ভাড়াটের ভেক ধরে অপরাধের ছক নয় তো, নজর রাখছে পুলিশ

অনুপ্রবেশের সমস্যা উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘকালীন। নানা সময়ে বাংলাদেশের দুষ্কৃতীরা সে দেশে অপরাধ করে এ পারে এসে গা-ঢাকা দিয়ে থাকে, এমন ঘটনা বহুবার সামনে এসেছে। আবার বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা এ দেশে এসে বাসা ভা়ড়া করে থেকে ডাকাতি-সহ নানা অপরাধ ঘটিয়ে পালিয়েছে, এমন উদাহরণও বিরল নয়।

Advertisement

সীমান্ত মৈত্র

শেষ আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০১৬ ০১:৩৩
Share:

অনুপ্রবেশের সমস্যা উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘকালীন। নানা সময়ে বাংলাদেশের দুষ্কৃতীরা সে দেশে অপরাধ করে এ পারে এসে গা-ঢাকা দিয়ে থাকে, এমন ঘটনা বহুবার সামনে এসেছে। আবার বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা এ দেশে এসে বাসা ভা়ড়া করে থেকে ডাকাতি-সহ নানা অপরাধ ঘটিয়ে পালিয়েছে, এমন উদাহরণও বিরল নয়। আবার স্থানীয় দুষ্কৃতীরাও নাম ভাঁড়িয়ে বাসা ভাড়া করে থাকে বলে তথ্য আছে পুলিশের কাছে।

Advertisement

তবে অনেক ক্ষেত্রেই সে সব তথ্য পুলিশ-গোয়েন্দাদের সামনে এসেছে অপরাধ ঘটে যাওয়ার পরে। এই দুর্বলতা ঢাকতে এ বার আঁটঘাঁট বাঁধছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পুলিশ। এলাকায় নতুন আসা ভাড়াটেদের সম্পর্কে বিশদে তথ্য রাখা শুরু করেছে তারা। পুলিশ বাড়ি বাড়িও যাচ্ছে। কেউ বাড়ি ভাড়া দিলে ভাড়াটে সম্পর্কে তথ্য পুলিশকে জানাতে বলা হচ্ছে। এ ভাবে বাংলাদেশি দুষ্কৃতীদের উপরে নজর রাখা সহজ হবে বলে মনে করছেন জেলা পুলিশের কর্তারা।

জেলা পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় জানান, বাংলাদেশ থেকে দুষ্কৃতীরা এসে অনেকে ডেরা বাঁধে এ পারে। স্থানীয় দুষ্কৃতীরাও ভাড়াটে সেজে বড় কোনও অপরাধ ঘটাতে পারে। সে সব দিকে নজর রাখতে বাড়িতে আসা নতুন ভাড়াটেদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাড়ির মালিককে বলা হচ্ছে, তাঁরা যেন নতুন ভাড়াটে এলে পুলিশকে জানিয়ে রাখেন।

Advertisement

সম্প্রতি হাবরা থানার পুলিশের কাছে খবর আসে, মছলন্দপুর এলাকায় বিভিন্ন বাড়িতে বাংলাদেশিরা এসে ভাড়া নিয়ে থাকছে। তা ছাড়া, কিছু দিন আগে মছলন্দপুর এলাকার একটি বাড়ি থেকে অভিযান চালিয়ে অশোকনগর থানার পুলিশ এক বাংলাদেশি দুষ্কৃতীকে গ্রেফতার করে। ওই দুষ্কৃতী বসিরহাটের একটি ডাকাতির ঘটনায় জড়িত ছিল বলে অভিযোগ। সে-ও এ পারে বাসা ভাড়া করে থাকছিল।

কিছু দিন আগে গাইঘাটার একটি বাড়িতে চড়াও হয়ে বাড়ির লোকজনকে বেঁধে দুষ্কৃতীরা লক্ষাধিক টাকা লুঠ করে পালায়। ওই ঘটনায় বাংলাদেশি দুষ্কৃতীদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। পুলিশ জানতে পেরেছে, তারাও এলাকায় কোনও একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। অতীতে এমনও দেখা গিয়েছে, বনগাঁ-শিয়ালদহ শাখার চাঁদপাড়া, ঠাকুরনগর, হাবরা, মছলন্দপুর, গুমা, বিড়া-সহ বিভিন্ন রেলপাড় এলাকায় দুষ্কৃতীরা বাড়ি ভাড়া করে বা পরিচিতদের আশ্রয়ে থেকে অপরাধমূলক কাজ করেছে। গাইঘাটা থানার পক্ষ থেকে রেলকলোনি এলাকায় কারা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকছে, তাদের উপরে বেশি করে নজর রাখা হচ্ছে। তাদের সম্পর্কে তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। হাবরা থানার পক্ষ থেকে আবার অটোতে এ নিয়ে প্রচার চলছে।

Advertisement

রবিবার দুপুরে হাবরা থানার অধীন মছলন্দপুর পুলিশ ফাঁড়ির ওসি অতনু চক্রবর্তী বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভাড়াটেদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। স্থানীয় ফুলতলায় অমর মণ্ডল নামে এক ব্যক্তির বাড়ি থেকে তিনি তিন বাংলাদেশিকে ভাড়াটেকে গ্রেফতারও করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতদের নাম তপন সরকার, মমতা সরকার এবং প্রসেনজিৎ বৈরাগী। তাদের বাড়ি বাংলাদেশের সাতক্ষিরা এলাকায়। মাস দেড়েক আগে তারা বনগাঁ সীমান্ত দিয়ে চোরাপথে দালাল ধরে এসেছিল। ফুলতলা এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেও শুরু করে। পুলিশ জানিয়েছে, ওই দুই দালালের খোঁজ চলছে। পুলিশ বাড়ির মালিক অমরকেও গ্রেফতার করেছে। কী উদ্দেশ্যে ওই তিন বাংলাদেশি এখানে এসে বাড়ি ভাড়া করেছিল, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।

হাবরা-সহ বিভিন্ন থানার পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে মালিককে বলছে, নতুন ভাড়াটে এলে তাঁরা যেন থানায় গিয়ে তাদের সচিত্র ভোটের পরিচয়পত্রের ফটোকপি-সহ তাদের সম্পর্কে তথ্য জানিয়ে আসেন। যে সব বাড়ির মালিক তা করবেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ করবে পুলিশ।

পুলিশ জানতে পেরেছে, দুষ্কৃতীরা বেশিরভাগ কম খরচের ঘুপচি ঘরই পছন্দ করে। সেখানে থেকে সামান্য কাজ জুটিয়ে নেয়। বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কাগজ কুড়ানো, ভাঙা জিনিসপত্র সংগ্রহেরও কাজ করে। সেই অছিলায় তারা খোঁজ নেয়, কোন বাড়িতে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থাকেন। কোন বাড়ি দিনে-রাতের কোন সময় ফাঁকা ফাঁকা থাকে। কোনও বাড়ির নগদ টাকা, গয়নার থাকার সম্ভাবনা আছে। সেই সব খবরের ভিত্তিতে পরে অপারেশন চলে। দীর্ঘ দিন থাকার সুবাদে বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা দালাল ধরে আধার কার্ড, রেশন কার্ড, ভোটার কার্ডও বের করে নেয়। ফলে পুলিশ গ্রেফতার করেও তাদের আসল পরিচয় নিয়ে অনেক সময়ে ধন্ধে পড়ে।

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ভাড়াটে হিসাবে আত্মগোপন করে থাকা দুষ্কৃতীদের চিহ্নিত করাই আমাদের উদ্দেশ্যে।’’

মছলন্দপুরের এক বাড়িওয়ালা বলেন, ‘‘আমরা পুলিশকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। কিন্তু বাড়ি ভাড়া দিয়ে আমার মতো অনেকেরই সংসার চলে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে পুলিশ যেন অযথা কাউকে হেনস্থা না করে। তা হলে আমাদের রোজগারে টান পড়তে পারে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement