মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
মমতার অভিযোগ, সংবিধানের রক্ষাকারীদের দিয়ে এই সব কাজ করানো হচ্ছে। এটা অশুভ লক্ষণ। তাঁর কথায়, ‘‘আপনারা আমাকে যত আঘাত করবেন, আমি তত প্রত্যাঘাত করব।’’ মুখ্যমন্ত্রী জানান, এসআইআরে মৃতদের পরিবারকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। নাম করে জ্ঞানেশ কুমারকে আক্রমণ করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘ধনখড়কে দেখে শিক্ষা হয়নি, আনন্দ বোসকে দেখে শিক্ষা হয়নি, অজিত পওয়ারকে দেখে শিক্ষা হয়নি। এর আগেও অনেকে চলে গিয়েছেন। বেচারা নীতীশ কুমার। ওবিসি মুখ দেখানোর জন্য। ভোটের আগে ১০ হাজার, তার পরে বুলডোজার। তার পরে নীতীশ কুমার বাহার।’’ বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বদল নিয়ে মুখ খুললেন মমতা। নবনিযুক্ত রাজ্যপাল এন রবিকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘ছিপছিপে বাবু, গার্ড অফ অনার নিয়ে নির্বাচনের সময় ডিএম, বিডিও-দের ধমকাবেন। যত রাগ বাংলার উপর।’’ জ্ঞানেশকে নিশানা করে শেষে মমতা বলেন, ‘‘মানুষের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। বিজেপি সরকার চলে গেলে আপনার চেয়ারটাও চলে যাবে।’’
মমতা বলেন, ‘‘কেন্দ্রে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। এজেন্সির ভয় দেখিয়ে, টাকার লোভ দেখিয়ে ক্ষমতায় আছো। কিন্তু যখন এপস্টাইন বেরিয়ে যাবে? রেখে দিয়েছে, নির্বাচনের সময় বার করব।’’
ধর্নামঞ্চ থেকে মমতা বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর আমাদের টার্গেট দিল্লি। ভোটের পর সারা দেশে ঘুরব। আর তোমাদের মুখোশ খুলব।’’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে মমতার প্রশ্ন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে কেন রাজ্যপাল বদল করা হল? শুনেছি তামিলনাড়ুতে সবচেয়ে বেশি গোলমাল করেছে, সেই রাজ্যপালকে বাংলায় পাঠানো হল কেন? কোনও ব্লুপ্রিন্ট আছে?’’
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর অনুযোগের উত্তর দিলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘আজ বিজেপি সংবিধানটা কোথায় নিয়ে গিয়েছে। আমরা বলতে নিজের লজ্জা লাগছে। মাননীয় রাষ্ট্রপতি আমরা তাঁকে সম্মান করি। তাঁকে দিয়েও পলিটিক্স বেচতে পাঠানো হয়েছে। বিজেপির এজেন্ডা পাঠানো হয়েছে। আমি দুঃখিত ম্যাডাম। আপনার প্রতি আমার যথেষ্ট সম্মান আছে। কিন্তু আপনি বিজেপির ট্র্যাপে (ফাঁদে) পড়ে গিয়েছেন।’’ রাষ্ট্রপতির অভিযোগ স্মরণ করিয়ে দিয়ে মমতা বলেন, ‘‘আমরা নাকি কাউকে যেতে দিইনি। এটা তো রাজ্য সরকার পার্টি ছিল না। রাজ্য সরকার তো জানেই না। হ্যাঁ উনি কবে আসবেন, কবে যাবেন সেই তথ্য আমরা পাই। সেই মতো আমরা চেষ্টা করি। কিন্তু প্রতিদিন যদি কেউ না কেউ আসেন, সব সময় আমাদের যেতে হবে? আমাদের কি কাজকর্ম নেই না কি! সারাক্ষণ আপনাদের লেজুড় হয়ে ঘুরতে হবে? বছরে এক বার আসুন, আপনাকে গিয়ে রিসিভ করব। বছরে ৫০ বার আসেন, তবে আমার সময় কি আছে এত।’’
তার পরেই মমতা বলেন, ‘‘আমি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এসআইআর নিয়ে ধর্নায় আছি। আপনার মিটিংয়ে যাব কী করে? কোনটা আমার প্রায়োরিটি? আপনি বিজেপির প্রায়োরিটি। আর আমাদের কাছে প্রায়োরিটি সাধারণ মানুষ। কোন সংগঠন এটা আয়োজন করেছে, সেটা আমি জানি না। আমি কিচ্ছু জানি না। আমি তো ধর্নায় বসে আছি।’’ মমতার প্রশ্ন, ‘‘মণিপুরে যখন আদিবাসীদের উপর অত্যাচার হচ্ছিল, তখন চুপ ছিলেন কেন? তখন কেন প্রতিবাদ করেন না? দেশের অন্য রাজ্যে আদিবাসীদের উপর অত্যাচার হলে চুপ থাকেন। বাংলাকে শুধু নিশানা।’’
মমতা বলেন, ‘‘আমরা এসআইআর নিয়ে লড়াই করছি। ভাববেন না এই লড়াই শুধু যাঁদের নাম কেটেছে তাঁদের জন্য। এক বার ভাবছেন না, এখন যদি আপনার নাম ভোটার তালিকায় থাকে, ভোটের দিন দেখতে পাবেন হয়তো নাম নেই। এটাও একটা প্ল্যান আছে। মনে রাখবেন এর পর আসছে এনআরসি, বঙ্গভঙ্গ।’’
মমতা বলেন, ‘‘আমরা তিনটে প্রজন্ম তৈরি করেছি। আজ নবপ্রজন্ম বেশি বলেছে। অন্য কোনও পার্টিতে তৈরি আছে কি না জানি না। তৃণমূলে আছে। তারা তাদের কাজ আগামী ৫০ বছর করবে।’’
কুণাল বলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কর্মীরা বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছোচ্ছেন।’’ তাঁর কথায়, ‘‘মমতা দি যখন রাস্তায়, যখন তিনি রাস্তায় এই লড়াই না-জিতে তিনি থামবেন না।’’ তৃণমূল মুখপাত্র বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর মেয়াদের সর্বকালীন রেকর্ড ভেঙে দেবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমরা সেই ইতিহাসের সাক্ষী থাকব।’’ কুণালের কথায়, ‘‘বিজেপির দু’টো আত্মা। একটা যদি আরএসএস, অন্যটা সিপিআইএম। ওরা নিজেরা ভোট দিয়ে বিজেপির ভোট বাড়ায়।’’ নাম না-করে হুমায়ুন কবীর এবং মহম্মদ সেলিমকে আক্রমণ করেন কুণাল। তাঁর কথায়, ‘‘ভ্যালেন্টাইনস ডে সপ্তাহ চলছিল, আর সিপিএম নেতারা এ ওর বাড়িতে মন বুঝতে যাচ্ছিলেন।’’
ধর্নামঞ্চে বক্তাদের বক্তৃতার মাঝেই রাজ্যের অর্থ প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানালেন, যুবসাথীর টাকা ঢুকে গিয়েছে। তিনি বলেন, “দিদি সকালে ঘোষণা করেছিলেন আর সন্ধ্যায় প্রকল্পের টাকা দেওয়া শুরু হল।’’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগরকে অপমান করেছে বিজেপি, ধর্নামঞ্চ থেকে আবার আক্রমণ ঋতব্রতর। তিনি বলেন, ‘‘ধর্ম-বর্ণের উপরে উঠে এই লড়াইয়ে মমতার হাত শক্ত করতে হবে।’’
মমতার ধর্নামঞ্চে বক্তা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘‘আসল ভোটারের নাম কেটে দিয়ে পিছন থেকে এনআরসি করার ষড়যন্ত্র চলছে।’’ এসআইআরে মাইক্রো অবজ়ারভারের নিযুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ। তাঁর দাবি, তৃণমূলেরই নন, সিপিএম, নোটার ভোটারদেরও অধিকার রক্ষা করতে ধর্না দিচ্ছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক থেকে।
ধর্নামঞ্চে বক্তৃতা করছেন প্রতীক-উর রহমান। তাঁর বক্তৃতায় উঠে আসে ভারতবর্ষের বৈচিত্রের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের বাসের কথা মনে করিয়ে দেন সিপিএম থেকে তৃণমূলে আসা প্রতীক-উর। তিনি বলেন, ‘‘এটাই আমাদের ভারতবর্ষ। এই ভারতের ঐতিহ্যকে বিজেপি, আরএসএস এবং নির্বাচন কমিশন ভাঙতে চাইছে।’’ তাঁর হুঙ্কার, ‘‘আমরা কাগজ দেখাব না।’’
ধর্মতলার ধর্নামঞ্চে এসেছিলেন শোভন চট্টোপাধ্যায়ও। দিন কয়েক আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন হয়েছিল তাঁর। কলকাতার প্রাক্তন মেয়র আধ ঘণ্টার মতো ধর্নামঞ্চে ছিলেন।
ধর্নামঞ্চে তৃণমূল সাংসদ তথা অভিনেত্রী জুন মালিয়া বলেন, ‘‘এই লড়াই ক্ষমতার লড়াই নয়। এই লড়াই কুর্সির লড়াই নয়। এটা আমাদের সকলের লড়াই। এটা ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই।’’
ধর্নামঞ্চে তৃণমূলের সর্বময়নেত্রীকে কল্যাণের অনুরোধ, ‘‘আর কোনও গদ্দারকে নেবেন না দলে।’’ শ্রীরামপুরের সাংসদের অনুরোধে হাত নে়ড়ে সম্মতি দেন মমতা। তার পরেই কল্যাণ বলেন, ‘‘দিদি বলেছে আর কোনও গদ্দারকে নেবে না। কোনও গদ্দার আসবে না। ২০২৬ সালের নির্বাচনে তৃণমূলে যাঁরা আছেন, তাঁরাই কেবল থাকবেন। আর নতুন প্রজন্ম বা নতুন করে যাঁরা রাজনীতিতে আসতে চান, তাঁদের তাঁরা আসবে। বিজেপির কেউ আসবে না। শুভেন্দু অধিকারী আসতে চাইলে মেরে ভাগাতে হবে।’’
১০-১৫ দিন কেটে গেল, এখনও এসআইআরের বাকি যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ হল না কেন? প্রশ্ন তুললেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ। তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল বিচারবিভাগকে দিয়ে বাকি কাজ শেষ করতে হবে। ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা থেকে বিচারক এনে কাজ করানোর কথাও বলেছে শীর্ষ আদালত। তখনই কল্যাণের ভুল ধরিয়ে দেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল প্রয়োজনে ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা থেকে বিচারক আনতে পারেন।’’ নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করে একের পর এক আক্রমণ শানান কল্যাণ।
গানের পর আবার ধর্নামঞ্চে সভা শুরু হল। প্রথম বক্তা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
ধর্নামঞ্চে চলছে গানবাজনা। ‘পরিবর্তন’ নামে এক গানের দল কয়েকটি গান পরিবেশন করে। গানের মাঝেই সরকারি অনুষ্ঠানে তাদের গানের সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন মমতা। তিনি এ-ও বলেন, ‘‘কাল-পরশুও তোমরা এসো। গান গাইবে। কাল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সেই নিয়ে কোনও গান গাইতে হবে।’’ কী গান গাওয়া যায়, তা-ও পরিকল্পনা করে দেন মমতা নিজেই।