WB Assembly Elections 2026

ফলতার ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে ২০৮ করার অপেক্ষায় বিজেপি! অন্য দিকে, রাতারাতি ধস নামার ইঙ্গিত অভিষেকের নকল গড়ে

ফলতায় জিতলে কার্যক্ষেত্রে বিজেপির আসন হবে ২০৭। যদিও বিধি মেনে ফলতা পুনর্নির্বাচনের ফলাফল সংযুক্ত করে কমিশনের প্রকাশিত নথিতে তা ২০৮ হবে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২০ মে ২০২৬ ২২:১৪
Share:

(বাঁ দিক থেকে) শুভেন্দু অধিকারী, জাহাঙ্গির খান এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ক্ষমতায় থাকার সময়ে যা হয়ে উঠেছিল ‘দুর্গ’, ক্ষমতা হারানোর ১৫ দিনের মধ্যেই তা পরিণত হল তাসের ঘরে। রবীন্দ্রকাব্যের উপমা টেনে তৃণমূলের অন্দরের অনেকে যাকে ইতিমধ্যেই ‘নকল বুঁদির গড়’ বলে চিহ্নিত করতে শুরু করেছেন।

Advertisement

মঙ্গলবার ফলতা বিধানসভা পুনর্নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী জাহাঙ্গির খান ভোট থেকে সরে যাওয়ার কথা ঘোষণা করায় ওই আসনে বিজেপির জয় কার্যত সময়ের অপেক্ষা বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে নির্বাচন কমিশনের নথিতে ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে বিজেপির আসন ২০৮টিতে পৌঁছতে চলেছে। গত ৪ মে ২৯৩টি আসনের ভোটগণনায় (অনিয়মের অভিযোগে ফলতার ভোট বাতিল হওয়ায় ওই কেন্দ্রের গণনা হয়নি) বিজেপির প্রাপ্ত আসন ছিল ২০৭। ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুর আসনটি ধরে রেখে নন্দীগ্রামের বিধায়কপদে ইস্তফা দিয়েছেন। ফলে ফলতায় জিতলে কার্যক্ষেত্রে বিজেপির আসন হবে ২০৭। যদিও বিধি মেনে ফলতা পুনর্নির্বাচনের ফলাফল সংযুক্ত করে কমিশনের প্রকাশিত নথিতে তা ২০৮ হবে। নন্দীগ্রাম এবং হুমায়ুন কবিরের ইস্তফায় খালি হওয়া রেজিনগরে পরবর্তী পর্যায়ে হবে উপনির্বাচন।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ণিত ডায়মন্ড হারবার মডেল গত কয়েক বছর ধরে রাজ্য রাজনীতি তো বটেই, তৃণমূলের অন্দরেও বহুল চর্চিত। ৪ মে ভোটের ফলপ্রকাশের পর থেকে ১৯ মে পর্যন্ত ‘হীরক বন্দরে’ যে ভাঙন দেখা গিয়েছে, তাতে স্পষ্ট, অভিষেকের সংসদীয় এলাকায় তৃণমূলের সংগঠন ভয়াবহ ভাবে বিপন্ন। দলের লোকসভার নেতা তথা সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের বহুল চর্চিত মডেলে ভর করেই ২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে একের পর এক এলাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছিল জোড়াফুল! গত লোকসভা ভোটে ডায়মন্ড হারবারে ৭ লক্ষ ১০ হাজার ৯৩০ ভোটে জিতে রেকর্ড গড়েছিলেন অভিষেক। ২০২১-সালে ৪০ হাজার ভোটে জেতা ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ২০২৪-এ ‘লিড’ নিয়েছিলেন ১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৩৭২ ভোটের! দু’বছরের মাথাতেই অভিষেকের ‘ঘনিষ্ঠ অনুগামী’ জাহাঙ্গির খান সেই ফলতাতেই ‘ওয়াক ওভার’ দিয়ে দিলেন বিজেপিকে!

Advertisement

মঙ্গলবার ফলতায় নিজের বাড়ির সাংবাদিক বৈঠকে ‘তৃণমূলের পুষ্পা’ জাহাঙ্গির নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করতেই প্রশ্ন উঠে যায়, কী এমন ঘটল? যে জাহাঙ্গিরের ইশারা ছাড়া ফলতার ‘গাছের পাতা পর্যন্ত নড়ত না’, সেই তিনি কেন পিছু হটলেন? আনুষ্ঠানিক ভাবে জাহাঙ্গির জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ফলতার জন্য যে বিশেষ প্যাকেজের কথা ঘোষণা করেছেন, সেই সূত্রেই তিনি চান, তাঁর এলাকায় আরও উন্নতি হোক। অতএব, তিনি ভোটের ময়দান ছেড়ে দিলেন। কিন্তু ভোটের ময়দান থেকে ‘পুষ্পা’র এই পিঠঠান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দলের অন্দরে। ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল নেতাদের একাংশ বলছেন, জাহাঙ্গির গত কয়েক বছরে ফলতা এলাকায় অভিষেকের ‘চোখ-কান’ হয়ে উঠেছিলেন। ফলে একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতার এ হেন আত্মসমর্পণকে অনেকেই অভিষেকের পিছু হটা হিসাবে দেখতে এবং দেখাতে চেয়েছেন।

এমনকি, মঙ্গলবার তৃণমূলের বিধায়কদের বৈঠকে জাহাঙ্গিরকে উপলক্ষ করে অভিষেককে নিশানা করেছেন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন সাহারা। অভিষেক-ঘনিষ্ঠ জাহাঙ্গিরকে তাঁরা ‘কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল’ বলে উল্লেখ করেন। সূত্রের খবর, মমতার সামনে অভিষেককে ওই ভাবে নিশানা করার ঘটনা তৃণমূলের অনেককেই চমকিত করে দিয়েছে। বুধবার ওই তিন বিধায়ককে আবার কালীঘাটে ডেকে কথা বলেছেন মমতা-অভিষেক। তৃণমূলের গত দেড় দশকের ইতিহাসে যা কার্যত নজিরবিহীন।

তৃণমূল সূত্রে খবর, মঙ্গলবার দুপুরে জাহাঙ্গির সাংবাদিক বৈঠক করার আগে অভিষেকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। তার পর তিনি অপেক্ষা না-করে ভোটের ‘মাঠ ছাড়ার’ কথা জানিয়ে দেন। তবে, মঙ্গলবারের ওই সিদ্ধান্ত ঘোষণার প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছিল গত এক সপ্তাহ ধরেই। তৃণমূল সূত্রে খবর, ফলতার পুনর্নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যখন বিজেপি সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তখন অভিষেক তো বটেই তৃণমূলের কোনও প্রথম সারির নেতাদেরই সেখানে দেখা যায়নি। তা ছাড়া জাহাঙ্গির অনুগামীদের বক্তব্য, রাজ্য জুড়ে যে ভাবে ধরপাকড় শুরু হয়েছে, তা-ও ‘টিম জাহাঙ্গিরের’ মধ্যে উদ্বেগের চোরাস্রোত বইয়ে দিয়েছে। ভোটের ময়দান ছেড়ে দেওয়া, সে সবেরই ফল।

তবে শুধু ফলতার ভোট থেকে জাহাঙ্গিরের সরে দাঁড়ানো নয়। গত এক পক্ষকালে আরও তিনটি ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রথমত, ভোট গণনার দিন দুপুরে তৃণমূলের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, অভিষেকের দুর্গে থাবা বসিয়ে ফেলেছে বিজেপি। ডায়মন্ড হারবার লোকসভার মধ্যেই পড়ে সাতগাছিয়া বিধানসভা। সেই সাতগাছিয়া হেরে গিয়েছে তৃণমূল। জিতেছে পদ্মশিবির। দ্বিতীয়ত, জেতার পরেও এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল গত কয়েক দিন ধরে পলাতক। পুলিশি মামলা এড়াতে গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন তিনি। বিধায়ক পিতাকে না পেয়ে নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে পুত্রকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই বিষ্ণুপুরও অভিষেকের লোকসভার অন্তর্গত।

তৃতীয়ত, ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল বিধায়ক পান্নালাল হালদারের ‘সৌজন্যের রাজনীতি’! গত শনিবার ডায়মন্ড হারবারে প্রশাসনিক বৈঠক করতে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দেখা যায় বিধায়ক হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে পৌঁছেছেন তৃণমূলের পান্নালাল। কিন্তু দেখা হয়নি। ফুলের তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তৃণমূলের দু’বারের বিধায়ক। ডায়মন্ড হারবার এবং সৌজন্যের রাজনীতি গত কয়েক বছরে বিপরীতার্থক শব্দে পরিণত হয়েছিল। এই ডায়মন্ড হারবারেই ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির তৎকালীন সভাপতি জেপি নড্ডার কনভয়ে পাথরবৃষ্টির ঘটনা ঘটেছিল। সেখানে ফুলের তোড়া হাতে তৃণমূল বিধায়কের দাঁড়িয়ে থাকাকে নিছক সৌজন্য হিসাবে মানতে অনেকেরই কষ্ট হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হল, অভিষেকের দুর্গ কেন তাসের ঘরে পরিণত হল? ডায়মন্ড হারবার মডেল থেকে কেন খসে পড়ছে হীরককণা? রাজনৈতিক মহলের অনেকের বক্তব্য, ডায়মন্ড হারবারে অভিষেক গত ১২ বছরে যে সৌধ নির্মাণ করেছিলেন, তা ছিল ক্ষমতার ভিতের উপর নির্মিত। গাঁথনি থেকে পিলারের ঢালাইয়ের মশলায় মিশে ছিল পুলিশের সমর্থন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পশ্চিমবাংলায় অভিষেকের ডায়মন্ড হারবার যে ভাবে ‘কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল’ হয়ে উঠেছিল, তার নেপথ্যেও ছিল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। ফলে কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ পর্যন্ত যখন পরিবর্তনের হাওয়া ঝড়ে পরিণত হয়েছে, তখন বাদ থাকেনি ডায়মন্ড হারবারও। এক এক করে খসে পড়ছে ‘হিরের টুকরো’রা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement