দেনা শুধতে ফের দেনাই ভরসা

আশা করা গিয়েছিল, রাজ্য বাজেটে ঋণের বোঝা লাঘবের পথ খুঁজবেন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র। বাস্তবে ঋণ মেটাতে আরও ঋণের নীতি গ্রহণের ইঙ্গিতই দিয়ে রাখলেন তিনি।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৫ জুন ২০১৬ ০৯:৩২
Share:

আশা করা গিয়েছিল, রাজ্য বাজেটে ঋণের বোঝা লাঘবের পথ খুঁজবেন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র। বাস্তবে ঋণ মেটাতে আরও ঋণের নীতি গ্রহণের ইঙ্গিতই দিয়ে রাখলেন তিনি।

Advertisement

বৃহস্পতিবারই বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, ঋণের ফাঁদ এখন মৃত্যুফাঁদ। নিষ্কৃতির উপায় কী, শুক্রবার বাজেটে তার কোনও দিশা দেখালেন না অর্থমন্ত্রী। প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথ স্পষ্ট নয়। উল্টে বিপুল ঋণ পরিশোধ ও পে-কমিশনের আসন্ন চাপ মোকাবিলায় ফের বাজারি ঋণেই ভরসা রেখেছেন তিনি।

পরিণামে ঋণের ফাঁসে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে প্রশাসনের অন্দরে। কেন?

Advertisement

অর্থ-সূত্রের ব্যাখ্যা, ২০১৬-’১৭ অর্থবর্ষে ১ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি টাকার খরচ ধরা হয়েছে। ৫৮ হাজার কোটি যোজনা খাতে, যোজনা বর্হিভূত খাতে ১ লক্ষ কোটির বেশি। নিজস্ব কর থেকে ৫১ হাজার কোটি তোলার লক্ষ্যমাত্রা। বাকি ৭৫ হাজার কোটি কেন্দ্রীয় করের প্রাপ্য অংশ এবং কেন্দ্রীয় অনুদান থেকে। এ বারের বাজেটে বস্তুত বিশাল অঙ্কের বরাদ্দের সিংহভাগই আসবে দিল্লি থেকে। তার বহর কমলে বা নিজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে না-পারলে সমূহ বিপদ। তখন বাজার থেকে ধার করা ছাড়া উপায় থাকবে না।

সেই মতো চলতি বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বাজারি ঋণ গ্রহণের কথা আগাম ঘোষণাও করেছেন অর্থমন্ত্রী। খাদ্যসাথীর মতো প্রকল্পের স্বার্থে ভর্তুকি বেড়ে হচ্ছে প্রায় সাত হাজার কোটি। এ প্রসঙ্গে আক্রমণাত্মক অমিতবাবু দায় চাপিয়েছেন পূর্বসূরিদের ঘাড়ে। তাঁর কথায়, ‘‘২০০৬-০৭ থেকে বাম সরকার যে বিপুল ধার করেছে, এখন তা শুধতে হচ্ছে। এ তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা দেনা নয়। বাম সরকারের দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের খেসারত।’’ তা হলে উপায়?

অমিতবাবুর দাবি, কেন্দ্রই পারে রাজ্যকে ঋণের দায় থেকে মুক্তি দিতে। ‘‘বাম সরকার যখন বাজেট নিয়ন্ত্রণ আইন না-মেনে যথেচ্ছ ঋণ নিয়েছে, তখন কেন্দ্র আটকায়নি। এখন দায় আমরা নেব কেন?’’— প্রশ্ন তাঁর। এবং কটাক্ষ, ‘‘নরেন্দ্র মোদী যদি গ্রিসের পুনর্গঠনে ঋণ দিতে পারেন, তা হলে পশ্চিমবঙ্গের ঋণ কেন মকুব করবেন না?’’

প্রসঙ্গত, দিল্লিতে চাপ বাড়াতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যে ঋণগ্রস্ত রাজ্যগুলোকে নিয়ে কলকাতায় সম্মেলনের ডাক দিয়েছেন। চাপে ফল না হলে ধার করে যাওয়াই ভবিতব্য। চাইলেই কি বাজারের ঋণ যত খুশি মিলবে?

নবান্নের এক শীর্ষ কর্তা জানান, পরিকাঠামো উন্নয়ন ও সামাজিক ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়ছে। কর আদায় বেড়েছে। এতে রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (এসজিডিপি) বেড়েছে। যার সুবাদে ঋণ নেওয়ার ক্ষমতাও বাড়বে। কিন্তু রাজস্ব বাড়াতে মন্ত্রী ভ্যাটের হার বাড়ানোর রাস্তায় গেলেন না কেন?

অর্থমন্ত্রীর জবাব, ‘‘১% কর বাড়িয়ে বড়জোর পাঁচশো কোটি টাকা আয় বাড়ানো যেত। বরং কর ব্যবস্থা সরল করে আরও বেশি ব্যবসায়ীকে আওতায় আনলে সুফল মিলবে।’’

বিরোধীপক্ষ অবশ্য সমালোচনায় মুখর। ‘‘অর্থমন্ত্রী এত রকম দাবি করছেন! অথচ রাজস্ব আদায় যা হয়েছে, তা পেট্রোল-ডিজেলে কর আর আবগারি থেকে। রাজ্যের মানুষকে মদ খাওয়ায় উৎসাহ দিয়ে আয় বেড়েছে!’’— মন্তব্য বিরোধী দলনেতা আব্দুল মান্নানের। বাম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তীর প্রশ্ন, ‘‘ধার করেই ধার শোধ করব, এটা কোনও নীতি হতে পারে?’’ বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষও মনে করেন, নিজস্ব আয় বাড়ানোর কোনও দিশা অর্থমন্ত্রী দেখাতে পারেননি।

বাজেটে নেই পে কমিশন

ষষ্ঠ বেতন কমিশনের সুপারিশ কবে জমা পড়বে এবং সেই সুপারিশ অনুযায়ী রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বেতন কবে বাড়বে, উত্তর মিলল না রাজ্য বাজেটে। বরং বেতন-পেনশন খাতে অর্থমন্ত্রী যে স্বল্প পরিমাণ টাকা বরাদ্দ করেছেন, তাতে ২০১৬-১৭ আর্থিক বছরে অন্তত বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করছেন প্রশাসনিক কর্তাদের একাংশ। বাজেট বরাদ্দে ২০১৬-১৭ সালে বেতন খাতে ৩৬ হাজার ১৯০ কোটি টাকা ধরেছে রাজ্য সরকার। যা গত আর্থিক বছরের তুলনায় মাত্র ৭% বেশি। পেনশন খাতে রাজ্যের বরাদ্দ ১৪ হাজার ৪১৬ কোটি। যা গত আর্থিক বছরের তুলনায় ৪% বেশি। ফলে নতুন বেতন কমিশন গঠিত হলেও তার সুফল দ্রুত মিলবে, এমন আশা করতে পারছেন না কর্মচারীরা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement