পর পর দুর্ঘটনা, সমাধান সূত্র অধরাই

পথেঘাটে বেরিয়ে নিশ্চিন্তে নেই বসিরহাটের মানুষজন। বাড়ির ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে অশান্তির মুহূর্ত কাটাতে হচ্ছে বাবা-মাকে। ছেলে রাত পর্যন্ত ঘরে না ফিরলে না নিশুত রাতে পায়চারি বাড়ছে বৃদ্ধ বাবার। কলেজ থেকে মেয়ে না ফেরা পর্যন্ত অস্বস্তিতে দুপুরে ঘুম আসছে না মায়ের।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০১৫ ০২:৪০
Share:

পথেঘাটে বেরিয়ে নিশ্চিন্তে নেই বসিরহাটের মানুষজন। বাড়ির ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে অশান্তির মুহূর্ত কাটাতে হচ্ছে বাবা-মাকে। ছেলে রাত পর্যন্ত ঘরে না ফিরলে না নিশুত রাতে পায়চারি বাড়ছে বৃদ্ধ বাবার। কলেজ থেকে মেয়ে না ফেরা পর্যন্ত অস্বস্তিতে দুপুরে ঘুম আসছে না মায়ের।

Advertisement

বসিরহাটের পথঘাটে দুর্ঘটনার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আর উদ্বেগের কারণ সেটাই। দুর্ঘটনার কারণগুলি বিলক্ষণ জানেন এলাকার মানুষজন। সমস্যাগুলির মীমাংসার জন্য পুলিশ-প্রশাসনের দ্বারস্থও হচ্ছেন তাঁরা। দুর্ঘটনার পরে বার বার অবরোধ হচ্ছে নানা জায়গায়। কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধানসূত্র মিলছে না। আর পুলিশ-প্রশাসনও নড়ে বসছে না বলে ক্ষোভ বাড়ছে নানা মহলে।

রবিবারও ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সোলাদানা এলাকায় থাকতেন কারিমুল গাজি (২৪)। এ দিন দুপুরে বসিরহাট চৌমাথার পথে শিরীষতলার কাছে টাকি রোডে মোটরবাইকে যাওয়ার সময়ে ইঞ্জিনভ্যানের ধাক্কায় পড়ে যান তিনি। পিছন থেকে ট্রাক পিষে দেয় তাঁকে। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। সঙ্গী তিনজন সামান্য চোট পেয়েছেন। দুর্ঘটনার পরে ইঞ্জিনভ্যান এবং ট্রাকের চালক গাড়ি ফেলে পালায়।

Advertisement

আগের দিন, শনিবারও বসিরহাটের গোপালপুর পাম্পের কাছে টাকি রোডে ট্রাকের ধাক্কায় মৃত্যু হয়েছিল বাচ্চু মণ্ডল নামক এক যুবকের।

পুলিশের থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে মহকুমার বিভিন্ন রাস্তায় শুধুমাত্র মোটরবাইক দুর্ঘটনাতেই প্রায় ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

Advertisement

কী কী কারণ উঠে আসছে দুর্ঘটনার কারণ হিসাবে?

রাস্তার পাশে ফেলে রাখা ইমারতি দ্রব্য— দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসাবে উঠে আসছে এই বিষয়টি। একশ্রেণির ব্যবসায়ী রাস্তার পাশে মালপত্র ফেলে রেখেই কারবার চালাচ্ছেন। ফলে রাস্তা অপরিসর হচ্ছে। গাড়ি পাশ কাটাতে গিয়ে বা ওভারটেক করতে গিয়ে ধাক্কা মারছে পথচারীকে। কিংবা স্রেফ উল্টে পড়ছে।

কিছু দিন আগে বিয়েবাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে এসেছিলেন দেগঙ্গার বিশ্বনাথপুরের খেজুরডাঙা গ্রামের আমিনুল ইসলাম। রাস্তা ধরে হাঁটার সময়ে একটি মোটরবাইক তাঁকে ধাক্কা মারে। গুরুতর আহত অবস্থায় ওই ব্যক্তিকে বিশ্বনাথপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করানো হয়। পরে মারা যান আমিনুল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, মোটরবাইকের দু’টি চাকা রাস্তা দখল করে থাকা বালি-পাথরের উপরে উঠে পিছলে আমিনুলের উপরে পড়ে গিয়েছিল। ধাক্কা সামলাতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়েন আমিরুল। তারপর সব শেষ।

কয়েক মাস আগে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল তিন ছাত্র। বসিরহাট থানার আমতলার কাছে রাস্তার একাংশ দখল করে রাখা বালি থেকে বাঁচতে গিয়ে একটি বাস ধাক্কা মারে তাদের। রাস্তায় ছিটকে পড়ে তিনজন। পিছনে থাকা একটি লরি পিষে দেয় তাদের। মৃত্যু হয় দু’জনের। আহত একজন।

মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের মৃত্যুর পরে বসিরহাটের গোঠরা পঞ্চায়েতের লক্ষ্মণকাটি গ্রামে মৃতদের বাড়িতে গিয়েছিলেন সাংসদ ইদ্রিশ আলি। সেখানে গ্রামের মানুষ সাংসদের সামনে অভিযোগ করেন, রাস্তা আটকে ইমারতি ব্যবসা চলছে। ইদ্রিশ সে সময়ে কথা দিয়েছিলেন, রাস্তার পাশে ইমারতি ব্যবসা বন্ধ করার জন্য প্রশাসনকে কড়া ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু সাংসদের কথা যে শুধুই শুকনো প্রতিশ্রুতি মাত্র বসিরহাটের বড় রাস্তাগুলিতে ঘুরলেই সেটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

দুর্ঘটনার আরও একটা বড় কারণ হল, অবৈধ পার্কিং। রাস্তার পাশে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকে ট্রাক, গাড়ি। উল্টো দিক থেকে আসা গাড়ি দেখতে অসুবিধা হয় সে কারণে। তা ছাড়া, রাস্তাও সরু হয়ে পড়ে। বাড়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। ইদ্রিশকে জানানো হয়েছিল সে কথাও। ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ওই পর্যন্তই।

দুর্ঘটনার আরও কারণ আছে। তা হল, ইঞ্জিনভ্যানের দাপট। রবিবারের দুর্ঘটনার পরে বসিরহাটের আইসি গৌতম মিত্র জানিয়েছেন, একের পর এক দুর্ঘটনার জেরে শহরের মধ্যে ইঞ্জিনভ্যানের চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘রাস্তার পাশে অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য টাকি রোডে দুর্ঘটনা বাড়ছে। বার বার বলা সত্ত্বেও একশ্রেণির ব্যবসায়ী রাস্তার পাশে অবৈধ ভাবে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখেন। রাস্তার উপরে গাড়ি রেখে ইমারতি দ্রব্য বিক্রি হয়। তাঁদের জানানো হচ্ছে, অবিলম্বে রাস্তার পাশে অবৈধ ভাবে গাড়ি পার্কিং বন্ধ না হলে গাড়ি সিজ করা হবে।’’

পথচলতি মানুষের সচেতনতার অভাবও যে দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সে কথা মনে করেন পুলিশ-প্রশাসনের কর্তারা। রবিবারের ঘটনায় কারিমুলের সঙ্গে ওই মোটরবাইকে ছিল আরও তিন জন। এই বেপরোয়া যাতায়াত বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

কিন্তু প্রশ্ন হল, নিয়ম মেনে গাড়ি, মোটরবাইক চালানো বা হেলমেট পরা ইত্যাদি একদিকে যেমন নাগরিকের দায়িত্ব, তেমনই পুলিশও কি সব দেখে চোখ বুজে থাকতে পারে? ধরপাকড় মাঝেমধ্যেই চলে, জানাচ্ছেন পুলিশ কর্তারা। কিন্তু তা কি যথেষ্ট, উত্তর নেই কর্তাদের কাছেও। আর সীমিত সংখ্যক পুলিশ কর্মী নিয়ে চলা থানাগুলির পক্ষে সব সময়ে সব রাস্তায় এ ধরনের নজরদারি যে বাস্তবসম্মত নয়, তা জানেন বাসিন্দারাও। সে ক্ষেত্রে নিজেদেরই সচেতন হতে হবে, বললেন শহরবাসীর অনেকেই।

কিন্তু রাস্তার পাশে ইমারতি দ্রব্যের ব্যবসা বা বেআইনি পার্কং বন্ধের কী হবে?

প্রতি ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার পরে সমস্যা সমাধানের পাকাপাকি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। অবরোধ হয়। আবার সব মিটে গেলে সকলে সব ভুলেও যায়। আবার ঘটে দুর্ঘটনা, আবার অবরোধ, আবার বিক্ষোভ...।

পুলিশের কর্তারা বলছেন, রাস্তার পাশ থেকে ইমারতি দ্রব্য সরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরসভা এবং পূর্ত দফতরকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়াও, কেউ অবৈধ ভাবে পার্কিং করলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রাস্তা আটকে পার্কিং, ব্যবসা না করার জন্য পোস্টার দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এ নিয়ে লাগাতার অভিযান পুলিশ-প্রশাসনের তরফে দেখা যাচ্ছে না বলে জানাচ্ছেন বসিরহাটবাসী।

সংগ্রামপুর-স্বরূপনগর, হাসনাবাদ-দেগঙ্গা, ইটিন্ডা-ত্রিমোহনি কিংবা চৌমাথা-ন্যাজাট, টাকি রোডে ঘুরে দেখা গেল, রাস্তার পাশে ফেলা রাখা হয়েছে ইমারতি দ্রব্য। দাঁড়িয়ে রয়েছে সার সার গাড়ি। রাস্তা অপরিসর হয়ে প়ড়ছে। এ দিকে, দিন দিন রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। সব মিলিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা।

কিছু দিন আগের কথা। বাবার কিনে দেওয়া নতুন সাইকেল চালিয়ে মামার বাড়ি যাচ্ছিল হাসানুর। স্বরূপনগরের তেঁতুলিয়া সেতুর সামনের রাস্তার পাশে ফেলে রাখা বালি-পাথরের জন্যই প্রাণ গিয়েছিল স্বরূপনগর বাসস্ট্যান্ড এলাকার সপ্তম শ্রেণির ছাত্র হাসানুর মোল্লার। তেঁতুলিয়া সেতুর মুখে ইমারতি মালের চাপে সরু হয়ে যাওয়া রাস্তায় লাইসেন্সবিহীন একটি যাত্রিবাহী গাড়ি তাকে ধাক্কা মারে। ছিটকে রাস্তায় পড়ে যায় হাসানুর। ইট-বোঝাই একটি ট্রাক তাকে পিষে দিয়ে চলে যায়। ঘটনার পর দফায় দফায় রাস্তা অবরোধ হয়েছিল। রাস্তার পাশ থেকে বালি-পাথর সরানো হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পুলিশ। কিন্ত ওই পর্যন্তই। কিছু দিন পরে রাস্তার দু’পাশ ফের ইট, বালি, পাথরে ভরে যায়।

যে সব গাড়ির ধাক্কায় প্রাণহানি হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে, সেগুলির লাইসেন্স, কাগজপত্র অনেক কিছু নেই বহু ক্ষেত্রেই। ফলে দুর্ঘটনার পরে বিমার টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়ছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যেরা।

পুরপ্রধান তপন সরকার জানালেন, রাস্তার ধারে গাড়ি না রেখে পার্কিয়ের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতে বলা হচ্ছে।

কিন্তু সে যে শুধুই কথার কথা, দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতায় তা বিলক্ষণ জানেন বসিরহাটবাসী।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement