দেদার বিকোচ্ছে মাতলার চরের সরকারি জমি
Government Land selling

‘বিঘে প্রতি আড়াই লক্ষ দর, তবে কাগজ দিতে পারব না’

কিন্তু সে সবের তোয়াক্কা করেন না ক্যানিং তৃণমূলের কিছু নেতা। বুক ঠুকেই বেআইনি কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। বিক্রি হয়ে যাচ্ছে মাতলার চরের জমি।

Advertisement

প্রসেনজিৎ সাহা

শেষ আপডেট: ০৮ ডিসেম্বর ২০২০ ০৩:১৩
Share:

সিমেন্টের খুঁটি দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে বিক্রি হওয়া জমির সীমানা। মাতলার চরে। নিজস্ব চিত্র

বিঘে দু’য়েক জমি পাওয়া যাবে নাকি?

Advertisement

জমি কেনাবেচায় প্রশ্নটা খুবই স্বাভাবিক। তবে সেই জমি যদি সরকারি খাস জমি হয়, তা হলেই বুঝতে হবে কেনাবেচার পদ্ধতি পুরোটাই বেআইনি।

কিন্তু সে সবের তোয়াক্কা করেন না ক্যানিং তৃণমূলের কিছু নেতা। বুক ঠুকেই বেআইনি কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। বিক্রি হয়ে যাচ্ছে মাতলার চরের জমি।

Advertisement

দীর্ঘ দিন ধরেই সুন্দরবনের অন্যতম নদী মাতলায় চর পড়তে শুরু করেছে। এক সময়ে এই নদী অনেকখানি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত থাকলেও বছরের পর বছর ধরে ক্যানিংয়ের দিকে নদীতে চর জমছে। নদীর এমনই অবস্থা যে বর্তমানে ক্যানিং ১ ব্লকের মিঠাখালি, থুমকাঠি ও ক্যানিং ২ ব্লকের মৌখালি, হেদিয়ার মধ্যে যথেষ্ট সরু হয়ে বইছে। এই দুই ব্লকের মধ্যে যোগাযোগের উন্নতির জন্য একটি কংক্রিটের সেতু তৈরি করছে সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদ। আর সেই সেতু সংযোগকারী রাস্তার দু’পাশে থাকা মাতলার চরের বিঘের পর বিঘে সরকারি জমি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে। শাসক দলের নেতাদের একাংশের তাতে মদত আছে বলে অভিযোগ।

অভিযোগ, চর বিক্রির ‘দায়িত্বে’ আছেন এলাকার এক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতার কয়েকজন অনুগামী।

জমির খরিদ্দার পরিচয় দিয়ে তাঁদের একজনকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘‘বিঘে প্রতি আড়াই লক্ষ টাকা করে দর চলছে। জমির কোনও কাগজ নেই। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে জমি পাওয়া যাবে।’’ তিনি ফোনে জানালেন, আর মাত্র কুড়ি বিঘের মতো জমি আছে বিক্রির জন্য। প্রচুর খরিদ্দার প্রতিদিন আসছেন। ক্যানিংয়ের দিক থেকেই বেশি খরিদ্দার আসছেন।

যদিও জমি বিক্রির এই বিষয়টি তাঁর জানা নেই বলে মন্তব্য করেছেন ক্যানিং পূর্বের বিধায়ক শওকত মোল্লা। তাঁর কথায়, ‘‘বহু বছর ধরে নদীর চরের জমিতে যাঁদের দখল রয়েছে, যাঁরা এখানে ভেড়ি করতেন, তাঁরাই হয় তো জমি বিক্রি করছেন। এখানে অনেক জমির সরকারি পাট্টাও রয়েছে।”

বিধায়কের কথা ঘিরে আবার প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি পাট্টা পাওয়া জমি কী ভাবে বিক্রি হচ্ছে? আদৌ কি সরকারি পাট্টা পাওয়া জমি বিক্রি করা যায়?

ক্যানিং মহকুমা ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের আধিকারিক গৌতমকুমার সাঁতরা বলেন, ‘‘সরকারি পাট্টা পাওয়া জমি বিক্রি করা যায় না। উত্তরাধিকার সূত্রেই একমাত্র হস্তান্তর হতে পারে এই জমি।” স্থানীয় সূত্রের খবর, সরকারি পাট্টা দেওয়া জমি নয়, বিক্রি হচ্ছে বছরের পর বছর মাতলার চর দখল করে গজিয়ে ওঠা মেছো ভেড়িগুলিই।

নির্মীয়মাণ মৌখালি ক্যানিং সেতুর কাছেই চায়ের দোকান চালান কার্তিক গায়েন। তাঁর দখলেও বেশ কয়েক বিঘা সরকারি জমি রয়েছে। সেই জমি বিক্রি হবে কিনা জানতে চাইলে কার্তিক বলেন, ‘‘আমার যা জমি আছে, তা বিঘে প্রতি সাড়ে তিন লক্ষ করে লাগবে। আমার জমি নিলে কোনও ঝামেলা হবে না। অন্যদের কাছ থেকে জমি নিলে নানা সমস্যায় পড়তে হতে পারে। ওরা এক জমি যে কতবার বিক্রি করছে তার ইয়াত্তা নেই।” মাসখানেক আগে ক্যানিং পশ্চিমের বিধায়ক শ্যামল মণ্ডল অভিযোগ তুলেছিলেন, মাতলার চর বিক্রি হচ্ছে। নদীর চরের সেই সরকারি জমি বহিরাগতদের কাছেও বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। দিনের পর দিন সরকারি জমি এই ভাবে বেহাত হয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শ্যামল। তিনি বলেন, ‘‘ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে বিভিন্ন দফতরে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। প্রশাসনকে বলেছি, সরকারি সম্পত্তি রক্ষার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে।”

ক্যানিংয়ের মহকুমাশাসক রবিপ্রকাশ মিনা বলেন, ‘‘বিষয়টি জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে দেখব।”

সরকারি কর্তারা যত দিনে খোঁজখবর করবেন, তার মধ্যে আরও কয়েক বিঘে জমি যে বেআইনি ভাবে হস্তান্তর হয়েই যাবে, তা মোটামুটি নিশ্চিত জানেন ক্যানিংয়ের মানুষ।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement