শীতকাল মানেই বাজারে হরেক রকম সব্জির ডালা নিয়ে হাজির হন বিক্রেতারা। পছন্দসই সব্জির খোঁজে বাজার করতে যায় বাঙালিও। কিন্তু এ বার, নতুন বছরের শুরুতেই ক্রেতা, বিক্রেতা— দু’পক্ষেরই মাথায় হাত। জেলার বিভিন্ন বাজারে সব্জির জোগান কম। দামও বেশ চড়া। সব্জি বিক্রেতাদের দাবি, অগস্টের বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণেই বাজারে সব্জির জোগান কম।
কালনা মহকুমার পূর্বস্থলী ১ ও ২ ব্লকে জেলার সবথেকে বেশি সব্জি চাষ হয়। দু’টি ব্লক মিলিয়ে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে সব্জি চাষ হয়। এ ছাড়াও কালনা ১ ও ২ ব্লকের মতো বেশ কয়েকটি জায়গাতেও প্রচুর পরিমাণ সব্জি উৎপাদন হয়। এই সমস্ত এলাকার সব্জি স্থানীয় পাইকারি বাজারগুলির পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পাড়ি দেয়। প্রতিবারই এই সময়ে সব্জির অতিরিক্ত জোগান থাকে বাজারে। সব্জি বিক্রেতাদের দাবি, মাস খানেক আগেও জেলার বিভিন্ন পাইকারি বাজারে প্রচুর সব্জি আমদানি হয়েছে। এমনকী জোগান এতটাই বেশি ছিল যে, ফুলকপি পিছু দেড় থেকে আড়াই টাকা দরও উঠছিল না। দাম না পেয়ে পূর্বস্থলীর সুলুন্টু এলাকার বাসিন্দা এক ফুলকপি চাষির আত্মহত্যারও অভিযোগ ওঠে।
কিন্তু মাসখানেক যেতে না যেতেই ছবিটা পুরো উল্টে গিয়েছে। কী রকম? দিন কয়েক ধরে কালনার চকবাজার, নিয়ন্ত্রিত বাজার সমিতি, ধাত্রীগ্রাম, পূর্বস্থলীর সমুদ্রগড়, পারুলিয়া, কালেখাঁতলার মতো পাইকারি বাজারগুলিতে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, অন্য বারের তুলনায় এ বার সব্জির জোগান অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে সব্জির দামও ক্রমশ উর্ধ্বমুখী। যেমন, বড় আকারের ফুলকপি বিকোচ্ছে ১৭ থেকে ২০ টাকায়। ছোট ফুলকপির দর ঘোরাফেরা করছে ১২-১৩ টাকার মধ্যে। পাইকারি বাজারে দাম বেড়েছে বাঁধাকপি, মুলো, উচ্ছে, ঝিঙে, মটরশুঁটি, পেঁয়াজকলি-সহ বিভিন্ন সব্জির। খোলা বাজারে দর আরও চড়া। কালনা মহকুমা লাগোয়া পাশের নদিয়ার কিছু অংশেও সব্জি দাম বেশ চড়া। দাম চড়েছে পূর্বস্থলীর উপর নির্ভরশীল ভাতার, মেমারির মতো বর্ধমানের বেশ কিছু এলাকাতেও। শুধু জোগান কম নয়, শীতের শুরুতেই সব্জির গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কালনার বাসিন্দা খোকন সরকারের দাবি, ‘‘সপ্তাহ খানেক ধরে সব্জির দাম বেড়েই চলেছে। তার উপর বাজার ঘুরেও ভাল সব্জি বেশি পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে সব্জি কেনা খানিকটা হলেও কমে গিয়েছে।’’
কিন্তু সব্জি বাজারের এমন হাল কেন? কৃষি দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে, অগস্টের অতিবৃষ্টিতে ভাগীরথী, দামোদর, বাঁকা, গুরজোয়ানির মতো নদীগুলির জল উপচে খেত-বাড়ি সবই প্লাবিত হয়। বেশ কয়েকটি জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে খেত থেকে জল না নামায় নষ্ট হয়ে যায় বেশির ভাগ সব্জি। ফলে খেত সাফ করে চাষ শুরু করতে এমনিতেই মাসখানেক দেরি হয়ে যায়। এ ছাড়াও জেলায় জলদি, মধ্য ও নাবি— এই ৩টি সময়পর্বে সব্জির চাষ হয়। অতিবৃষ্টির কারণে সব্জি চাষের এই সময়পর্বটিই ভেঙে গিয়েছে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞদের দাবি। তাঁরা জানান, গত বছর সেপ্টেম্বর নাগাদ অধিকাংশ চাষি সব্জি চাষ শুরু করেন। নভেম্বরে সব্জি ওঠায় বাজারদর কমে যায়। বাজারদর কম থাকায় অনেক চাষি আবার পরের ধাপের সব্জি চাষ শুরুই করেননি। কালনার বাঘনাপাড়া এলাকার বক্কর শেখ যেমন বলেন, ‘‘এ বার তেমন দাম মিলবে না আন্দাজ করে আলুর চাষ করেছি।’’ জেলার এক সহ কৃষি অধিকারিক পার্থ ঘোষ বলেন, ‘‘অন্য বার একটা সব্জি উঠতে না উঠতেই চাষিরা ফের চাষ শুরু করে দেন। এ বার বৃষ্টির কারণে তা সম্ভব হয়নি।’’ গত ডিসেম্বরে আকাশ মেঘলা থাকার কারণেও সব্জি চাষে প্রভাব পড়েছে বলে দাবি চাষিদের একাংশের। সব মিলিয়ে ডিসেম্বর ও বছরের শুরুতে সব্জির জোগানে টান পড়ে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে মাসখানেক লাগবে বলেও দাবি কৃষি কর্তাদের।