—নিজস্ব চিত্র।
করোনা অতিমারির সময় থেকেই মন্দার বাজার। শিল্পীরা হাল ফ্যাশনের অলঙ্কার তৈরি করছেন বটে, কিন্তু পুজোর মণ্ডপ সাজানোর বরাতই তো মিলছে না। এই পরিস্থিতিতে পুজোর মুখে বিষণ্ণতা গ্রাস করেছে পূর্ব বর্ধমানের দরিয়াপুরের ডোকরা পাড়া।
দরিয়াপুর আউশগ্রামের একটি প্রাচীন জনপদ। এখানকার ডোকরা শিল্প দু’শো বছরেরও বেশি প্রাচীন। এখনও এখানকার প্রায় ৪০টির মতো পরিবার এই পেশাকে আঁকড়ে বাঁচেন। এটি মূলত ধাতু শিল্প। আগুনের চুল্লিতে পিতল গলিয়ে ছাঁচে ফেলে পরে তাতে নকশার কাজ করেন শিল্পীরা। এখানকার বর্তমান প্রজন্মের ছেলে মেয়েরাও তাঁদের বাপ-ঠাকুরদার এই পেশাকে ধরে রেখেছেন। শিল্পের সুনাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মিলেছে পুরস্কার এবং স্বীকৃতিও।
ডোকরা শিল্পের খ্যাতি এখন শুধু এ রাজ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। ডোকরা শিল্পের কাজ শিখতে বিদেশের শিল্পীদেরও দরিয়াপুরে আসা যাওয়া লেগেই থাকে। দরিয়াপুরের ডোকরা শিল্পীরা জানাচ্ছেন, বছরের অন্য দিনগুলিতে তাঁদের তৈরি নকশা বাক্স, ফুলদানি ও অন্যান শিল্পকর্মের চাহিদা মোটামুটি থাকেই। তারই মধ্যে একটু বেশি চাহিদা থাকে আদিবাসী সংস্কৃতিকেন্দ্রিক শিল্পকর্মের। কয়েক বছর আগে পর্যন্তও দুর্গাপুজোর আগে নানা দেবদেবীর মূর্তি তৈরির বরাত মিলত। বহু সাধারণ খরিদ্দারও দরিয়াপুরে এসে ডোকরার অলঙ্কার কিনতেন। কিন্তু অতিমারির পর থেকে ডোকরা শিল্পের বাজারে মন্দা দশা তৈরি হয়।
দরিয়াপুরের প্রখ্যাত ডোকরা শিল্পী শুভ কর্মকার বলেন, ‘‘দরিয়াপুরের শিল্পীপাড়ার প্রত্যেক শিল্পী অলঙ্কার তৈরি করে থাকেন। আমি নিজেও দেবী দশভূজা, সিংহবাহিনী ও দুর্গার মুখ-সহ আরও নানান ডিজাইনের অলংকার তৈরি করেন। তার মধ্যে দুর্গার মুখ ও মূর্তি বিশিষ্ট অলঙ্কার এবং আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্রীক লকেটের চাহিদা এত দিন খুব ছিল।২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দরিয়াপুরের এক একজন শিল্পী দুই থেকে চার হাজার পর্যন্ত অলঙ্কার তৈরির বরাত পেয়েছিলেন। পুজোর বাজারের জন্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা দরিয়াপুরে এসে অলঙ্কার তৈরির বরাত দিয়ে যেতেন। তখন একজন শিল্পী প্রতি দিন ১২ থেকে ১৫টি লকেট সেটের ডিজাইনের কাজ শেষ করেছেন। ফিনিসিং কাজ শেষ করে ওই লকেট সম্পূর্ণ তৈরি করতে আরও চার-পাঁচ দিন লেগে যেত। তখন পুজোর মার্কেটে ডোকরার অলঙ্কারের চাহিদাও ভাল ছিল। কিন্তু করোনার পর থেকে এ বছরও পুজোর মুখে ডোকরার বাজারে মন্দা। গড়পড়তা যা কাজ হয়, সেটুকুই এখন চলছে। কেন এই মন্দা দশা কাটছে নাস তারও কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।’’
দরিয়াপুরের আর শিল্পী সৌরভ কর্মকার বলেন,“পুজোর ঢাকে কাঠি পড়তে আর বেশি দেরি নেই। তবুও ডোকরা শিল্পের বাজার যে এতটা খারাপ থাকবে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। অথচ বিগত বছরগুলিতে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এমন অবস্থা চললে এ বছরও পুজো আমাদের বিষাদেই কাটতে হবে।’’
সরকারি ভাবে এখন কি কোনও সহায়তা মিলছে না? এই প্রশ্নের উত্তরে শিল্পী শুভ কর্মকার বলেন, ‘‘বিশ্ববাংলা থেকে যে কাজ আমাদের কাছ থকে চাইছে, সেটা আমরা দিতে পারছি না। কারণ, বিশ্ববাংলা থেকে ডোকরা শিল্প সামগ্রীতে গোল্ডেন পালিশ চাইছে। কিন্তু ডোকরা শিল্প সামগ্রীতে গোল্ডেন পালিশ দিলে ডোকরার আসল ঐতিহ্যটাই হারিয়ে যাবে। এই নিয়ে টানাপড়েন লেগেই আছে। তবে যদি দেখা যায়, গোল্ডেন পালিশ দেওয়া ডোকরার শিল্প সামগ্রীর চাহিদা বাজারে বাড়ছে, তখন ঐতিহ্যের বিষয়টি দূরে সরিয়ে রেখে অগত্যা সেটাই করতে হবে।’’