মৃত পরিযায়ী শ্রমিক সুখেন মাহাতোর বাড়িতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার পুরুলিয়ায়। ছবি: সংগৃহীত।
পুরুলিয়া থেকে মহারাষ্ট্রের পুণেয় কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিক সুখেন মাহাতোর (৩১) মৃত্যু নিয়ে বুধবার রাত থেকেই ময়দানে নেমেছিল তৃণমূল। বৃহস্পতিবার দফায় দফায় তৃণমূলের তরফে দাবি করা হয়, ‘বাংলাভাষী’ হওয়ার কারণেই খুন হতে হয়েছে সুখেনকে। কিন্তু মৃত্যুর কারণ কী, সে ব্যাপারে শুক্রবার নিহতের বাড়িতে দাঁড়িয়ে নির্দিষ্ট কোনও দাবি করলেন না তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
শুক্রবার পুরুলিয়ার বান্দোয়ানে সুখেনের পৌঁছে অভিষেক বলেন, ‘‘কী কারণে মৃত্যু, কেন মৃত্যু, তা তদন্তসাপেক্ষ।’’ পরে আরও একবার বলেন, ‘‘এই মৃত্যু কেন হয়েছে, সেটা বলব না। কারণ, এটা তদন্তসাপেক্ষ।’’ তবে মহারাষ্ট্র পুলিশ যাতে ‘যথাযথ’ তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি সুনিশ্চিত করে, তার জন্য তৃণমূল শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবে বলে মৃতের পরিবারকে আশ্বাস দিয়েছেন অভিষেক।
বৃহস্পতিবারই অভিষেকের দফতর থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তিনি শুক্রবার বান্দোয়ান যাবেন। শুক্রবার অভিষেক পৌঁছোনোর কাছাকাছি সময়েই সুখেনের ক্ষতবিক্ষত দেহ পৌঁছোয় তাঁর বাড়িতে। মৃতের দুই ভাই রয়েছেন। অভিষেক বান্দোয়ান থেকেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আবেদন জানান, মৃতের দুই ভাইয়ের যাতে বান্দোয়ানেই কর্মসংস্থানের বন্দোবস্ত হয়, তা সুনিশ্চিত করুক রাজ্য সরকার। বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলার শ্রমিকের হত্যার প্রতিবাদে শনিবার পুরুলিয়ার প্রতিটি ব্লকে প্রতিবাদ মিছিল করার নির্দেশ দিয়েছেন অভিষেক।
গত কয়েক মাস ধরেই ভিন্রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হামলার ধারাবাহিকতা নিয়ে তৃণমূল সরব। দিল্লিতে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করা বীরভূমের সুনালি বিবিকে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে সীমানা পার করে সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। বাংলাদেশের আদালত থেকে তাঁকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তৃণমূলই মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল। সন্তানসম্ভবা অবস্থাতেই তিনি বাংলাদেশে কয়েক মাস জেলবন্দি ছিলেন। আইনি জটিলতা কাটিয়ে বীরভূমে ফেরার পর তিনি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। সুনালি এবং তাঁর সদ্যোজাত সন্তানকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন অভিষেক। ওড়িশা, ছত্তীসগঢ়-সহ সমস্ত রাজ্যের ঘটনার প্রেক্ষিতে অভিষেক শুক্রবার বলেন, ‘‘বাংলাভাষী হলে, বিশেষত বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে হেনস্থার একটা ধাঁচ (প্যাটার্ন) দেখা যাচ্ছে।’’ তবে একই সঙ্গে অভিষেক এ-ও উল্লেখ করেছেন যে, পুণের ঘটনাকে তিনি সেই ধারাবাহিকতার সঙ্গে এখনই জুড়ছেন না।
সুখেনের মৃত্যুর খবরে ক্ষোভপ্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বৃহস্পতিবার তাঁর ‘এক্স হ্যান্ডলে’ দাবি করেছিলেন, ভাষার পরিচয়ের কারণেই ওই তরুণকে খুন হতে হয়েছে। তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠক করে রাজ্যের দুই মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং ব্রাত্য বসুও দাবি করেছিলেন, বাংলাভাষী হওয়ার কারণেই খুন করা হয়েছে সুখেনকে। পাল্টা পুণে পুলিশের তরফে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়, মত্ত অবস্থায় ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার ফলেই ওই খুনের ঘটনা ঘটেছে।
‘তদন্তসাপেক্ষ’ বিষয়ে অভিষেক সরাসরি কোনও মন্তব্য না-করলেও তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকারের উপর সুখেনের হত্যাকারীদের শাস্তির জন্য তৃণমূল ধারাবাহিক চাপ রেখে যাবে। ইতিমধ্যেই ওই ঘটনায় পুলিশ এক জনকে গ্রেফতার করেছে। অভিষেকের দাবি, এর সঙ্গে আরও কয়েক জন জড়িত। তাদের সকলকে গ্রেফতার করতে হবে। তিনি বলেন, ‘‘বিজেপি শাসিত রাজ্যে অপরাধীদের জামিন হয়ে যায়। তা যেন না-হয়।’’ মহারাষ্ট্র সরকারের উপর চাপ রাখতে আগামী ২৪-২৫ ফেব্রুয়ারি নাগাদ তৃণমূলের একটি প্রতিনিধিদল যাবে পুণেয়। প্রয়োজনে আইনি লড়াই বম্বে হাই কোর্ট, এমনকি, সুপ্রিম কোর্টেও নিয়ে যাওয়া হবে।
বিজেপি, সিপিএম-সহ বিরোধীরা বৃহস্পতিবার থেকেই বলতে শুরু করেছিল, কেন বান্দোয়ানের এই যুবককে কাজ করতে যেতে হয়েছিল? কারণ, রাজ্যে কর্মসংস্থান নেই। শুক্রবার অভিষেক পাল্টা বলেন, ‘‘সুখেন কাজ করতে গিয়েছিলেন ২০০৯ সালে।’’ অর্থাৎ, তখন বাম জমানা। তিনি আরও বলেন, ‘‘তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নিই, তা হলে তো এই জবাবও দিতে হবে যে, কেন গত ১৪ বছরে কোটি কোটি ভারতীয় দেশ ছেড়ে বিদেশে কাজের জন্য গেলেন?’’