CPIM and Congress Alliance

ফের কি হাত ধরা উচিত, বিতর্ক বাম-কংগ্রেস শিবিরে

রাজ্যে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা এবং বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের আগেই বাম ও কংগ্রেস নেতৃত্বের ‘ইগো’ সরিয়ে ফের আলোচনা শুরু করা উচিত বলে কংগ্রেসের ওই অংশের মত।

সন্দীপন চক্রবর্তী, প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৬ মে ২০২৬ ০৮:৪২
Share:

ভোটাধিকার ফেরানোর দাবিতে ও উচ্ছেদের প্রতিবাদে রামপুরহাটে সিপিএমের সমাবেশ।

পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪টি আসনে একক ভাবে লড়ে কংগ্রেস এ বার জয়ী হয়েছে দু’টি আসনে। সিপিএম ১৯৫টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জয় পেয়েছে একটি আসনে। তাদের সঙ্গী আইএসএফ পেয়েছে একটি আসন। রাজ্যে সরকার বদলের পরেই ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচনে আগের চেয়ে ভোট বাড়িয়ে (১৯.৩৪%) দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে সিপিএম। সরকার পতনের পরে তৃণমূল কংগ্রেস সেখানে নেমে গিয়েছে চতুর্থ স্থানে! পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাজ্যে বিরোধী রাজনীতির পরিসরে জমি শক্তি করতে ফের পরস্পরের হাত ধরা দরকার কি না, সেই প্রশ্নে বিতর্ক দেখা দিয়েছে বাম ও কংগ্রেস শিবিরে।

দুর্বল সংগঠন নিয়ে সব বিধানসভা আসনে প্রার্থী দিয়ে কাজের কাজ যে বিশেষ কিছু হবে না, দিল্লিতে রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খড়্গে-সহ এআইসিসি শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে সেই সওয়াল করেছিলেন প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী। দলের বাকিরা ছিলেন একা লড়ারই পক্ষে। শেষ পর্যন্ত একা লড়ে কংগ্রেস পেয়েছে ২.৯৭% ভোট। পরে ফলতায় কংগ্রেস পেয়েছে ৪.৮% ভোট। পক্ষান্তরে, তৃণমূলের প্রভাব কমে যাওয়ার সুযোগে সিপিএমের প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মি অনেকটাই লাভ ঘরে তুলতে পেরেছেন। এর পরেই জোট-প্রশ্নে নতুন করে ভাবনার দাবি জোরালো হয়েছে কংগ্রেসের অন্দরে। বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন, এমন একাধিক নেতারই মত, একা লড়ে রাজ্যের সর্বত্র কংগ্রেসের অস্তিত্ব টের পাওয়ানোর রাজনৈতিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ভোট শুধু রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার লড়াই নয়, জয়-পরাজয় সেখানে বড় প্রশ্ন। উত্তর দিনাজপুর, মালদহ ও মুর্শিদাবাদ বাদে অন্যত্র একা লড়ে ৩-৪% ভোট পাওয়ার চেয়ে বামেদের সঙ্গে সমঝোতা পুনর্নির্মাণ করে বিজেপির বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প’ গড়ে তোলাই শ্রেয়। রাজ্যে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা এবং বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের আগেই বাম ও কংগ্রেস নেতৃত্বের ‘ইগো’ সরিয়ে ফের আলোচনা শুরু করা উচিত বলে কংগ্রেসের ওই অংশের মত।

এই প্রশ্নে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার অবশ্য বলছেন, ‘‘একা লড়ার সিদ্ধান্ত কারও একার ছিল না। দলের সর্বস্তরে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এখন নতুন করে কিছু করতে গেলে দলের মধ্যেই উপযুক্ত মঞ্চে আলোচনা করতে হবে। তবে যাঁরা এখন ফের জোটের কথা তুলছেন, ২০২১ সালের বিধানসভায় জোট করেও কেন শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর তাঁদের দিতে হবে!’’ ফলতার পুনর্নির্বাচনে সিপিএমের ‘ভাল ফল’কেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ প্রদেশ সভাপতি। তাঁর মতে, বিজেপি যেমন ধর্মীয় বিভাজনের ফলে একাংশের ভোট পেয়েছে, তেমনই অন্য একাংশের (অর্থাৎ মুসলিম) ভোট আর এক দিকে গিয়েছে। শুভঙ্করের দাবি, ‘‘আমাদের প্রার্থী যে ১০ হাজার ভোট পেয়েছেন, সেটাই প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ ভোট।’’ সংখ্যালঘু প্রার্থী থেকেও কংগ্রেস মুসলিম ভোট তেমন পেল না, অথচ সিপিএম সংখ্যালঘু প্রার্থী না-দিয়েও সংখ্যালঘু সমর্থন বেশি পেল— এতে কার ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সেই প্রশ্ন অবশ্য ঘুরছে কংগ্রেস শিবিরেই।

কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর অবশ্য স্পষ্টই বলছেন, ‘‘বামেদের সঙ্গে ভয়ঙ্কর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক লড়াই অতীতে করে এসেছি। তার পরেও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে বামেদের সঙ্গে জোট করেছি, তার ফলে ২০১৬ সালে কংগ্রেস প্রধান বিরোধী দল হয়েছে। তৃণমূলের সরকার বাঁচাতে আরএসএস-বিজেপি সে বার তাদের ভোট দিয়ে সাহায্য করেছিল, ফলাফলেই সেটা বোঝা গিয়েছিল। সিপিএমের সিদ্ধান্তে মাঝে জোট ভেঙেছিল। রাজ্যে ২০২১ সালে মেরুকরণের ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে জোট করেই কংগ্রেস লোকসভায় একটি আসন পেয়েছে, বেশ কিছু আসনে ভাল লড়াই হয়েছে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘তৃণমূলকে হারানোর লক্ষ্যে এ বারের বিধানসভায় মানুষ ভোট দিয়েছেন। বিজেপির সরকার আসার পরে উল্টো দিকে বাম ও কংগ্রেসের দিকে আগের চেয়ে বেশি মানুষ আসবেন। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে অবিলম্বে বামেদের সঙ্গে সমঝোতা প্রয়োজন। আমাদের ওজনের চেয়ে ভোজন বেশি হয়ে গেলে মুশকিল!’’ মালদহ ও মুর্শিদাবাদে বাম-কংগ্রেস ভোট কাটাকাটির জেরে কিছু আসন যে দু’দল জিততে পারেনি, সে কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন অধীর-সহ একাধিক নেতা।

শুধু ‘সংখ্যালঘু-নির্ভরতা’ থেকে বেরিয়ে বিরোধী হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কংগ্রেসের সঙ্গ যে প্রয়োজন, তা অস্বীকার করছেন না সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্বের বড় অংশও। তবে দলের নিচু তলা কংগ্রেস এক বার হাত ছেড়ে যাওয়ার পরে এখন একা চলারই পক্ষে। এমতাবস্থায় দিল্লিতে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের পরে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি বলেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে আমরা নিজেদের সংগঠিত করতে পেরেছি। ফলতার ফল বলছে, বামেদের উত্থান হচ্ছে। আমরা আশা করব, এই ধারা অব্যহত থাকবে।’’ একই সঙ্গে সিপিএম সূত্রের বক্তব্য, এখনও অনেক কাজ বাকি। সংগঠনকে অনেক মজবুত করতে হবে। দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে। রাজ্যের সামগ্রিক নির্বাচনী পর্যালোচনা শেষ হলে জুলাইয়ের শেষে ফের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক বসবে। কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-বিজেপির প্রথম জয় গোটা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক শক্তির জন্য উদ্বেগের কারণ। বেবির মতে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় এক জন হলেও সিপিএম বিধায়কের উপস্থিতি ‘ইতিবাচক’। তবে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তৃণমূলের তরফে বামেদের উদ্দেশে একজোট হওয়ার যে আহ্বান এসেছে, সেই প্রশ্নে বেবির বক্তব্য, ‘‘সময়ই এখনও আসেনি। তৃণমূল এখনও যে আচরণ করছে, তাতে এই বিষয়ে বিবেচনা করারই প্রশ্ন নেই!’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন