একাদশ শতকে নির্মিত জটার দেউল। (ডান দিকে) প্রাচীন দেবীমূর্তি।
এলাকার ইতিহাস নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁদের দাবি— এই জায়গা দু’হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন।
এলাকার প্রত্নসামগ্রী যাঁরা সংগ্রহ করেন, তাঁদের সংগ্রহশালায় রয়েছে পাথরের পুথি, পাথরের হাতিয়ার, লিপি.... আরও কত কী!
তবু, রায়দিঘির ইতিহাস এবং প্রত্নসামগ্রী সংরক্ষণে সরকারি ‘উদাসীনতা’ নিয়ে তাঁদের ক্ষোভ কম নয়। এই ভূখণ্ড-সহ আশপাশের এলাকা থেকে পাওয়া প্রত্নসামগ্রী সংরক্ষণে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা দক্ষিণ ২৪ পরগনার চারটি সংগ্রহশালা কোনও সরকারি অনুদান পায় না। অর্থাভাবে ধুঁকছে সেগুলি। নষ্ট হচ্ছে প্রত্ন সামগ্রী।
মনি, ঠাকুরান, মৃদঙ্গভাঙা এবং সুতারবাগ— চারটি নদীঘেরা রায়দিঘি সুন্দরবনেরই একটি অংশ। প্রাচীন এই জনপদ থেকে কত যে প্রত্ন সামগ্রী ইতিমধ্যে মিলেছে তার ইয়ত্তা নেই। প্রত্নতত্ত্ববিদরা জানাচ্ছেন, রায়দিঘি থেকে প্রাপ্ত সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকের ধাতুর ঢালাই মুদ্রা। খ্রিস্টিয় প্রথম শতকের কুষান সম্রাট কনিষ্কের পিতা কদফিসের ছবি খোদাই করা মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে রায়দিঘির গোরাগাছিতে। রায়দিঘি ও কঙ্কনদিঘিতে পাওয়া বুদ্ধদেব, বৌদ্ধদের তারা, জৈন মূর্তি, তন্ত্র সাধনার অনুষঙ্গ, বিষ্ণুমূর্তি, মহিষমর্দিনী মূর্তি প্রমাণ করে সপ্তম শতাব্দী ও তার পরবর্তী চারশো বছর এই এলাকা সমৃদ্ধ ছিল। দিঘিরপাড় বকুলতলা থেকে পাওয়া গিয়েছে একাদশ শতকের লক্ষ্মণ সেনের তাম্রশাসন।
জেলার আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে চর্চা করেন প্রত্ন-গবেষক দেবীশঙ্কর মিদ্যা। তাঁর দাবি, “রায়দিঘি ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া প্রত্নবস্তু, টিকে থাকা স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে এই এলাকায় ধারাবাহিক ভাবে দু’হাজার বছরেরও প্রাচীন ইতিহাসের রূপরেখা পাওয়া যায়।”
দেবীশঙ্করবাবু তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে মথুরাপুরের কাশীনগরের সরবেড়িয়া গ্রামে গড়ে তুলেছেন ‘সুন্দরবন প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্র’। সেখানে স্থান পেয়েছে নানা ধরনের মৃৎপাত্র, জলনালিযুক্ত পাত্র, লিপি-খোদিত পাত্র ইত্যাদি রয়েছে। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে ওই সব প্রত্নবস্তু।
একই ছবি কৃষক দীনবন্ধু নস্করের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘খাড়ি ছত্রভোগ সংগ্রহশালা’, দক্ষিণ বিষ্ণুপুরের ‘তুলসিচরণ ভট্টাচার্য স্মৃতি সংগ্রহশালা’ বা জয়নগরের ‘কালীদাস দত্ত স্মৃতি সংগ্রহশালা’রও। ধুঁকছে সব ক’টিই। প্রতিটি সংগ্রহশালারই কর্ণধারেরা মনে করছেন, সরকারি সাহায্য না পেলে ওই সব প্রত্নবস্তু বেশি দিন সংরক্ষণ করা যাবে না। যেমন, জয়নগরের সংগ্রহশালাটি যিনি দেখভাল করেন, সেই প্রতীক ভট্টাচার্য জানান, ১৯৮৩ সালে সংগ্রহশালাটি তৈরি হয়। ১২০০ প্রত্নসামগ্রী রয়েছে। কিন্তু ভাড়াঘরে সংগ্রহশালাটি চালাতে হচ্ছে। চুরির ভয়ে সব সামগ্রী সংগ্রহশালায় রাখাও যায়নি। নিজের বাড়িতেই বাক্সবন্দি করে সে সব রাখা রয়েছে।
ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্রের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ষোড়শ শতকে এই এলাকা ছিল যশোহরের রাজা প্রতাপাদিত্য রায়ের সাম্রাজ্যভুক্ত। সে সময় খাঁড়িতে বসবাস করতেন প্রতাপাদিত্যের কাকা বসন্ত রায়। বর্তমান রায়দিঘিতে যে দিঘিটি রয়েছে, তার পাশেই ছিল একটি সমৃদ্ধ গড়। রায় রাজাদের সেই দিঘির সূত্রেই ‘রায়দিঘি’ নাম বলেই অনেকে মনে করেন।