেছিলেন, নির্দিষ্ট সমাধান বা স্পষ্ট বার্তা পাবেন— যা না মেলায় তাঁদের মধ্যে হতাশাও দেখা দিয়েছে। তৃণমূলকে নিশানা করে মোদী বলেন, “তৃণমূল সিএএ-র বিরোধিতা করেছে। ওরা সিএএ বাতিল করতে চায়। তৃণমূলকে ভোট দেওয়া মানে আপনাদের পূর্বপুরুষদের আত্মাকে দুঃখ দেওয়া।”
রবিবার দুপুরে তিনটি হেলিকপ্টারে করে মতুয়া ঠাকুরবাড়ির ধর্ম মহামেলার মাঠে নামেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে মতুয়াদের আরাধ্য দেবতা হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে পুজো দেন। পরে সংলগ্ন জনসভায় যোগ দেন।
বনগাঁ মহকুমার চারটি বিধানসভা কেন্দ্র— বনগাঁ উত্তর, বনগাঁ দক্ষিণ, বাগদা ও গাইঘাটায় এসআইআর প্রক্রিয়ার খসড়া ও বিবেচনাধীন ভোটার তালিকা মিলিয়ে বাদ গিয়েছে ৮৫,৩৯৬ জনের নাম। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এঁদের মধ্যে অধিকাংশই মতুয়া উদ্বাস্তু। এই পরিস্থিতিতে ভোটের অঙ্কে মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মোদীর সভায় উপস্থিত মতুয়া ভক্ত অমিত বালা, নীলকান্ত সরকারদের কথায়, “আমাদের নাগরিকত্বের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কী বার্তা দেন তা শুনতে এসেছিলাম। উনি গ্যারান্টি দেওয়ায় আশ্বস্ত হলাম। এ বার সিএএ-তে আবেদন করব।” হৃদয় বালা বলেন, “ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ায় আতঙ্ক ছিলাম। মোদী আমাদের নাগরিকত্ব নিয়ে গ্যারান্টি দেওয়ায় ভয়টা কিছুটা হলেও কেটে গেল।”
তবে বিষ্ণু বিশ্বাস ও রাখহরি সরকারের মতো অনেকেই এখনও উদ্বিগ্ন। তাঁদের বক্তব্য, “ভোটার তালিকা থেকে আমাদের নাম বাদ গিয়েছে। মোদীর সভায় এসেছিলাম আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্দিষ্ট আশ্বাস শুনতে। তেমন কিছু পেলাম না। চিন্তিত লাগছে।”
তৃণমূলের বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি বিশ্বজিৎ দাস কটাক্ষ করে বলেন, “২০১৯ সালে ঠাকুরবাড়ি এসে প্রধানমন্ত্রী মতুয়াদের নাগরিকত্বের আশ্বাস দিয়েছেন। তা হলে এত বছরেরও কেন তিনি তাঁদের নাগরিকত্ব দিতে পারলেন না। ভোটের মুখে প্রধানমন্ত্রী মতুয়াদের আবারও ভাঁওতা দিয়ে গেলেন।” তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মমতা ঠাকুরের কথায়, “প্রধানমন্ত্রী গ্যারান্টি আসলে মতুয়াদের ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর গ্যারান্টি। মতুয়াদের নাম কেন বাদ গেল প্রধানমন্ত্রী এর জবাব কেন দিলেন না?”
অন্য দিকে, বিজেপির গাইঘাটার প্রার্থী সুব্রত ঠাকুরের প্রতিক্রিয়া, “প্রধানমন্ত্রী ২০১৯ ঠাকুরবাড়িতে এসে মতুয়াদের ভরসা দেওয়ার পরে তিনি সিএএ করেছেন। এ বার তিনি মতুয়াদের নাগরিকত্বের গ্যারান্টি দিলেন। এতে মতুয়া আশ্বস্ত হয়েছেন।” কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের কথায়, “প্রধানমন্ত্রী নিজে নাগরিকত্বের গ্যারান্টি দিয়েছেন। এর থেকে আমাদের বড় পাওনা আর কি হতে পারে?”
সভায় মোদী মতুয়াদের আবেগেও নাড়া দেন। মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে প্রয়াত বড়মা বীণাপাণি ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের স্মৃতি উসকে দিয়ে বলেন, “আগের বার এসে বড়মার আশীর্বাদ পেয়েছিলাম। ভাবে বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম।” গত বিধানসভা ভোটের আগে মোদী ওড়াকান্দি গিয়েছিলেন। সে কথা তুলে ধরে মোদী বলেন “চার পাঁচ বছর আগে ওড়াকান্দিতে গিয়েছিলাম। মতুয়াদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। মন্দিরে পুজো অর্চনা দিয়েছিলাম। অদ্ভূত অনুভূতি হয়েছিল।”
এদিন ঠাকুরবাড়ি চত্বরে ছিল কড়া নিরাপত্তা। কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশের নজিরবিহীন মোতায়েন ছিল। মন্দির এলাকা ঘিরে দেওয়া হয়, সাধারণ ভক্তদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয় দুপুর পর্যন্ত। জগাই মৃধা নামে এক ভক্তের কথায়, “ভেবেছিলাম মোদীর বক্তৃতা শোনার আগে মন্দিরে নমস্কার করে কামনা সাগরের জল মাথায় ছিটিয়ে তারপরে সভায় যাব। সেটা সম্ভব হয়নি।”
এই ঘটনাকে ঘিরেও রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। মমতা ঠাকুর প্রশ্ন তুলেছেন, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন এসেছিলেন, তখন ভক্তেরা মন্দিরে যেতে পেরেছিলেন। এ দিন কেন দেওয়া হল না?”
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে