বেদান্তের বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন। ছবি: সংগৃহীত।
তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বয়লারে যে নলগুলির মধ্যে দিয়ে গরম বাতাস যায়, তার একটিতে ফাটল ধরেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে সেটি ফেটে যায়। তার অভিঘাতে এখন পর্যন্ত পুড়ে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। ছত্তীসগঢ়ের সক্তী জেলার সিংহিতারাই গ্রামে বেদান্তের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে মঙ্গলবারের এই দুর্ঘটনায় মৃতদের মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের ৫ জন শ্রমিক। তা ছাড়া ছত্তীসগঢ়ের ৫, ঝাড়খণ্ডের ৩ ও উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারের দু’জন করে শ্রমিক। সক্তী জেলার পুলিশ সুপার প্রফুল্ল ঠাকুর বুধবার জানিয়েছেন, এখনও ১৯ জন গুরুতর জখম। ফলে প্রাণহানি বাড়তে পারে। জখমদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। সূত্রের খবর, দুর্ঘটনার সময়ে ওই শ্রমিকরা রং করা এবং রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছিলেন। প্রফুল্ল আরও বলেছেন, ভিতরে আর কেউ আটকে নেই। মৃতদের মধ্যে ৫ জন করে পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তীসগঢ়ের, ৩ জন ঝাড়খন্ডের, ২ জন করে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারেরশ্রমিক রয়েছেন।
হলদিয়া তৈল শোধনাগার থেকে সম্প্রতি কাজ চলে গিয়েছিল শেখ সৈফুদ্দিনের (৩৮)। হলদিয়ারই চাপিপানার বাসিন্দা সৈফুদ্দিন তার পরে যোগ দেন বেদান্তের এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে। এর মধ্যে এসআইআরে তথ্যে অসঙ্গতির জন্য তাঁকে নোটিস দেওয়া হয়। বাড়িও এসেছিলেন। সেই কাজ শেষ হলে সিংহিতারাইয়ে ফিরে যান। বাড়িতে তাঁর স্ত্রী, এক ছেলে ও মেয়ে রয়েছে। তাঁরা বার বারই বলছিলেন, আর ক’টা দিন যদি থেকে যেতেন, তা হলে এই অঘটন ঘটত না।
দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের বাসিন্দা, বছর পঞ্চাশের শিবনাথ মুর্মু। গুরুতর জখম পুরুলিয়ার জেলারই কেন্দা থানার বেলগোড়া গ্রামের যুবক কার্তিক মাহাতো বুধবার মারা গিয়েছেন। যদিও বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরুলিয়া জেলা পুলিশের কাছে এ ব্যাপারে কোনও খবর আসেনি। শিবনাথের মামা অরুণচন্দ্র টুডু বলেন, ‘‘মাসখানেক আগে শিবনাথ কাজে যান। তাঁর সঙ্গীরা জানিয়েছে, বিস্ফোরণে তিনি মারা গিয়েছেন। ওঁর ছেলে-স্ত্রীকে খবরটা দিয়ে উঠতে পারিনি।’’ কার্তিকের আত্মীয় পর্ণ মাহাতো বলেন, ‘‘বুধবার সকালে কারখানায় বিস্ফোরণের খবর পেয়েছি। এখান থেকে কয়েক জনকে পাঠানো হয়েছে।’’ সৈফুদ্দিন ছাড়াও ওই বিস্ফোরণে মারা গিয়েছেন পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুর-১ ব্লকের তেথিবাড়ির বাসিন্দা একুশ বছরের সুশান্ত জানা। প্রশাসনের কাছে কোনও খবর না থাকলেও সুশান্তের দাদা প্রশান্ত বলেন, ‘‘আমরা খুব গরিব। ভাই এই কাজ করে সংসারে আর্থিক সাহায্য করত। এমন মর্মান্তিক পরিণতি হবে ভাবিনি।’’ পূর্ব মেদিনীপুরেরই আর এক বাসিন্দা এই বিস্ফোরণেমারা গিয়েছেন।
ঘটনাস্থলের কাছেই শ্রমিকদের আবাস। সেখানে থাকেন পশ্চিমবঙ্গেরই অজিত দাস। তিনি বলছিলেন, ‘‘মনে হল ঠিক যেন ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়ল। আমরা দুপুরের খাওয়া শেষ করে উঠেছিলাম। তখনই বিস্ফোরণ। চারিদিক কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়।’’
ছত্তীসগঢ়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণুদেব সাই এই বিস্ফোরণকে ‘অত্যন্ত মর্মান্তিক’ বলে আখ্যা দিয়ে মৃতদের পরিবার পিছু ৫ লক্ষ টাকা ও আহতদের পরিবার পিছু ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করেছেন। বিলাসপুরের ডিভিশনাল কমিশনারকে উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়ে দোষীদের কঠিন শাস্তির দাবিও জানান। জেলা প্রশাসনের তরফে আলাদা করে ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেদান্তও অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে। তারা জানিয়েছে, তাদের প্রকল্পের দায়িত্ব অন্য একটি সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল। সেই সংস্থার ২৪ জন কর্মী বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের চিকিৎসা ও সহায়তা প্রদানই এখন মূল লক্ষ্য। সক্তী জেলার কালেক্টর বা জেলাশাসক অমৃত বিকাশ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মৃতদের ৩৫ লক্ষ ও আহতদের ১৫ লক্ষ টাকা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তরফে দেওয়া হবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে