সায়েন্স সিটি প্রেক্ষাগৃহে অমিত শাহের উপস্থিতিতে বিজেপির কর্মী সম্মেলন চলাকালীন দর্শকাসনে বিএল সন্তোষ (মাঝে), অমিতাভ চক্রবর্তী (ডান দিকে) ও সতীশ ঢোন্ড (বাঁ দিকে)। ছবি: সংগৃহীত।
তিনি যে কলকাতায় আসছেন, সে কথা বিজেপির রাজ্য নেতাদের অনেকেই শুনেছিলেন। কিন্তু অমিত শাহের কোন কর্মসূচিতে তিনি কী ভূমিকা পালন করবেন, তা অধিকাংশের কাছেই স্পষ্ট ছিল না। তবে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) যখন আসছেন, তখন সাংগঠনিক কার্যকলাপে পৌরোহিত্য করবেন বলেই সকলে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু বিএল সন্তোষ কখন এলেন, কোন কোন কর্মসূচিতে অংশ নিলেন, কখনই বা ফিরে গেলেন, শেষ পর্যন্ত তা নজরেই পড়েনি রাজ্য বিজেপির অনেক পদাধিকারীর। কর্মী সম্মেলনে তিনি যে রাজ্যের দুই সংগঠন সম্পাদককে পাশে নিয়ে দর্শকাসনে বসেছিলেন, তা-ও অনেকে জানতেন না। সন্তোষের এই ‘নীরব’ পশ্চিমবঙ্গ সফর নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে রাজ্য বিজেপির অন্দরে।
বুধবার সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে বিজেপির ‘মহানগর কর্মী সম্মেলন’ আয়োজিত হয়েছিল। কলকাতা এবং শহরতলির মোট ২৮টি বিধানসভা কেন্দ্রের শক্তিকেন্দ্র (পাঁচ-সাতটি বুথ) ও তদূর্ধ্ব স্তরের পদাধিকারীদের ডাকা হয়েছিল। শাহ ছিলেন মূল বক্তা। মঞ্চে শাহের দু’পাশে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর জন্য নির্দিষ্ট চেয়ার রাখা ছিল। রাজ্যের দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার এবং শান্তনু ঠাকুরের জন্যও একই ব্যবস্থা ছিল। চেয়ার ছিল সুনীল বনসল, মঙ্গল পাণ্ডে, অমিত মালবীয়, ভূপেন্দ্র যাদব, বিপ্লব দেবের মতো কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক এবং প্রভারীদের জন্য। এমনকি, তাপস রায়ের জন্যও চেয়ার ছিল। শান্তনু ছাড়া প্রত্যেকে হাজিরও ছিলেন। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে হাজির থাকলেও কর্মী সম্মেলনের সেই মঞ্চে সন্তোষ ছিলেন না। তিনি দর্শকাসনে ছিলেন। তা-ও আবার প্রথম সারিতে নয়। দ্বিতীয় সারিতে। তাঁর এক পাশে ছিলেন রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) অমিতাভ চক্রবর্তী। অন্য পাশে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) সতীশ ঢোন্ড।
বিধাননগরে সাংসদ-বিধায়কদের নিয়ে অমিত শাহের বৈঠকে মঞ্চেই বসেছিলেন বিএল সন্তোষ। ছবি: সংগৃহীত।
ওই কর্মী সম্মেলনের আগে বিধাননগরের একটি হোটেলে শাহ বৈঠক করেন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাংসদ ও বিধায়কদের সঙ্গে। সেই বৈঠকে সন্তোষ মঞ্চে ছিলেন। মঞ্চের এক প্রান্তে বসেছিলেন। তবে অমিতাভ এবং সতীশকে সেই মঞ্চেও দেখা যায়নি।
সন্তোষ যে কলকাতায় এসেছিলেন এবং শাহের অন্তত দু’টি কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন, তা রাজ্য বিজেপির অনেক পরিচিত মুখও জানতেন না। কর্মী সম্মেলনে সন্তোষ কেন দর্শকাসনে ছিলেন, সে বিষয়ে আনন্দবাজার ডট কম খোঁজখবর শুরু করায় অনেকে জানতে পারেন, বিজেপির সর্বভারতীয় সংগঠন সম্পাদক সায়েন্স সিটির কর্মসূচিতে হাজির ছিলেন। ফলে তাঁদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়। সন্তোষ কখন এসেছিলেন, কোন কোন কর্মসূচিতে ছিলেন, মঞ্চে কেন বসেননি, এ সব বিষয়ে রাজ্য বিজেপির অন্দরে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে কেউই প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চাননি। তবে যাঁরা সন্তোষের উপস্থিতির কথা জানতেন না, তাঁরা সে কথা স্বীকার করতেও দ্বিধা বোধ করেননি।
বিজেপি সূত্রের ব্যাখ্যা, সন্তোষ অথবা অমিতাভ বা সতীশ যে সব পদে রয়েছেন, তাতে কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচির মঞ্চে তাঁদের থাকার কথা নয়। তাঁদের কাজ শুধুমাত্র সংগঠন সামলানো। তাই কর্মী সম্মেলনের মঞ্চে তাঁদের না-থাকাই স্বাভাবিক। বিধাননগরের হোটেলে সাংসদ-বিধায়কদের নিয়ে শাহ যে বৈঠক বুধবার করেন, তা অভ্যন্তরীণ বৈঠকের পর্যায়ে পড়ায় সেই মঞ্চে সন্তোষের উপস্থিতি ‘অস্বাভাবিক’ নয়। কিন্তু সায়েন্স সিটি প্রেক্ষাগৃহে কর্মসূচি পুরোপুরি রাজনৈতিক হওয়ায় সেই মঞ্চে সংগঠন সম্পাদকের না-থাকাই বিজেপির দস্তুর। দলের নেতাদের তেমনই দাবি।
বিজেপি নেতাদের এই ব্যাখ্যা অসত্য নয়। দলের রীতিনীতি অনুযায়ী প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচির মঞ্চ থেকে সংগঠন সম্পাদকরা দূরে থাকবেন, এমনই দস্তুর। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিতে গত কয়েক বছরে সে প্রথা বার বার ভাঙতে দেখা গিয়েছে। নরেন্দ্র মোদীর বা শাহের জনসভার মঞ্চে অমিতাভ-সতীশদের বসে থাকতে দেখা গিয়েছে। শাহের সভায় মাইক নিয়ে অমিতাভকে স্লোগান দিতেও দেখা গিয়েছে। সন্তোষের ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের ‘ব্যতিক্রম’ দেখা গিয়েছে বলে একাধিক বিজেপি নেতা মানছেন। কিন্তু বুধবার শাহের কর্মসূচিতে সন্তোষ, অমিতাভ, সতীশরা কেন দর্শকাসনে বসলেন, সে প্রশ্নের উত্তর বিজেপির রাজ্য নেতাদের অনেকের কাছেই নেই। কেউ কেউ বলছেন, ‘‘রীতিনীতির বাইরে গিয়ে কোনও কোনও ঘটনা কখনও হয়তো ঘটেছে। এ বার আর ঘটল না। এ বার রীতি মেনেই সব হল। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।’’ কিন্তু রীতিনীতির ব্যতিক্রম না-ঘটা কারও ইচ্ছায় বা নির্দেশে হল কি? সে প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই।