এ পার থেকেই ও পারের পরিজনদের দেখা।—নিজস্ব চিত্র।
গাইঘাটার ঝিকরা এলাকার এক গৃহবধূ তাঁর বছরের দুয়েকের ছেলে নিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে পেট্রাপোল সীমান্তে হাজির হয়েছিলেন। পেট্রাপোল বিএসএফ ক্যাম্পের এক পাশে প্রতি বছরের মতো এবারও ঘটা করে মনসা পুজোর আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু পুজো দেখাই কি কেবল উদ্দেশ্য?
ছেলেকে কোলে নিয়ে ওই বধূ খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন দীর্ঘক্ষণ। ওপারের ভিড়ের মধ্যে থেকে এক প্রৌঢ়া চিৎকার করে তাঁর নাম করে ডাকতেই দেখা হয়ে গেল মা-মেয়ের। নাতিকে দূর থেকে এক পলক দেখলেন বৃদ্ধা। মেয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে হাত নাড়লেন। কথা অবশ্য বলা সম্ভব হয়নি। তার আগেই জওয়ানেরা তাঁদের সেখান থেকে সরিয়ে দেন। তবে ওইটুকু দেখাতেই ভীষণ খুশি বধূ। জানালেন, ‘‘প্রতি বছর মনসা পুজোর দিন এখানে এসে মাকে ওই ভাবেই একবার দেখে যাই।’’
আদতে ওই বধূ বাংলাদেশী। বিয়ের পর এদেশের বাসিন্দা। সীমান্তের ওপারের কাছেই তার বাপের বাড়ি। মনসা মন্দিরের পিছনে দিয়ে বয়ে-যাওয়া হাকোর খাল দুটি দেশকে আলাদা করেছে। গাইঘাটার ওই গৃহবধূই নন,আরও বহু মানুষ এদিন ভিড় করেছিলেন ওপারের আত্মীয়স্বজন, পরিচিতদের সঙ্গে দূর থেকে দেখা করতে। খালের দু’পারেও ভিড়ে মিশে-থাকা মানুষেরা পুজো কেন্দ্র করে এভাবেই মেতে ওঠেন প্রতি বছর। অতীতে অবশ্য এতটা কড়াকড়ি ছিল না। পুজো দেখতে ওপারে মানুষদের ছাড় দেওয়া হত কিছু সময়ের জন্য। তাঁরা এসে খিচুড়ি প্রসাদ খেয়ে যেতেন। গত কয়েক বছর ধরে সে সবের পাট চুকেছে। এখন পুজো দেখা মানে দূর থেকে স্বজনদের দেখা এবং হাত নাড়া। তা সত্তেও পুজোকে কেন্দ্র করে দুই বাংলার মানুষের আবেগ কমেনি।
আজ থেকে প্রায় ২৩ বছর আগে পেট্রাপোল সীমান্তে এই পুজোর সূচনা করেছিলেন এক বিএসএফ কর্তা। পুজোর শুরুর পিছনেও আছে এক কাহিনি। কী রকম? বন্দরে বিভিন্ন কাজে-আসা মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, একবার সীমান্তে পাহারা দেওয়ার সময় ওই বিএসএফ কর্তা নাকি পঞ্চমুখী সাপ দেখেন। তারপর তিনি সেখানে মনসা মন্দির তৈরি করিয়ে পুজোর সুচনা করেন।
দিনে দিনে ওই পুজোর ব্যাপ্তি বেড়েছে অনেকটাই। এদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পুজো দেখতে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন। পেট্রাপোল বন্দরে বসে মেলা।
বন্দর এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, ওপার বাংলা থেকে কাউরে আসতে দেওয়া না হলেও, এ পারের সাধারণ মানুষের জন্য এ দিন নিরাপত্তা কিছুটা হলেও শিথিল ছিল। বিএসএফ ক্যাম্পের মধ্যে দিয়েই মনসার মন্দিরে গিয়েছেন শয়ে শয়ে মানুষ। অন্য দিনের মতো কড়াকড়ি করেননি সীমান্তরক্ষীরাও।