অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
অভিষেক বলেন, ‘‘মদনমোহনে পুজো দিলাম। গীতায় ৭০০ শ্লোক রয়েছে। বিজেপির নেতারা বলতে পারবে একটাও?’’ গীতার পঞ্চম অধ্যায় ১৮ নম্বর শ্লোকের কথা মনে করান অভিষেক। মানুষ তো বটেই, পিপড়ে, কুকুরের মধ্যেও শ্রীকৃষ্ণ বিরাজমান। চিকেন প্যাটিস বিক্রি করেছে বলে মেরেছে। সব পরিযায়ী পাখি। ভোটের সময়ে আসে। ২ লক্ষ কোটি টাকা ওরা আটকেছে। তৃণমূল লড়ে বাংলার টাকা বাংলায় ফেরাবে। আগামী ১২০ দিন নির্বাচন পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, লড়াই রাজনৈতিক নয়। আমাদের অপমানিত, শোষিত করেছে। তার বিরুদ্ধে লড়াই। কোচবিহারের মাটিকে বাংলাদেশ বলে দাগিয়েছে, তাদের শিক্ষা দেওয়ার লড়াই। বলুন জয় বাংলা।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘যারা ধর্মীয় রাজনীতি করে, তারা রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া। আমরা ধর্মে ধর্মে বিভাজন করিনি। নিশীথ, শুভেন্দু, সুকান্তকে জিজ্ঞেস করুন, বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে, রাত ২টোর সময়ে অ্যাম্বুল্যান্সের চালককে জিজ্ঞেস করো, তাঁর ধর্ম কী? বিমানের চালক, টোটোর চালককে জিজ্ঞেস করো তাঁর ধর্ম কী? যখন মালা কেন বাজারে, তখন জিজ্ঞেস করো বিক্রেতার ধর্ম? সে হিন্দু না মুসলমান? আমাদের মধ্যে বিভাজন কেন? ধর্ম করব, বাড়িতে করব। মানুষের ভোটে নির্বাচিত, আমাদের কোনও ধর্ম নেই। কার কর্মসংস্থান, কার বাড়ি, জল প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে হবে।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘নিশীথ প্রামাণিক প্রাক্তন। বাকি যে ক’টা আছে, তার মতোই প্রাক্তন করতে হবে। কী ঔদ্ধত্য, অহঙ্কার! পরিযায়ী সাংসদ। থাকতেন দিল্লিতে। মাঝে মাঝে এলে পালাতেন। আপনার রিপোর্ট কার্ড কোথায়? ১২ বছর সরকার ক্ষমতায়। এক-একটি বিধানসভায় কোচবিহারে ৯৮০ কোটি টাকা দিল্লির সরকার আটকে রেখেছে। এই টাকা ছিনিয়ে আনতে লড়তে হবে। মোদী মিটিং করে বলছেন, বাঁচতে চাই, বিজেপি চাই। বিজেপি রাজবংশীদের অভিমানে আঘাত দিয়ে কোচবিহারকে বিহারে পরিণত করতে চায়। আমরা কোচবিহার করে রাখতে চাই।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘ইডিকে পাঠিয়ে তৃণমূলকে জব্দ করতে চেয়েছিল, নিজেরাই জব্দ হয়েছে। দেখেছেন? যারা নোটিস পেয়েছে, সবার নাম যেন ভওটার তালিকায় থাকে, তৃণমূলের কর্মীদের সুনিশ্চিত করতে হবে। যাঁরা লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট পাচ্ছেন, মনে মনে বলবেন, এদের একটাও ভোট দেবেন না। নোটবন্দির পরে ভোটবন্দির নামে লাইনে দাঁড় করিয়েছে। ’’
অভিষেক বলেন, ‘‘আসুন লড়াই করবেন? ১০-০ গোলে মাঠের বাইরে পাঠাব। গরিব যুবক পেটের দায়ে চিকেন প্যাটিস বিক্রি করছে বলে তাঁকে মারছে। ৭০টা আসন নিয়ে এ রকম করছে। কে কী বিক্রি করবে বিজেপির বাবারা ঠিক করবে? আমি কী দিয়ে ভাত খাব, ওরা ঠিক করবে? গীতার শ্লোক বলতে পারবে? হিন্দু, ইসলাম, খ্রিস্টান ধর্ম বিভাজনের কথা শেখায় না। অসমে ক্ষমতায় কে? তাদের কী এক্তিয়ার আছে, এখানকার রাজবংশী ভাইদের এনআরসি নোটি পাঠাচ্ছে? অসমের মুখ্যমন্ত্রী বলছে, বাংলায় কথা বললে জেলে ঢোকাও।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘শুভেন্দু, নিশীথদের উপড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে এখানে মানুষ এসেছে। যাঁরা আমাদের বাংলাদেশী বলে, তাঁদের বাংলাদেশে উৎখাত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছে। ক্ষমতা থাকলে স্পর্শ করে দেখাবেন। তৃণমূলের সৈনিক বুকের রক্ত দিয়ে আটকাবে। সাড়ে তিন লক্ষকে হেনস্থা করছে। তাঁদের যাতে নাম ওঠে, তৃণমূলের সৈনিকেরা নিশ্চিত করবেন। জ্ঞানেশ কুমারকে বলেছি, আঙুল তুলবেন না, আপনি মনোনীত, আমি নির্বাচিত। যে ভালবাসা দিয়েছেন, আগামী দিন উন্নয়নের মাধ্যমে পূরণ করব। আগামী দিনে ১৬ লক্ষ মানুষকে বাড়ি দেবে। কোচবিহারের দেড় লক্ষ মানুষ বাড়ি পাবেন। দেওয়ার কথা ছিল মোদীর। আমাদের সরকার করে দেবে।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘বাংলার মানুষ জবাব দেবে। মা-মাটি-মাুষের সরকার হবে। তাতে কোচবিহারের অবদান যাতে অন্যতম হয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বা হুগলি, বর্ধমানের মতো যাতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, আপনাদের নিশ্চিত করতে হবে। মদনমোহন মন্দির থেকে যখন আসছিলাম মনে হচ্ছিল ফলতা থেকে ডায়মন্ড হারবার যাচ্ছি। ’’
অভিষেক বলেন, ‘‘বিজেপির নেতারা লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ করতে চেয়েছিল। বিজেপির জেলা কমিটির সদস্য, কোচবিহারের নেত্রী দীপা চক্রবর্তী ২০২৪ সালের ভোটের আগে বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ করা হবে। সাত দিন আগে আর এক জন তা-ই বলেন। যত দিন আমাদের সরকার রয়েছে, কেউ হাত দেবে না লক্ষ্মীর ভান্ডারে।
অভিষেক বলেন, ‘‘উৎসাহ ধরে রাখতে হবে, যেখানে লড়াই করার করতে হবে। আগামী ১০০ দিন মাঠে দেখাতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার পথশ্রী প্রকল্পে কোচবিহারে ৩৫০ কোটি টাকার রাস্তা বরাদ্দ করেছে। তিন মাসে রাস্তা হয়ে যাবে। এক-একটি বিধানসভায় গড়ে ৪০ কোটির টাকার রাস্তা আমাদের সরকার দিচ্ছে।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘৯টার বিধানসভার মধ্যে ৬-৩ নয়, তৃণমূলের পক্ষে ৯-০ করতে হবে। সব আবর্জনা উপড়ে ফেলতে হবে। সাফ করতে হবে। তবেই এরা শিক্ষা পাবে। যাঁরা ভাষা জানেন না, মনীষীদের অপমান করেন, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, রবীন্দ্রনাথ সান্যাল, কবিগুরুর জন্মস্থান বলছেন শান্তিনিকেতন। সুকান্ত মজুমদার স্বামীজিকে বলছেন, অজ্ঞ বামপন্থী প্রোডাক্ট। এই শাহের নেতৃত্বে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছিল জল্লাদেরা। মা দুর্গার বংশ পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করেন। তাঁদের কাছে হিন্দুত্ব শিখতে হবে? জগন্নাথ সরকার বলছে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ভারত-বাংলাদেশের কাঁটাতারের সীমানা থাকবে না। তারা নাকি উঠিয়ে দেবে। তারা নাকি সীমানা সুরক্ষিত করতে চায়।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘তাঁর বিরুদ্ধে আগামী দিনের লড়াই, যাঁরা বাংলার মানুষকে প্রাণে মারতে চেয়েছেন, বিএসএফ দিয়ে শ্রমিক, কৃষকদের অত্যাচার করেছে। দিনহাটায় প্রেমকুমার বর্মণকে পেলেট গুলি দিয়ে ঝাঁজরা করে মেরেছে। যারা চাষ করতে যাচ্ছে, তাঁদের পাচারকারী সন্দেহ করে প্রাণে মারছে। কে মারছে? বিজেপির অমিত শাহের অধীনস্থ বিএসএফ। তার প্রতিমন্ত্রী কে ছিল? নিশীথ প্রামাণিক। কোচবিহারের মানুষকে কুর্নিশ জানাই যে, তৃণমূলকে জিতিয়ে বিজেপির আবর্জনাটাকে দূর করেছেন।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘আমাদের শিখতে হবে আপনার কাছে হিন্দুত্ব? এসআইআর ঘোষণা হওয়ার পরে প্রায় ৭৮ জন মারা গিয়েছেন। লাইনে দাঁড়িয়ে। বিএলওরা আত্মঘাতী হয়েছেন। এখানে চার জনের পরিবারের প্রতিনিধিরা এসেছেন, যাঁরা লাইনে দাঁড়িয়ে বা বিএলওরা কাজের চাপে আত্মঘাতী হয়েছেন। অপরিকল্পিত এসআইআর-কে দায়ী করেছেন।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘এক সপ্তাহ আগে মিটিং করে শুকতাবাড়ির লোকেদের বাংলাদেশী বলেছেন। যাঁরা আমাদের ভাষা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে অস্বীকার করেছেন, আমরা বাংলায় কথা বলে যদি বাংলাদেশী হই, নিশীথ প্রামাণিক, শুভেন্দু অধিকারী, দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার কী ভাষায় কথা বলো? যখন জয় বাংলা বলবেন, গর্ব করে বলবেন। এটা আমাদের ঐতিহ্য, পরিচয়। বাংলার মাটিতে দেশের রাষ্ট্রপতি এসে জয় বাংলা বলে গেছেন। অমিত শাহ কোন ছাড়।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘বঙ্গবাসীর সঙ্গে লড়বেন? যাঁরা আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস জানে না, আমাদের আপনাদের থেকে হিন্দু ধর্ম শিখতে হবে? যাঁরা পঞ্চানন বর্মাকে পঞ্চানন বর্মন বলেন, যারা চিলা রায়ের অবদানকে অস্বীকার করেন, তাদের থেকে কোচবিহারের ঐতিহ্য শিখতে হবে?’’
অভিষেকের কথায়, ‘‘আমি কথা দিচ্ছই তৃণমূল দিল্লি যাবে। আজ মাঠে যা লোক হয়েছে, দিল্লির নেতাদের বলব, খালি ছবি সংবাদমাধ্যমে দেখবেন। রাতের ঘুম চলে যাবে। এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দিল্লি যদি যায়, বিজেপির নেতারা বানের জলে ভেসে যাবে।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘রক্ত গরম হয় না? বিজেপির নেতারা এত দিন যাঁরা কোচবিহারে ছিল, ২০২১ থেকে ২০২৬। ২০২১ সালে সাত জন বিধায়ককে জিতিয়েছিলেন। পরবর্তী কালে দিনহাটা উপনির্বাচনে তৃণমূল জেতে। আজ স্কোর কী? ৯টার মধ্যে তিনটি আসনে তৃণমূল, ছ’টি বিজেপি। বিজেপি-কে জেতাবেন, অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবেন। তৃণমূল যত দিন ছিল, সাধারণ মানুষের উপর চোখ তুলে তাকানোর দুঃসাহস দেখাননি বিজেপির নেতারা দিল্লি বা মধ্যপ্রদেশ থেকে।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের সরকার শুধু আমাদের জল, কল, রাস্তার টাকা কেড়ে নেয়নি, আমাদের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছে। আগামীর লড়াই এঁদের বিসর্জন দেওয়ার লড়াই।’’
অভিষেক ১০ জনকে পাশে দাঁড় করিয়ে বলেন, ‘‘কোচবিহারের মানুষকে যাঁরা বঞ্চিত করেছেন, তাঁদের জবাব দেবেন না? কত কষ্ট করে সভায় এসেছেন। মানুষকে সম্মানিত করতে পারেনি। শান্তিতে থাকতে দেয়নি। উপকার করেনি। তাঁর মৌলিক অধিকার যাতে প্রয়োগ না করতে পারে, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’’
অভিষেক ১০ জনকে কোচবিহারের মঞ্চে উপস্থিত করালেন। তিনি বলেন, ‘‘আপনাদের সামনে তথ্য উপস্থাপিত করা আমার কর্তব্য।’’ ১০ জনের নাম বলেন— অশ্বিনী অধিকারী, শিবানী অধিকারী, কাজিমা খাতুন, আলিমান বেওয়া, মুকুল দেব কর্মকার, মুর্শিদ আলম, আবুজার মিয়াঁ, আজিজার রহমান, তপন বর্মন। তাঁদের মঞ্চে দাঁড় করিয়ে বলেন, ‘‘সকলে দেখতে পাচ্ছেন তো! সকলে কোচবিহার জেলার মানুষ। এখানে জন্মেছেন, বড় হয়েছেন, সমৃদ্ধ করেছেন। ১০ জনকে বিজেপির দালাল নির্বাচন কমিশন আর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ মৃত বলে ঘোষণা করেছেন। এই ১০ জনের ভওটার তালিকা থেকে নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। বলেছে অস্তিত্ব নেই। এই ১০ জনকে মৃত মনে হচ্ছে?’’