সরায় আঁকা লক্ষ্মী মনে করায় পূর্ব বাংলার রীতি

এ পার বাংলার পাশাপাশি বাংলাদেশের ঢাকা, ময়মনসিংহ, বিক্রমপুর, ফরিদপুর-সহ বিভিন্ন এলাকায় কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর চল রয়েছে। তবে রীতিতে ফারাক রয়েছে দুই বাংলার।

Advertisement

উদিত সিংহ

শেষ আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০১৫ ০১:৪৪
Share:

চলছে সরাতে আঁকার কাজ।—নিজস্ব চিত্র।

এ পার বাংলার পাশাপাশি বাংলাদেশের ঢাকা, ময়মনসিংহ, বিক্রমপুর, ফরিদপুর-সহ বিভিন্ন এলাকায় কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর চল রয়েছে। তবে রীতিতে ফারাক রয়েছে দুই বাংলার। এ পার বাংলায় পুজো হয় মূলত মাটির প্রতিমায়, কিন্তু বাংলাদেশে প্রধানত সরায় এঁকে লক্ষ্মীর পুজো করা হয়। আর সেই রীতিই আজও বহন করে চলেছেন বর্ধমানের বেশ কয়েকটি পরিবার। আসলে দেশভাগ হলেও, সরায় আঁকা পুজোর রীতিটি বদলায়নি বাংলাদেশ থেকে আসা পরিবারগুলি।

Advertisement

বর্ধমান শহর সংলগ্ন কাঞ্চননগর, উদয়পল্লি, ভাতছালা, ইছলাবাদ, নীলপুর-সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ঢুঁ মেরে দেখা গেল, ও পার বাংলা থেকে আসা বিভিন্ন পরিবারে এখনও সরায় আঁকা লক্ষ্মীর প্রতিমূর্তিকে পুজো করা হয়। উদয়পল্লির প্রবীণ বাসিন্দা তরুলতা ঘোষ বলেন, ‘‘আমার স্বামী প্রয়াত নিতাই চন্দ্র ঘোষ বাড়ির পুরনো রীতি মেনে এ ভাবেই পুজো করতেন। ছেলেরাও তা বজায় রেখেছে।’’ স্থানীয় বাসিন্দা গৌরাঙ্গ ঘোষ, বঙ্কিম ঘোষেরা জানান, তাঁরা পূর্ববঙ্গের ফেলে আসা রীতি মেনে এখনও এ ভাবে লক্ষ্মীর পুজো করেন। একই কথা বলেন কাঞ্চননগরের প্রশান্ত মজুমদারও। তাঁর দাবি, গত পঞ্চাশ বছর ধরেই সরায় আঁকা লক্ষ্মীর পুজো করেন তাঁরা।

কী ভাবে হয় এই কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো? আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে অর্থাৎ কোজাগরী পূর্ণিমায় দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বাংলার ব্রত’ বইতে এই লক্ষ্মী পুজোটি সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি জানান, দেবীর কাছে খেতে ভাল ফলনের কামনা করাই আসলে এই পুজোর নৃতাত্ত্বিক কারণ। পুজো বা ব্রত কথার সঙ্গে আলপনার একটি সম্পর্ক রয়েছে। তরুলতাদেবীর ছেলে মাধববাবু জানান, পুজোর দিন সন্ধেবেলা বাড়িতে আলপনা দেওয়া হয়। আলপনার সঙ্গে পুজো বা ব্রতকথার সম্পর্কটি বেঝাতে গিয়ে অবন ঠাকুর বলেছিলেন, আলপনা আসলে ‘কামনার প্রতিচ্ছবি।’ দেবী পুজোর উপাচার হিসেবে থাকে ফল, মিষ্টি, মোয়া, নাড়ু প্রভৃতি। কোজাগরী লক্ষ্মীর প্রতি আচার নিবেদনের সঙ্গেও একটি লোকবিশ্বাস জড়িত রয়েছে। পুজোর সময় মোট ১৪টি পাত্রে উপাচার রাখা হয়। তারপর পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্য করে জল দানের রীতি রয়েছে। কাঠের জলচৌকির উপর লক্ষ্মীর সরাটিকে স্থাপন করা হয়। তারপর কলাপাতায় টাকা, স্বর্ণ মুদ্রা, ধান, পান, কড়ি, হলুদ ও হরিতকি দিয়ে সাজানো হয় পুজো স্থানটিকে। এই সরার মাধ্যমে পুজোর চল যে বাংলাদেশের রীতি, তা বেশ বোঝা যায় একটু ঠাহর করলেই। পুজো মণ্ডপে নৌকোর ছবি দেখা যায়। এটি আসলে নদী মাতৃত বাংলাদেশেরই প্রতীক বলে মনে করেন সমাজতাত্ত্বিকেরা।

Advertisement

তবে সরা শিল্পের চাহিদা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে এসেছে বলে শিল্পীদের আক্ষেপ। শিল্পী জগদীশ পাল বলেন, ‘‘চাহিদা কম। এ বার মোটে ৩০টি বরাত পেয়েছি।’’ পাশাপাশি রয়েছে শ’খানেক মাটির প্রতিমার বরাত। তবে এর জন্য আক্ষেপ নেই ছোটনীলপুরের অনিল পাল, রথতলার সুনীল সরকার বা রাজগঞ্জের বীণারানি ঘোষদের। তাঁদের বক্তব্য, সরায় পুজোর মাধ্যমে আসলে খানিকটা হলেও ফেলে আসা শিকড়ের সন্ধানী হওয়া যায়।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement