(বাঁ দিকে) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জ্ঞানেশ কুমার (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে! এমন অভিযোগ তুলে আবার দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ায় সংবেদনশীলতার অভাব রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘এসআইআরের নামে নির্বাচন কমিশন যে ভাবে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করছে তাতে আমি স্তম্ভিত এবং বিরক্ত।’’
তবে টাইপ করা চিঠির শেষে তিনি হাতে দু’লাইন লিখে দিয়েছেন। মমতা লিখেছেন, ‘‘আমরা মনে হয় এই চিঠির উত্তর পাব না। তবে আমার কর্তব্য, বিষয়গুলি আপনার কাছে তুলে ধরা।’’
মমতা এর আগেও একাধিক বার মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দিয়ে এসআইআর নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন। শনিবার আবার এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে কমিশনকে চিঠি দিলেন মমতা। চিঠির পরতে পরতে তিনি এসআইআর প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের হয়রানির কথা তুলে ধরেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘কমিশনের এই প্রক্রিয়া অনেকটা যন্ত্র নির্ভর। সেখানে সংবেদনশীলতার অভাব রয়েছে।’’ এসআইআর আতঙ্কে মৃত্যুর অভিযোগও আবার তুলেছেন মমতা। তিনি জানিয়েছেন, এসআইআর পর্বে ৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে! এই সব মৃত্যুর নেপথ্যে ‘এসআইআর আতঙ্ক’ রয়েছে বলে দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
মমতার অভিযোগ, শুধু সাধারণ মানুষ নন, এসআইআর শুনানিতে ‘হয়রানির শিকার’ হতে হয়েছে নোবেলজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন, কবি জয় গোস্বামী, অভিনেতা দীপক অধিকারী (দেব) বা ক্রিকেটার মহম্মদ শামির মতো স্বনামধন্যদেরও। শুনানিতে ডাক পেয়েছেন তাঁরাও। সেই বিষয় তুলে কমিশনের আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। নাম বা ঠিকানাবদলের জন্য বিবাহিত মহিলারাদেরও শুনানিতে তলব করে হয়রানি করা হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।
শুনানিপর্বে পর্যবেক্ষক বা মাইক্রো অবজ়ার্ভারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। চিঠিতে তিনি দাবি করেছেন, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই একতরফা ভাবে তাঁদের নিয়োগ করেছে কমিশন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কাজ করছেন। মমতার অভিযোগ, কিছু পর্যবেক্ষক নাকি সাধারণ মানুষকে ‘দেশদ্রোহী’ বলেও দাগিয়ে দিচ্ছেন! কমিশনের তথ্যগত অসঙ্গতির তালিকা (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) নিয়ে সন্দেহপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি মনে করেন, এই তালিকা পুরোপুরি অযৌক্তিক! কমিশনের ‘পোর্টাল’ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে ব্যবহৃত ‘পোর্টাল’ অন্য কোনও রাজ্যের থেকে আলাদা কেন? দিন দুয়েক আগে গঙ্গাসাগর থেকে ফেরার সময় কমিশনের ‘পোর্টাল’ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন মমতা। তাঁর অভিযোগ ছিল, বিজেপির আইটি সেল ওই পোর্টাল তৈরি করেছে।
চিঠিতে জ্ঞানেশ কুমারকে মমতা এ-ও জানিয়েছেন, সামনে গঙ্গাসাগর মেলা। সেই কারণে রাজ্য পুলিশের একটা বড় অংশ সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে। তাই সেই সময়ে ‘তথাকথিত’ পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা দেওয়ার তুলনায় সাধারণ মানুষের সুরক্ষাই সরকারের প্রাথমিক কর্তব্য।
মমতার চিঠিতে রয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। অতীতে তিনি বিষয়টি বার বার উল্লেখ করেছেন। মমতা তথা এ রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের দাবি ছিল, যাঁরা কর্মসূত্রে বাইরে রয়েছেন, তাঁদের শুনানির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা হোক। তাঁদের পরিবারের কাউকে শুনানিতে ডেকে তথ্য যাচাই করার দাবি তোলে তৃণমূল। মমতার দাবি, ‘‘কমিশন দেরিতে হলেও জেগে উঠেছে। কর্মসূত্রে বাইরে থাকা নির্দিষ্ট কিছু ভোটারের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা চালু করেছে। কিন্তু পরিযায়ী শ্রমিকদের এই সুবিধা দেওয়া হয়নি।’’ কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘‘কমিশনের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য ভোটার তালিকা সংশোধন নয়, শুধু বাদ দেওয়া।’’ মুখ্যমন্ত্রী আশাবাদী, সাধারণ মানুষের হেনস্থা কমাতে কমিশন যথাযথ পদক্ষেপ করবে।
এসআইআর পর্বে মমতা এর আগে তিন বার জ্ঞানেশকে চিঠি দিয়েছিলেন। সর্বশেষ চিঠিতেও সাধারণ মানুষের হয়রানির কথা উল্লেখ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে শনিবার এসআইআর নিয়ে সাধারণ মানুষদের কথা বিস্তারিত তুলে ধরেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে।
অন্য দিকে, শনিবার আবারও রাজ্যের সিইও দফতরে গেল তৃণমূলের পাঁচ প্রতিনিধির দল। কিছু দাবি তুলে ধরেছেন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়ালের কাছে। তাদের দাবি, শুনানিপর্বে প্রৌঢ়, বৃদ্ধ এবং অসুস্থদের নিয়ে কমিশন যে নির্দেশিকা জারি করা হয়ছে, তা সব জায়গায় মানা হচ্ছে না। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নিয়ে সমস্যা অনেক জায়গায় বিএলও এবং এইআরও স্তরে সমাধান না-হওয়ার অভিযোগও জানানো হয়েছে। তৃণমূলের প্রতিনিধি দলে ছিলেন তিন মন্ত্রী শশী পাঁজা, পুলক রায়, বিরবাহা হাঁসদা এবং দুই বিধায়ক শিউলি সাহা এবং পার্থ ভৌমিক।