হিরণ চট্টোপাধ্যায় এবং দিলীপ ঘোষ। ফাইল চিত্র।
দিলীপ ঘোষ-প্রদীপ সরকার-হিরণ চট্টোপাধ্যায়। পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুর সদর আসনের সাম্প্রতিক বিধায়কদের ক্রম এই রকম। তার আগে দীর্ঘ সময় একাই রাজ করেছেন প্রয়াত কংগ্রেস নেতা জ্ঞানসিংহ সোহনপাল। টানা বিধায়ক থেকেছেন। ১৯৬৯ থেকে ২০১১ সাতটি বিধানসভা নির্বাচনে ছ’বার জিতেছেন। মাঝে শুধু ১৯৭৭ সালে জিতেছিলেন সুধীরদাস শর্মা। স্বাধীনতার পরে প্রথম দুই বিধানসভা নির্বাচনে অবশ্য এই আসন থেকে জয় পেয়েছিলেন সিপিআইয়ের নারায়ণ চৌবে।
রেল শহরের এ হেন রাজনৈতিক ইতিহাস থাকলেও বর্তমান বিধায়ক হিরণের দাবি, অতীতে তাঁর মতো বিধায়ক পায়নি খড়্গপুর সদর। এমনকি কোনও সাংসদও তাঁর মতো কাজের লোক ছিলেন না বলে শনিবার হিরণ দাবি করেছেন আনন্দবাজার অনলাইনের ফেসবুক ও ইউটিউব লাইভ অনুষ্ঠানে। হিরণ মুখে ৭৫ বছরের কথা বললেও রাজনৈতিক মহল অবশ্য বলছে, হিরণ আসলে তাঁর দলেরই প্রাক্তন দিলীপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ, ২০১৬ থেকে ২০১৯ দিলীপ ছিলেন এই আসনের বিধায়ক। আর তার পর থেকে এই এলাকারই সাংসদ দিলীপ।
দিলীপের সঙ্গে তুলনা কেন? তার উত্তর জানে রাজনৈতিক মহল। হিরণের সঙ্গে দিলীপের যে বনিবনা নেই তা অতীতে অনেকবারই প্রকাশ্য এসেছে। সম্প্রতি খড়্গপুর শহরে দলের পুরভোট প্রস্তুতি বৈঠক হিরণকে ছাড়াই করেছেন দিলীপ। তারপরে একাধিক সাংগঠনিক হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপ ছেড়ে দেন হিরণ। যদিও সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি অনেক গ্রুপে রয়েছি। ওই গ্রুপগুলিতে আমার থাকার দরকার নেই মনে করেই ছেড়েছি। দল বললে আবার ঢুকে যাব।”
শনিবার রাতের অনুষ্ঠানে হিরণের গলায় স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব বুঝিয়ে অনেক অনুযোগ শোনা যায়। তিনি বলেন, “আমি পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে জেতা বিজেপি-র একমাত্র বিধায়ক। আমি বিধানসভার স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে কলকাতায়, অথচ আমার অজ্ঞাতেই খড়্গপুর পুরভোটের প্রস্তুতি বৈঠক হয়ে গেলে সেটা তো মেনে নেওয়া যায় না।” রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার থেকে সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) অমিতাভ চক্রবর্তী বা বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে তিনি বার বার নালিশ জানিয়েছেন বলেও দাবি করেন হিরণ।দিলীপের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বুঝিয়ে টেনে আনেন দিলীপের বলা তিন বছর আগের ‘গরুর দুধে সোনা’ প্রসঙ্গ। শনিবার আনন্দবাজার অনলাইনের ‘অ-জানাকথা’য় নিজের কাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে হিরণ বলেন, “গরুর দুধে সোনা আছে কি না, তা নিয়ে গবেষণার আগে যুব সমাজের কী করে উন্নয়ন হবে, তাঁরা কী করে কাজ পাবেন, সেটা নিয়ে গবেষণা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।” সেই প্রসঙ্গে মে মাসে জয়ের পর এই ক’মাসে তিনি খড়্গপুর সদরের জন্য কী কী করেছেন এবং কী কী করার পরিকল্পনা করেছেন, তার ফিরিস্তি দেন হিরণ। জানান, ২৫ ডিসেম্বের, পয়লা জানুয়ারির মতো দিনেও রাত পর্যন্ত দলীয় কর্মীদের আটকে রেখে তিনি সমাজসেবামূলক কাজ করেন। এর জন্য কর্মীদের কাছেও তাঁকে অনুযোগ শুনতে হয়। তিনি সব সময় নিজের বিধানসভা এলাকার প্রান্তিক মানুষদের জন্য কাজ করতে চান এবং তাঁর মতো করে অতীতে কেউ করেনি বলেও দাবি করেন হিরণ।
চাকরি বদলালে দোষ নেই কিন্তু রাজনৈতিক দলবদলে দোষ কেন? তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে যখন বিভিন্ন মহলে যখন নানা জল্পনা, তখন এমনই প্রশ্ন শোনা গেল খড়্গপুর সদরের বিজেপি বিধায়ক হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের মুখে। শনিবার আনন্দবাজার অনলাইনের ফেসবুক ও ইউটিউব লাইভে হাজির হয়ে তাঁর সাম্প্রতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্নের মুখে পরেন হিরণ। তিনি কি দলবদলের কথা ভাবছেন? এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে হিরণ জানান, রংবদল নিয়ে তাঁর কোনও আপত্তি নেই। তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষও তো নিজেদের মতামত বদলে সরকার বদলান। পেশাজীবী, চাকরিজীবীরাও কাজের জায়গা বদলান। তবে রাজনীতিকদের দোষ কোথায়? একই সঙ্গে তাঁর দাবি, রাজনৈতিক রং নয়, রাজনীতি করতে হবে কোনটা ঠিক ভেবে। প্রান্তিক মানুষদের উন্নয়নের কথা ভেবে।
তবে দলের ভিতরে কি তিনি ঠিক মতো কাজ করতে পারছেন না? সাংগঠনিক বিষয়ে নাকগলানো কি রাজ্য নেতৃত্বের না-পসন্দ? এমন প্রশ্নের উত্তরও সরাসরি দেননি হিরণ।
রাজনৈতিক মহল জানে মেদিনীপুরের সাংসদ তথা বিজেপি-র প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের সঙ্গে তাঁর বনিবনা না হওয়াতেই ‘বিদ্রোহী’ হিরণ। তবে সেটা তিনি মানতে চাননি। বরং, দিলীপের পাশে দাঁড়িয়ে দলের রাজ্য নেতৃত্বের দিকেই অনুযোগের আঙুল তোলেন। হিরণ বলেন, “দিলীপবাবু তো আমাদের সাংসদ। দল বললে উনি কর্মসূচি করবেনই। কিন্তু রাজ্য সভাপতি থেকে নেতৃত্বের সকলকে বলেছিলাম, আমার এলাকায় কোনও কর্মসূচি থাকলে আমায় যেন আগে জানানো হয়।”