—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষণার পরেই রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) প্রদান সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থ দফতর। রবিবার মুখ্যমন্ত্রী বকেয়া ডিএ প্রদানের ঘোষণা করেছিলেন। সোমবার যে পৃথক তিনটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ্যে এসেছে তা প্রকাশের তারিখ ১৩ মার্চ শুক্রবার। সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী এবং সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারী, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, পঞ্চায়েত, পুরসভা এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলির কর্মীরা এই সুবিধার আওতায় পড়বেন। নবান্নের অর্থ দফতরের অডিট ব্রাঞ্চ থেকে জারি হওয়া ওই নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়ের বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই বিশাল পরিমাণ অর্থ একবারে নয়, বরং কয়েকটি পর্যায়ে সরকারি কর্মীদের দেওয়া হবে। বিজ্ঞপ্তিটি নজরে আসার পর ক্ষোভ উগরে দিয়েছে বিভিন্ন সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলি। তাদের অভিযোগ, যে ভাবে ডিএ দেওয়ার ঘোষণা করা হচ্ছে, তা আদালতের নির্দেশের পরিপন্থী। তবে সরকারি কর্মচারীদের একাংশ সরকারের ডিএ দেওয়ার বিজ্ঞপ্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০০৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে চলা মামলার প্রেক্ষিতে গত ৫ ফেব্রুয়ারি শীর্ষ আদালত ডিএ মামলার রায় দান করে। আদালতের সেই নির্দেশ পালন এবং একটি মনিটরিং কমিটির তত্ত্বাবধানে এই বকেয়া মেটানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বকেয়া টাকা না পাওয়া এবং একাধিক সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের দায়বদ্ধতা সত্ত্বেও কর্মীদের স্বার্থরক্ষায় এই বড় পদক্ষেপ করা হচ্ছে। সরকার বর্তমানে প্রথম পর্যায়ের বকেয়া মেটানোর স্কিম ঘোষণা করেছে। এই পর্যায়ে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের বকেয়া ডিএ মেটানো হবে। প্রথম কিস্তি চলতি মার্চ মাসেই দেওয়া হবে। দ্বিতীয় কিস্তি সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালে প্রদান করা হবে। এই বকেয়া অর্থ ইন্ডিয়া কনজ়িউমার প্রাইস ইনডেক্স (এআইসিপিআই) অনুযায়ী গণনা করা হবে। তবে মনিটরিং কমিটি বকেয়া ভাতার চূড়ান্ত পরিমাণ নির্ধারণ করলে পরবর্তী কালে সেই অনুযায়ী প্রয়োজনে সমন্বয় (অ্যাডজাস্টমেন্ট) করা হতে পারে। এ ছাড়া, ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ের বকেয়া মেটানোর পদ্ধতি পরবর্তী সময়ে ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, পেমেন্ট প্রক্রিয়াটি কর্মীদের পদের বিন্যাস অনুযায়ী আলাদা হবে। গ্রুপ এ, বি এবং সি: এই তিন শ্রেণির কর্মীদের বকেয়া ডিএ সরাসরি তাঁদের জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড (জিপিএফ) অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া হবে। গ্রুপ ডি চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের ক্ষেত্রে এই বকেয়া অর্থ সরাসরি নগদে তাঁদের নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে। জিপিএফ-এ জমা হওয়া বকেয়া অর্থের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জিপিএফ-এ জমা হওয়া এই টাকা ক্রেডিট হওয়ার ২৪ মাস পর্যন্ত কোনও অগ্রিম বা টাকা তোলা যাবে না। তবে কর্মীর অবসর, মৃত্যু বা পদত্যাগের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা শিথিলযোগ্য। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী বা তাঁর পরিবার সেই টাকা তুলতে পারবেন। সমগ্র প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করতে রাজ্য সরকারের হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এইআরএমএস) পোর্টালে প্রয়োজনীয় কারিগরি আপডেট বা পরিবর্তনের কাজ চলছে। ড্রয়িং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসারদের (ডিডিও) সুবিধার্থে ট্রেজ়ারি বা পে অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসকে (পিএও) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা আগাম বরাদ্দের অপেক্ষায় না থেকে বিলগুলি প্রসেস করতে শুরু করে। এই বিষয়ে বিস্তারিত ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (এসওপি) খুব শীঘ্রই আলাদা ভাবে জারি করা হবে বলে অর্থ দফতর নিশ্চিত করেছে।
এই বিজ্ঞপ্তি জারির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে তৃণমূল সমর্থিত কর্মচারী ফেডারেশন। আবার ডিএ সরাসরি না দিয়ে পিএফ অ্যাকাউন্টে দেওয়া এবং তা তুলতে না পারার যে সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ। সংগঠনের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষ বলেন, ভাঁওতা দেওয়া হয়েছে আমাদের। বিজ্ঞপ্তিটি পর্যালোচনা করে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ করব। একই ভাবে শিক্ষক- শিক্ষিকাদের অধিকার সরকার হরণ করেছে বলে অভিযোগ করেছে বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতি। তাদের নেতা স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘এই বিজ্ঞপ্তি শুধু শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং সরকারি কর্মচারীদের ঠকানোই নয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কর্মচারীদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করার সুচতুর কৌশলও বটে।’’
অন্য দিকে, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের জন্য নির্দেশে বলা হয়, বর্তমান পেনশনারদের এই বকেয়া সরাসরি তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে। যাঁরা কলকাতা এলাকার বাইরে ট্রেজ়ারি থেকে পেনশন পান, তাঁদের ক্ষেত্রে পেনশন মডিউলের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হবে। অন্য দিকে, যাঁরা কলকাতার ব্যাঙ্ক বা ভিন্রাজ্য থেকে পেনশন পান, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া, ২০১৬-২০১৯ সময়ের মধ্যে যাঁরা চাকরিতে ছিলেন কিন্তু পরে পদত্যাগ করেছেন বা মারা গিয়েছেন, তাঁদের বকেয়াও নির্দিষ্ট যাচাইয়ের পর প্রদান করা হবে। মৃত কর্মীদের ক্ষেত্রে তাঁদের মনোনীত উত্তরসূরি বা আইনি উত্তরাধিকারীরা এই টাকা পাবেন। সংশ্লিষ্ট পেনশন স্যাংশনিং অথরিটি (পিএসএ) বা ট্রেজ়ারিকে এই বিলগুলি দ্রুত প্রসেস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ের বকেয়া মেটানোর দিনক্ষণ পরবর্তী কালে জানানো হবে।