সতর্ক: লকডাউন ভেঙে যাতায়াত ঠেকাতে রাস্তায় বেড়া দিয়েছেন এলাকাবাসী। নানুরের একটি এলাকায়। ছবি: কল্যাণ আচার্য
করোনা-পজিটিভ বাবার সংস্পর্শে কাটানো মেয়ে এক বেলার জন্য বীরভূমে শ্বশুরবাড়িতে ফিরেছিলেন। তাতেই ঘুম ছুটেছে জেলা প্রশাসনের। ওই যুবতীর সংস্পর্শে আসা ১৫ জনকে নন-হোম কোয়রান্টিন বা নিভৃতবাসে পাঠানো হল। তাঁদের মধ্যে ওই বধূর শ্বশুরবাড়িরই ১১ জন সদস্য!
শনিবার নানুর থানা এলাকার একটি গ্রামের ঘটনা। তার জেরে ওই গ্রাম এবং সংলগ্ন বেশ কিছু গ্রামে আলোড়ন পড়েছে। রাস্তার মুখে বেড়া দিয়ে একাধিক গ্রাম বন্ধ করে দিয়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা। এই প্রথম কোনও করোনা-পজিটিভ রোগীর সংস্পর্শে থাকা কেউ বীরভূমের গ্রাম ঘুরে গিয়েছেন জেনে চিন্তায় এখনও ‘গ্রিন জ়োন’-এ থাকা বীরভূম জেলা প্রশাসন। কারণ, এ ভাবেই রাজ্যের অন্যত্র সংক্রমণ ছড়িয়েছে।
বীরভূমের জেলাশাসক মৌমিতা গোদারা বসু শনিবার বলেন, ‘‘যাঁরা সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁদের নিশ্চয় পরীক্ষা করানো হবে। সেই রিপোর্ট হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় আছি। যেহেতু ওই বধূ করোনা-পজিটিভ রোগীর সংস্পর্শে ছিলেন, সাবধানতা হিসেবে তিনি আরও কার কার সংস্পর্শে এসেছেন, তা চিহ্নিত করে তাঁদের কোয়রান্টিনে রাখা হয়েছে। নিয়মিত তাঁদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা হবে। চিন্তার কিছু নেই।’’
করোনা-জাল
• ৩১ মার্চ: মুর্শিদাবাদের সালার থেকে কলকাতার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যান ক্যনসার আক্রান্ত বৃদ্ধ।
• ১৪ এপ্রিল: ঠাকুরপুকুর ক্যানসার হাসপাতালে ভর্তি হন ওই বৃদ্ধ। সঙ্গে ছিলেন তাঁর মেয়ে, জামাই।
• ১৫ এপ্রিল: এক বেলার জন্য নানুরে আসেন বৃদ্ধের মেয়ে জামাই। ওই দিনই আবার ফেরেন সালারে।
• ১৭ এপ্রিল: সালারে ওই বৃদ্ধের পরিবারের ১৩ জনকে নিভৃতবাস কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।
• ১৮ এপ্রিল: নানুরে ওই বৃদ্ধের মেয়ের শ্বশুরবাড়ির ১১ জন, যে টোটোয় করে ওই দম্পতি গ্রামে আসেন সেই টোটোচালক-সহ মোট ১৫ জনকে নিভৃতবাস কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মুর্শিদাবাদের সালার ব্লকের একটি গ্রামের মধ্য-সত্তরের এক ক্যানসার আক্রান্ত বৃদ্ধের রক্ত ও লালারস পরীক্ষার পরে কোভিড-১৯’এর সংক্রমণ স্পষ্ট হয় বৃহস্পতিবার রাতে। শুক্রবার কলকাতার এমআর বাঙুর হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করানো হয়েছে। ওই বৃদ্ধেরই এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে নানুরের ওই গ্রামে। জেলার প্রথম কেউ করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবরে উদ্বেগ বেড়েছে পড়শি জেলা মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসনেরও।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই বৃদ্ধ ১৪ এপ্রিল ঠাকুরপুকুর ক্যানসার হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হন। পরদিন তাঁর করোনা ধরা পড়ে। বাবা অসুস্থ জেনে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে দিন পনেরো আগেই সালারে বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন নানুরের ওই বধূ। ১৪ তারিখ ওই দম্পতি বাবার সঙ্গে ঠাকুরপুকুরেই ছিলেন। ১৫ এপ্রিল সকালে এক বেলার জন্য কিছু জিনিস পত্র নিতে শ্বশুরবাড়িতে এসেছিলেন ওই বধূ। তার পরে সালারে ফিরে যান। এর পরেই ওই বৃদ্ধের করোনা সংক্রমণের খবর পেয়ে শুক্রবার দুপুরে মুর্শিদাবাদ প্রশাসনের তরফে ওই বৃদ্ধের পরিবারের ছয় শিশু, পাঁচ মহিলা-সহ মোট ১৩ জনকে সরকারি কোয়রান্টিন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই তালিকায় বৃদ্ধের মেয়েও আছেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানুরের ওই গ্রামগুলিতে হইচই পড়ে যায়। তৎপর হয় বীরভূম প্রশাসনও। শনিবার সকালে ওই বধূর শ্বশুরবাড়ির ১১ জন এবং যে টোটোয় চড়ে ওই বধূ গ্রামে এসেছিলেন, সেই টোটোচালক-সহ আরও চার জনকে নানুরের কোয়রেন্টিন সেন্টারে রাখা হয় প্রশাসনের তরফে।
বীরভূম স্বাস্থ্য জেলার সিএমওএইচ হিমাদ্রি আড়ি বলেন, ‘‘মুর্শিদাবাদের সিএমওএইচের সঙ্গে কথা হয়েছে। ওই বধূ সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন। উপসর্গ দেখা গেলেই তাঁর লালারস পরীক্ষা করানো হবে। তবে ওই বধূ যদি সংক্রামিত না হন, তাহলে বীরভূমে ভয়ের কিছু নেই। হলে অবশ্যই চিন্তার। সে জন্যই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হয়েছে। নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে মুর্শিদাবাদের স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে।’’
নানুরের যে গ্রামের ঘটনা, সেটি তো বটেই, আশপাশের গ্রামগুলিতেও আতঙ্কে বাসিন্দারা। তাঁরা বিভিন্ন গ্রামের রাস্তা বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে গ্রামে প্রবেশ নিষেধের নোটিস ঝুলিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই এ দিন বললেন, ‘‘মনে হচ্ছে ঘরের দোরগোড়ায় বিপদ কড়া নাড়তে শুরু করে দিয়েছে।’’