Abhishek Banerjee

৪-৮ থেকে বাঁকুড়াকে ১২-০ করার ডাক অভিষেকের! গত লোকসভা ভোটের ফল দেখে দিলেন খেলা ঘোরানোর বার্তা

২০১৬ সাল থেকেই বাঁকুড়ায় তৃণমূলের সংগঠনে ক্ষয় ধরতে শুরু করেছিল। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে এবং ২০২১ সালের ভোটে তা আরও প্রকট হয়। পরে ২০২৪ সালে কিছুটা জমি ফিরে পেয়ে রুপোলি রেখা দেখতে শুরু করেছে তৃণমূল।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:০০
Share:

শনিবার বাঁকুড়ার শালতোড়ায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।

পাঁচ বছর আগে প্রত্যাশিত ফল হয়নি। রাজ্য জয় করলেও বাঁকুড়া জেলা জয় করতে পারেনি তৃণমূল। পাঁচ বছর পরে সেই ঘাটতি পূরণ করতে চাইছে তৃণমূল। তাদের লক্ষ্য বাঁকুড়ার ১২টি বিধানসভা আসনই জেতা। শনিবার ‘রণ সংকল্প’ সভায় সেই লক্ষ্যই দলীয় কর্মী-সমর্থকদের বুঝিয়ে দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

Advertisement

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বাঁকুড়ার ১২টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে মাত্রই চারটিতে জিততে পেরেছিল তৃণমূল। বাকি আটটিই গিয়েছিল বিজেপির দখলে। দু’টি লোকসভা আসন (বাঁকুড়া এবং বিষ্ণুপুর) ২০১৯ সাল থেকেই ছিল বিজেপির দখলে। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে কিছুটা জমি ফিরে পেয়েছে শাসকদল। পুনর্দখল করেছে বাঁকুড়া লোকসভা।

তবে বাঁকুড়া লোকসভা তৃণমূলের হাতে থাকলেও শালতোড়া বিধানসভা কেন্দ্রটি রয়েছে বিজেপির দখলেই। গোটা বাঁকুড়া জেলাকে ‘বিজেপি-শূন্য’ করার বার্তা দিতে অভিষেক বেছে নিয়েছিলেন শালতোড়াকেই। সেখানেই অভিষেক বলেন, “২০২১ সালে বিধানসভা ভোটে বাঁকুড়ার ১২টি আসনের মধ্যে চারটিতে আপনারা তৃণমূলকে জিতিয়েছিলেন। বাকি আটটিতে জিতেছিলেন বিজেপির প্রতিনিধিরা। ২০২৪ সালের লোকসভায় চার থেকে বেড়ে আমাদের ছয় হয়েছে। এখন তৃণমূল ছয়, বিজেপি-ও ছয়।”

Advertisement

একটি লোকসভা কেন্দ্রে সাতটি করে বিধানসভা কেন্দ্র থাকে। তবে বাঁকুড়া জেলার ক্ষেত্রে বিষ্ণুপুর লোকসভার একটি অংশ পড়ে পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষ বিধানসভার মধ্যে। বাঁকুড়া লোকসভার একটি অংশ আবার পড়ে পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর বিধানসভার মধ্যে। ফলে বাঁকুড়া জেলার বিধানসভা কেন্দ্র বলতে গেলে ১২টি। অভিষেকের কথায়, “বিষ্ণুপুরকে ছয় মারতে হবে, বাঁকুড়াকেও ছয় মারতে হবে। দু’টো ছয় মেরে তৃণমূলের পক্ষে ১২-০ করতে হবে।”

২০১৬ সাল থেকেই বাঁকুড়ায় তৃণমূলের সংগঠনে ক্ষয় ধরতে শুরু করেছিল। ওই জেলার নেতা শ্যামল সাঁতরাকে রাজ্যের মন্ত্রী করেছিল তৃণমূল। পরে লোকসভা ভোটেও প্রার্থী করে। কিন্তু তিনি পরাজিত হন। সেই শ্যামলকে এখন সে ভাবে দেখাই যায় না রাজনীতির ময়দানে। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে সংগঠনের এই ক্ষয় প্রকট হয়। বাঁকুড়া জেলার দুই লোকসভা আসনেই হারতে হয় তৃণমূলকে। ২০২১ সালে গত বিধানসভা ভোটে তা আরও স্পষ্ট হয়। বড়জোড়া এবং জঙ্গলমহলের তিন বিধানসভা রানিবাঁধ, রাইপুর, তালড্যাংরা ছাড়া জেলার আর কোথাও জিততে পারেনি তৃণমূল। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বাঁকুড়া লোকসভা পুনর্দখল করে রুপোলি রেখা দেখতে শুরু করেছে তৃণমূল। সেই প্রেক্ষিতেই এ বার ১২-০ করার ডাক দিলেন অভিষেক। সঙ্গে এ-ও স্পষ্ট করলেন, ৭-৫ হলে চলবে না। ১২-০-ই চাই তাঁর।

গত বিধানসভা ভোটে বাঁকুড়াবাসী যে তৃণমূলকে আশানুরূপ ফল দেননি, বক্তৃতার সময়ে তা নিয়েও শনিবার কিছুটা ‘অভিমানী’ শুনিয়েছে অভিষেককে। প্রত্যাশিত ভোট না পেলেও যে তৃণমূল সরকার বাঁকুড়াবাসীর জন্য লক্ষ্মীর ভান্ডার এবং অন্য প্রকল্পের জন্য খরচ করে গিয়েছে, তা-ও তুলে ধরেন তিনি। বাঁকুড়ার খাদান শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন জানিয়ে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বলেন, “যত দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার রাজ্যের মাটিতে আছে, কেউ আপনাদের লক্ষ্মীর ভান্ডার আটকাতে পারবে না।”

গত লোকসভা ভোটে বাঁকুড়া থেকে হেরেছেন বিজেপির সুভাষ সরকার। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন। বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রেও বিজেপির সৌমিত্র খাঁ-এর জয়ের ব্যবধান সামান্যই ছিল। সেই প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেন, “সুভাষ সরকারকে (বাঁকুড়ার প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ) যেমন প্রাক্তন করেছেন, প্রত্যেকটি বুথে এদের প্রাক্তন করতে হবে। বিষ্ণুপুর লোকসভায় কানের পাশ দিয়ে বেরিয়েছে। পাঁচ হাজার ব্যবধান মানে আড়়াই হাজার ভোট এদিক ওদিক। আগামী নির্বাচনে এক লক্ষ ভোটে জিতবে (তৃণমূল)।” অভিষেক যখন বিষ্ণুপুর লোকসভার কথা বলছিলেন, তখন মঞ্চে ছিলেন বিজেপি সাংসদ সৌমিত্রের প্রাক্তন স্ত্রী সুজাতা মণ্ডল। গত লোকসভায় বিষ্ণুপুরে তাঁকেই প্রার্থী করেছিল তৃণমূল।

খাদান শ্রমিকদের আশ্বাস

বাঁকুড়াতেও অভিষেকের সভামঞ্চে র‌্যাম্পের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেই র‌্যাম্পে ঘুরে ঘুরে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের অভিবাদন জানান তিনি। একই সঙ্গে আশ্বাস দেন পাথর খাদানের শ্রমিকদেরও। অভিষেক জানান, কিছু আইনি জটিলতার কারণে এই এলাকার সব পাথর খাদান পুরোদমে চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে সবগুলি খাদান পুরোদমে চালু হয়ে গেলে কমপক্ষে ২৫ হাজার লোক কাজের সুযোগ পাবেন। খাদান শ্রমিকদের উদ্দেশে তৃণমূল নেতা বলেন, “আমি গত দু’মাস ধরে এর উপর কাজ করেছি। আজ সকালেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকে আধিকারিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ৩১ মার্চের আগে সব কাজ চালু করে ২৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কথা দিয়ে কথা রাখার নাম তৃণমূল।” একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘ডিরেক্টর জেনারেল অফ মাইনিং’-কেও নিশানা করেন অভিষেক। খাদান চালু করার জন্য মালিকদের সেখানে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হয় বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।

রিপোর্ট কার্ডের চ্যালেঞ্জ

২০১৯ সালে জেলার দুই লোকসভা কেন্দ্রই বিজেপির দখলে চলে গিয়েছিল। একটি লোকসভা কেন্দ্র এখনও বিজেপির দখলেই রয়েছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে বাঁকুড়ার জন্য কী কাজ করেছে কেন্দ্র, সেই প্রশ্ন তোলেন অভিষেক। তিনি বলেন, “বাঁকুড়ার জন্য কী করেছে? এক দিকে আমি আমাদের সরকারের রিপোর্ট কার্ড নিয়ে যাব। অন্য দিকে বিজেপি রিপোর্ট কার্ড নিয়ে আসবে। ভোকাট্টা করে মাঠের বাইরে বের করে দিতে না পারলে মুখ দেখাব না!” অভিষেক জানান, তিনি রিপোর্ট কার্ডের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন। জনসভায় তিনি বলেন, ‘‘আপনারা তৃণমূলকে প্রত্যাশিত ফল দেননি। তার পরেও পাঁচ বছরে তৃণমূল ৩,৫০০ কোটি টাকা খরচ করে লক্ষ্মীর ভান্ডার দিয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে জলের প্রকল্প চলছে।”

বাঁকুড়ার প্রতি ‘বঞ্চনা’

অভিষেকের বলেন, রাজ্যের প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা আটকে রেখেছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। তাঁর কথায়, বিধানসভা ভিত্তিক হিসাবে প্রতিটি বিধানসভার জন্য ৬৮০ কোটি টাকা আটকে রেখেছে কেন্দ্র। তিনি বলেন, “বাঁকুড়া জেলার ৭ হাজার কোটি টাকা আটকে রেখেছে এই বিজেপি। এই টাকা ছাড়লে রাতারাতি বাঁকুড়ার জন্য ৭ হাজার কোটি টাকা দিতে পারবে রাজ্য সরকার। এরা চায় বাংলার মানুষ ওদের পা ধরুক!” বাঁকুড়া জেলাকে আসন্ন নির্বাচনে বিজেপি-শূন্য করে দেওয়ার ডাক দিয়ে অভিষেক বলেন, “তৃণমূল জিতলে অধিকার পাবেন। বিজেপি জিতলে অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। তৃণমূল জিতলে পাবেন দু’মুঠো ভাত, বিজেপি জিতলে সাম্প্রদায়িক সংঘাত। তৃণমূল জিতলে দুয়ারে রেশন, মোদী জিতলে দুয়ারে ভাষণ। তৃণমূল জিতলে মানুষের পাতে ভাত, বিজেপি জিতলে খালি মোদীজির মন কি বাত। কী নেবেন, সিদ্ধান্ত আপনার।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement