লোকসভা ভোটের ফল অনুযায়ী শহরের বেশিরভাগ ওয়ার্ড তাদেরই দখলে, তবু তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে যে ধস নেমেছে তা অনস্বীকার্য। একদিকে গত পুরভোটের জোটসঙ্গী কংগ্রেস এ বার কোনও ওয়ার্ড থেকেই জিততে পারেনি, অন্য দিকে প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ভোট কেটে উঠে এসেছে বিজেপি।
কালনা পুরসভার ১৮টি ওয়ার্ড থেকে তৃণমূল পেয়েছে ১৩৩০২টি ভোট। ১৪টি ওয়ার্ড নিজেদের দখলে রাখলেও ৭টিতে ব্যবধান ১৪০-এর নীচে। সেখানে সিপিএমের প্রাপ্ত ভোট ১১৭৭৮। আর বিজেপির ভোট ৫৯০৫। যেখানে ২০১১-র বিধানসভা ভোটে বিজেপির প্রাপ্ত ভোট ছিল ৭৫৬।
কালনা পুরভোটে তৃণমূল ৭টি, কংগ্রেস ৫টি ও সিপিএম ৬টি আসন পায়। বোর্ড গঠন করে তৃণমূল-কংগ্রেস জোট। তবে এ বারের লোকসভা ভোটে জোটহীন লড়াইয়ে তৃণমূল বেশিরভাগ ওয়ার্ড নিজেদের দখলে রাখতে পারলেও ব্যবধান কমেছে। শহরের এক তৃণমূল নেতার কথায়, “আমাদের জেতা বেশিরভাগ ওয়ার্ডে ভাল ভোট পেয়েছে বিজেপি। পুরভোটের আগে এমন অঙ্ক চিন্তার তো বটেই।”
পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৭৮৬টি ভোট পেয়ে জিতেছে সিপিএম। তৃণমূল পেয়েছে ৬৭৭টি ভোট। বিজেপির প্রাপ্ত ভোট ৫৪৮। অথচ এই ওয়ার্ডেই পুরভোটে জয়ী হয়েছিল কংগ্রেস-তৃণমূল জোট। কালনার উপপুরপ্রধান বিশ্বজিৎ সেনের ওয়ার্ড ১৫ নম্বরেও তৃণমূল ১২০৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে। সিপিএম পেয়েছে ৬৬৫টি ভোট। পাল্লা দিয়ে বিজেপি পেয়েছে ৬০৬টি ভোট। ৭ নম্বর ওয়ার্ডেও বিজেপি ছ’শোর বেশি ভোট পেয়েছে।
ভোট ব্যাঙ্ক তলানিতে ঠেকেছে কংগ্রেসেরও। যে পাঁচটি ওয়ার্ডে তারা ক্ষমতায় ছিল তার কোনওটাতেই ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি কংগ্রেস। উপপুরপ্রধান ১৫ নম্বর ওয়ার্ড থেকে বড় ব্যবধানে জিতেছিলেন পুরভোটে। এ বার সেখানে কংগ্রেস পেয়েছে ১৮০টি ভোট, বিজেপি পেয়েছে ৬০৬টি। নিজের ওয়ার্ডে পিছিয়ে পড়েছেন কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত আলো ও জল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্সিলর আনন্দ দত্ত। তৃণমূল এগিয়েছে ১৫২ ভোটে।
শহরের ১৮টি ওয়ার্ডে কংগ্রেসের মোট ভোট ১৯৫৮, সেখানে বিজেপি পেয়েছে ৫৯০৫টি ভোট। অথচ লোকসভা ভোটের আগে এ শহরে বিজেপির তেমন কোনও অস্তিত্ব ছিল না। প্রার্থীর সমর্থনে খুব বেশি দেওয়াল লিখন, ফ্ল্যাগ বা পোস্টারও পড়েনি। এমনকী নির্বাচনী প্রচারেও কর্মী-সমর্থকদের ভিড় দেখা যায়নি। তাহলে ভোটবাক্স উজান এল কীভাবে? শহরের বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, দেশ জুড়ে মোদি হাওয়ার প্রভাব পড়েছে এ শহরেও। তাছাড়া গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ তৃণমূলের একটি অংশ প্রার্থীর হয়ে প্রচার করেছে, অন্য অংশের সমর্থন আমাদের তরফে এসেছে। শহরের বিজেপি নেতা সুশান্ত পাণ্ডের দাবি, “শুধু তৃণমূলের ওই অংশেরই নয়, নরেন্দ্র মোদীকে দেখে সিপিএম, কংগ্রেস এবং নতুন ভোটারদের সমর্থন আমরা পেয়েছি।” বিজেপির জেলা সভাপতি রাজীব ভৌমিক জানান, শুধু কালনা নয়, কাটোয়া পুরসভাতেও দল ভাল ফল করেছে। সেখানে ৮টি ওয়ার্ডে বিজেপি এগিয়ে রয়েছে।
তবে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে ভোট ব্যাঙ্কে ধস নামছে, এ কথা মানতে নারাজ শহরের তৃণমূল নেতারা। কালনার তৃণমূল বিধায়ক তথা পুরসভার চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎবাবু বলেন, “ভোট কমার কারণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নয়। বিজেপি হাওয়া যে এভাবে প্রভাব ফেলবে সেটা বুঝতে পারিনি।” আর শহরের কংগ্রেসের নেতা লক্ষ্মন রায়ের দাবি, প্রার্থীর নাম ঘোষণা দেরিতে হওয়ায় প্রচারে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলাম আমরা। তাছাড়া সাংগঠনিক শক্তিও তেমন নেই। তাঁর দাবি, দলের নেতা-কর্মীরা পুরভোট বা বিধানসভা ভোটে যেভাবে নিজেদের উজাড় করে দেয় লোকসভা ভোটে ততখানি তৎপরতা দেখা যায় না।