লালগ়ড়ে সিপিএম নেতা খুন

অভিযুক্ত বেকসুর, রায় সুপ্রিম কোর্টেরও

ন’বছর আগে লালগড়ের সিপিএম নেতা স্নেহাশিস দাসকে খুনের ঘটনায় অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। খুনের দশ মাসের মধ্যে মূল অভিযুক্ত বুদ্ধদেব গিরিকে অবশ্য ঝাড়গ্রামের ফাস্ট ট্র্যাক আদালত ফাঁসির আদেশ শুনিয়েছিলে।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০১:৪৩
Share:

নিহত স্নেহাশিস—ফাইল চিত্র।

ন’বছর আগে লালগড়ের সিপিএম নেতা স্নেহাশিস দাসকে খুনের ঘটনায় অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। খুনের দশ মাসের মধ্যে মূল অভিযুক্ত বুদ্ধদেব গিরিকে অবশ্য ঝাড়গ্রামের ফাস্ট ট্র্যাক আদালত ফাঁসির আদেশ শুনিয়েছিলে। যদিও পরে কলকাতা হাইকোর্ট সেই ফাঁসির আদেশ মকুব করে বুদ্ধদেবকে বেকসুর খালাস দেয়। হাইকোর্টের সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের তৎকালীন সরকার সুপ্রিম কোর্টে এসেছিল। শীর্ষ আদালত অবশ্য হাইকোর্টের রায়েই সম্মতি দিয়েছে। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পিনাকিচন্দ্র ঘোষ ও আর কে অগ্রবাল ওই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে জানান, শীর্ষ আদালত হাইকোর্টের রায়ই বহাল রাখছে। রাজ্য সরকারের আইনজীবী কবীরশঙ্কর বসু বলেন, ‘‘২০১০-এ হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিল রাজ্য সরকার। আজ সুপ্রিম কোর্ট সেই মামলা খারিজ করে দিয়ে বলেছে, হাইকোর্টের রায়ই বহাল থাকবে। সুপ্রিম কোর্ট এর মধ্যে হস্তক্ষেপ করবে না।’’ বুদ্ধদেবের আইনজীবী অশ্বিনীকুমার মণ্ডল বলেন, “স্নেহাশিসবাবুর খুনের প্রকৃত ঘটনাটি আড়াল করার জন্য নিরাপরাধ বিরোধী দলের নানা কর্মী-সমর্থকদের ফাঁসানো হয়েছিল। হাইকোর্ট আগেই বুদ্ধদেববাবুকে মামলা থেকে বেকসুর খালাস দিয়েছিল। এ বার সুপ্রিম কোর্ট সেই আদেশ বহাল রাখল। আমার মক্কেল প্রকৃত বিচার পেলেন।”

Advertisement


বাঁ দিক থেকে, বাবা অনিল দাস, মেয়ে বনশ্রী ও স্ত্রী সোমা। ছবি: দেবরাজ ঘোষ।

বামফ্রন্ট জমানায় ২০০৬ সালের ২৬ মে লালগড়ে দুষ্কৃতী হানায় নিহত হন বছর পঁয়ত্রিশের স্নেহাশিস। সে দিন বৈতা বাজারে দলীয় কার্যালয়ের সামনে গল্প করছিলেন সিপিএমের ধরমপুর লোকাল কমিটির সদস্য স্নেহাশিস। দুষ্কৃতীদের ছোড়া গুলি ও টাঙির কোপে মারাত্মক জখম হন তিনি। পরে ঝাড়গ্রাম হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার পরে সিপিএমের তত্‌কালীন ধরমপুর লোকাল কমিটির সম্পাদক অনুজ পাণ্ডে (নেতাই-কাণ্ডের মূল অভিযুক্ত জেলবন্দি অনুজ এখন সিপিএমের বিনপুর জোনাল সম্পাদক) দাবি করেছিলেন, ঝাড়খণ্ড পার্টি, তৃণমূল এবং মাওবাদী জোট স্নেহাশিসকে খুন করেছে।

Advertisement

যদিও তৎকালীন বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, এলাকায় ইটভাটার দখলদারি সংক্রান্ত সিপিএমের অভ্যন্তরীণ বিরোধেই স্নেহাশিস খুন হন। স্নেহাশিসের স্ত্রী সোমা দাসের অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার হন বুদ্ধদেব গিরি-সহ সাত জন অভিযুক্ত। এফআইআর-এ মোট দশ জনের নাম ছিল। অভিযুক্তরা সকলেই ঝাড়খণ্ড পার্টির কর্মী-সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মামলার চার্জশিট দাখিলের আগেই রহস্যজনক ভাবে তদন্তকারী অফিসার জাহাঙ্গির কবীরের মৃত্যু হয়। ২০০৬ সালের ৬ জুলাই লালগড় থানার দোতলার ঘরে জাহাঙ্গিরের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ মেলে। পুলিশের দাবি ছিল, কবীর সার্ভিস রিভলভার থেকে মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু তদন্তের জাল গুটিয়ে আনার মুহূর্তে কেন কবীর আত্মহত্যা করতে গেলেন, সেই প্রশ্নের জবাব আজও মেলেনি।

২০০৭-এর ২২ মার্চ ঝাড়গ্রাম ফাস্ট ট্র্যাক আদালত মূল অভিযুক্ত বুদ্ধদেবকে ফাঁসির সাজা শোনায়। বাকি ৬ অভিযুক্ত প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস পায়। ২০০৮ সালে ২৭ জুন হাইকোর্টের দুই বিচারপতি গিরিশচন্দ্র গুপ্ত ও কিশোরকুমার প্রসাদ বুদ্ধদেবকে বেকসুর খালাস দেন। সুপ্রিম কোর্টেও সেই রায় বহাল থাকল। এই রায়কে স্বাগতই জানাচ্ছেন নিহতের পরিজনেরা। এ দিন বৈতায় স্নেহাশিসের বৃদ্ধ বাবা অনিলকুমার দাস বলেন, “তখন সিপিএম নেতাদের চাপে আমরা মুখ বুজে ছিলাম। যে রায় হয়েছে ঠিকই হয়েছে।” তবে কি ঘটনার পুনর্তদন্ত চাইছেন? অনিলবাবুর জবাব, ‘‘ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। কী হবে আর এ সব করে!” ঘটনার সময় স্নেহাশিসের স্ত্রী সোমা ন’মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এ দিন ৯ বছরের মেয়ে বনশ্রীকে পাশে নিয়ে সোমা বলেন, “আমরাও মামলার বিষয়ে কিছুই আর জানি না।”

এই রায় শুনে স্বভাবতই খুশি বুদ্ধদেববাবু। এ দিন তিনি বলেন, “বিরোধী সমর্থক হওয়ায় বিনা কারণে দু’ বছর জেল খেটেছি। ন্যায্য বিচার পেলাম।” ঘটনার সময় ঝাড়খণ্ড পার্টি করলেও পরে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন বুদ্ধদেববাবু। তাঁর বাবা রঘুনাথবাবু বৈতা এলাকায় তৃণমূলের সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত। তৃণমূল জেলা সভাপতি দীনেন রায়ও বলছেন, “হাইকোর্টের পরে সুপ্রিম কোর্টেও ন্যায্য বিচার পেলেন বুদ্ধদেব।” আর সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ডহরেশ্বর সেনের বক্তব্য, ‘‘সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে কিছু বলার নেই। তবে স্নেহাশিস ব্যক্তিগত বিরোধের জেরেই খুন হয়েছিলেন
বলে শুনেছিলাম।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement