(বাঁ দিক থেকে) বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
গত দু’টি কেন্দ্রীয় বাজেটে বিহারের জন্য ‘কল্পতরু’ হয়েছিল নরেন্দ্র মোদী সরকার। যা দেখে অনেকেরই ধারণা হয়েছিল, বিহারে বিধানসভা নির্বাচনের জন্যই অতটা দরাজ হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। সেই সূত্রেই কৌতূহল ছিল, ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গের জন্য কতটা উপুড়হস্ত হবে দিল্লি? রবিবার বাজেট পেশের পরে দেখা গেল, পশ্চিমবাংলার জন্য পরিকাঠামো উন্নয়নে মাত্রই তিনটি প্রকল্প ঘোষণা করেছেন নির্মলা। সংখ্যায় যা বিহারের অর্ধেকেরও কম।
২০২৪ সালে তৃতীয় বার ক্ষমতায় ফেরার পরে জুন মাসে পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করেছিল মোদী সরকার। সেই বাজেটে বিহারের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। সেটা ছিল মহড়া। গত বাজেটে ঢালাও ঘোষণা ছিল বিহারের জন্য। ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ফুড টেকনোলজি’ গড়ে তোলা, পটনা বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ, চারটি নতুন গ্রিনফিল্ড এবং একটি ব্রাউনফিল্ড বিমানবন্দর নির্মাণ, পটনা আইআইটির পড়ুয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য পরিকাঠামো উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। পাশাপাশি, বিহারে মাখনা চাষিদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ বোর্ড গড়ার কথাও ঘোষণা করেছিলেন নির্মলা।
আর পশ্চিমবঙ্গের জন্য? বাজেটে তিনটি প্রস্তাব রেখেছেন নির্মলা। শিলিগুড়ি-বারাণসী দ্রুত গতির রেল চলাচলের করিডর, ডানকুনি-সুরত ফ্রেট করিডর এবং দুর্গাপুরে শিল্প করিডর গড়ে তোলার। এই রাজ্যের ক্ষেত্রে যা যা ঘোষণ করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী, তা পুরোটাই পরিকাঠামো উন্নয়ন খাতে। যার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে কর্মসংস্থানের প্রশ্ন। প্রতিবারই বাজেটে পরিকাঠামো উন্নয়ন খাতে এমন প্রচুর প্রস্তাব থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদি। যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন কলকাতা ও শহরতলির মেট্রো পরিকাঠামো উন্নয়নে নানাবিধ প্রকল্প ঘোষণা করেছিলেন। যার বাস্তবায়ন হয়েছে পরে। আবার নরেন্দ্র মোদী সরকারে আসার পরে প্রথম বাজেটেই জাতীয় সড়কের পরিকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে বিস্তর ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অধুনাপ্রয়াত অরুণ জেটলি। যা বহুলাংশে বাস্তবায়িত হয়েছে।
কেন বিহারের মতো প্রকল্প ঘোষণা হল না ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গের জন্য? আনুষ্ঠানিক কোনও ব্যাখ্যা মেলেনি কেন্দ্রীয় সরকার বা বিজেপির তরফে। মেলার কথাও নয়। তবে একান্ত আলোচনায় কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করছেন অনেকেই।
প্রথমত, শুধু পশ্চিমবঙ্গের কথা ভাবলে কেন্দ্রীয় সরকারের চলত না। কারণ, এই রাজ্যের সঙ্গেই অসম, কেরল, তামিলনাড়ুতেও ভোট রয়েছে। অসমে বিজেপির সরকার থাকলেও বাকি তিনটি রাজ্যই অবিজেপি দল শাসিত। তবে কেরল বা তামিলনাড়ুর সঙ্গে যে পশ্চিমবাংলার তুলনা চলে না, তা-ও মানছেন অনেকে। কারণ, ওই দুই রাজ্যে এখনও পর্যন্ত বিজেপির সরকার গড়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এই রাজ্য দখলের জন্য বিজেপি গত পাঁচ-সাত বছর ধরে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। বাজেটের ২৪ ঘণ্টা আগে পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও।
দ্বিতীয়ত, বিহারের জন্য কেন্দ্রের ঢালাও ঘোষণার সঙ্গে শুধু বিহারের ভোটই নয়। জুড়ে ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের স্থিতিশীলতার প্রশ্নও। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের দল জেডিইউ কেন্দ্রে বিজেপির শরিক। শেষ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তাদের শরিকনির্ভর হয়ে সরকার চালাতে হচ্ছে। সেই সূত্রেই অনেকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ভোট না-থাকা সত্ত্বেও অন্ধ্রপ্রদেশের জন্যও বিপুল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৪ সালের বাজেটে। কারণ, দক্ষিণের ওই রাজ্যটির শাসকদল চন্দ্রবাবু নায়ডুর তেলুগু দেশম পার্টিও মোদী সরকারের অন্যতম ভরসা। যাকে বিরোধীরা কটাক্ষ করে বলেন ‘ক্রাচ’। তবে এই বাজেটে নারকেল, কাজুবাদাম, কোকো ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্প পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে বেশ কিছু প্রস্তাব রেখেছেন নির্মলা। যার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে কেরল, তামিলনাড়ুর অর্থনীতি। নির্মলার বক্তৃতায় নারকেল-অর্থনীতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে রবিবার। যা সাম্প্রতিক অতীতে দেখা যায়নি।
প্রত্যাশিত ভাবেই কেন্দ্রীয় বাজেটকে ‘হাম্পটি ডাম্পটি’ বলে কটাক্ষ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা। রবিবার দুপুরে দিল্লি যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে তিনি বলেন, “এই বাজেট হচ্ছে গার্বেজ অফ লাই (মিথ্যার জঞ্জাল)। গোটা দেশে এখন একটাই কর কাঠামো, জিএসটি। বাংলার থেকে সব টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছে। একটা টাকাও রাজ্যকে দিচ্ছে না। যে টাকার কথা বলা হয়েছে, সব আমাদের টাকা।” পক্ষান্তরে, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘‘কর্মসংস্থান এবং শিল্প ছাড়া এই রাজ্যের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। গত ১৫ বছরে তোলাবাজির জন্য কয়েক হাজার শিল্পসংস্থা রাজ্য ছেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাজেটে পশ্চিমবঙ্গের জন্য ঘোষণাগুলি তাৎপর্যপূর্ণ।’’