বাড়ির দাওয়াই বসে বিড়ি বাঁধছে সৌরভ। নিজস্ব চিত্র।
কাঠা দেড়েক জমির উপর এক চিলতে ঘর। দরমা, পুরনো ইট দিয়ে কোনওক্রমে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ঘরে সূর্যের আলো ঢোকে না। বৃষ্টির জল আটকাতে টালির চালে বিছিয়ে রাখা রয়েছে পলিথিন। অভাবের এই সংসারে এক মুঠো রোদ্দুরের মতো উঠে এসেছে বাড়ির বড় ছেলে সৌরভ দাস। এ বার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৪৩৩ নম্বর পেয়েছে কালনা মহারাজা উচ্চবিদ্যালয়ের এই ছাত্র।
বছর পাঁচেক আগে সৌরভের বাবা তাদের ছেড়ে অন্যত্র সংসার পেতেছেন। সৌরভের মা ঝর্নাদেবী বিড়ি বাঁধেন। মাস গেলে রোজগার বড়জোর হাজার দেড়েক টাকা। তাতেই চলে সংসার ও সৌরভ ও তাঁর সপ্তম শ্রেণিতে পড়া ভাই দেবজিৎ দাসের পড়াশোনা। পড়ার ফাঁকে মাকে মাঝে মধ্যেই সাহায্য করেন দুই ভাই। মাধ্যমিকে ৭১ শতাংশ নম্বর পাওয়ার পরেও অভাবের কারণে পরবর্তী পড়াশোনায় দাঁড়ি পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা গ্রাস করলেও শেষ পর্যন্ত নিজের স্কুল ও আত্মীয়দের সহযোগিতায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় সৌরভ। দু’বছরের কঠিন লড়াইয়ের পরে উচ্চমাধ্যমিকে সৌরভের প্রাপ্ত নম্বর হল বাংলায় ৮৫, ইংরেজিতে ৭৫, ভূগোলে ৯১, দর্শনে ৯৫ ও সংস্কৃতে ৮০। নিজের স্কুলের মধ্যে এ বার সৌরভই সেরা।
সৌরভ জানায়, পড়াশোনা করার জন্য তাঁর ভাল সহায়িকা বই ছিল না। তবে চার গৃহশিক্ষক সাহায্য করেছেন। তাঁদের মধ্যে তিন জনই বিনা বেতনে পড়াতেন। স্কুল থেকেও সৌরভকে সাহায্য করা হয়েছিল। কোনও বেতন নেওয়া হত না। সৌরভের কথায়, “সংসার চালানোর জন্য অসুস্থ হলেও মা কখনও বিড়ি বাঁধা বন্ধ করত না। সংসারে সাহায্য করার জন্য আমি নিজে একটি গৃহশিক্ষকতা করতাম। আঁকাও শেখাতাম। বাবা পাশে না থাকলেও আমার কাকা উত্তম দাস আর্থিক সাহায্য করেছিলেন। সৌরভের স্বপ্ন ভূগোল নিয়ে পড়াশোনা করে শিক্ষক হতে চায়। কিন্তু অভাবের সংসারে ছেলের এই স্বপ্ন কী ভাবে সফল হবে? মায়ের কথায় ফুটে ওঠে আশঙ্কা। ঝর্নাদেবী বলেন, “দরকারি বই কিনে দেওয়া তো দূরের কথা, পরীক্ষার আগে বড় ছেলেকে দু’বেলা পেট ভরে খেতে দিতেও পারিনি। অনেক প্রতিকূলতা সামলেছি। তবে ছেলে যখন এতদূর সাফল্য পেয়েছে তখন ওর স্বপ্ন সফল করা হল আমার কাছে চ্যালেঞ্জ।”
নিজের স্কুলে সৌরভ পরিশ্রমী, মেধাবী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ ছাত্র বলে পরিচিত। প্রধান শিক্ষক শ্রীমন্ত ঘোষ বলেন, “মেধার সঙ্গেই সৌরভের পরিশ্রম করার ক্ষমতা রয়েছে। আমরা গরীব মেধাবী ছাত্রদের থেকে কোনও ফি নিইনা। তাই ওঁর থেকেও কোনও ফি নেওয়া হয়নি। আমাদের স্কুলের শিক্ষকরা সাধ্যমত সৌরভের পাশে ছিল। ভবিষ্যতেও থাকবে।”
সোমবার সকালে সৌরভের বাড়ি যান রাজ্যের মন্ত্রী তথা পূর্বস্থলীর তৃণমূল বিধায়ক স্বপন দেবনাথ। তিনি কিছু অর্থসাহায্যও তুলে দেন সৌরভের হাতে। স্বপনবাবু বলেন, “অভাবী পরিবারের এই ছেলেটি অত্যন্ত মেধাবি। আমি ওর পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছি।”