আদি বাড়ি কাটোয়া। কিন্তু আসলে আমার বাস ছিল দক্ষিণবঙ্গে চরাচরে।
বীরভূমের সিউড়িতে জন্ম। ফুটবলে পায়ে খড়ি ঝাড়গ্রামে। খড়্গপুর থেকে ফুটবল খেলতে সোজা পৌঁছে যাই অধুনা মুম্বইয়ে।
ঝাড়গ্রামের কুমুদকুমারী ইনস্টিটিউশনের মাঠে এক সময়ে যে সিনিয়র দাদাদের জন্য বুট পৌঁছে দিয়েছি, সেই দাদারা, স্কুলের শিক্ষকরা বা নয়াগ্রাম রাজবাড়ির সেই পড়শিরা হয়তো জানেন না, আমি সেই প্রদীপ— যে পরে মোহনবাগান থেকে ভারতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হয়েছিল, যাঁর খেলা দেখে ফুটবল সম্রাট পেলে প্রশংসা করেছিলেন। সেই পড়শিদের এখনও হাতড়ে বেড়াই আমি।
আমার কলকাতার রিজেন্ট পার্কের ফ্ল্যাটে এখনও অনেক পড়শির যাতায়াত আছে। অনেকের সঙ্গে যোগযোগ রয়েছে। কাটোয়ার সঞ্জয় রায়, ঝাড়গ্রামের কুমুদকুমারী ইনস্টিটিউশনের আশিস মহাপাত্র থেকে খড়্গপুরের বাসিন্দা, বিশিষ্ট ফুটবলার সুবীর মুখোপাধ্যায়। তেমনই আবার খুঁজে দেখার চেষ্ট করি ঝাড়গ্রামের বিকাশ সুকুলকে, নয়াগ্রাম রাজবাড়ির ভিতরে থাকা পড়শিদের। যাঁদের সঙ্গে মেদিনীপুর কলেজের মাঠে খড়্গপুর স্কুলের হয়ে মাঠ কাঁপাতাম সেই স্বপন, বিট্টুদের দেখার জন্য মন ছটফট করে এখনও।
বাবা ব্রজগোপাল চৌধুরী ছিলেন সরকারি আমলা। সেই সূত্রে কখনও বীরভূমে তো কখনও মেদিনীপুরে থেকেছি। বাবার সব সময়ের সঙ্গী ছিল রাইফেল। আমি তখন খুব ছোট। কিন্তু ঘটনা খুব স্পষ্ট। বীরভূমে যে জায়গায় থাকতাম, সেখানে আমাদের পড়শি হয়ে উঠেছিল বেশ কয়েকটা বাঘ। বাঘের আওয়াজে আমাদের অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা এক দিন বাবাকে ঘেরাও করে অভিযোগ করলেন, বাঘের জ্বালায় তাঁদের জীবন যায়-যায়। কিছু একটা না করলে গ্রাম ছাড়তে হবে! হঠাৎ এক দিন দেখি, বাবা জিপের বনেটে একটা বাঘ চাপিয়ে নিয়ে এসেছেন। বাবা ওই দিন এক সঙ্গে পাঁচটি বাঘ মেরেছিলেন। তার মধ্যে একটি বাংলোয় নিয়ে এসেছিলেন। মরা বাঘ দেখেও আমি ভয়ে মায়ের কাপড় ধরে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু আমার মেজদা ছিল খুব ডানপিটে। সে এক লাফে বনেটে থাকা বাঘের উপর চেপে উঠেছিলেন।
বীরভূম থেকে গেলাম নয়াগ্রামে বেলাবেরিয়া। রাজবাড়ির পাশেই আমাদের বাংলো। রাজবাড়িই ছিল আমাদের খেলার জায়গা। প্রহরাজ রাজবাড়িতে আমাদের বয়সী অনেক ছেলেমেয়ে ছিল। তাঁদের সঙ্গে থাকতে-থাকতে শিখে গিয়েছিলাম ওড়িয়া ভাষা। মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময়েও সেই ভাষায় কথা বলতাম। রাজবাড়ি যেতে ইচ্ছে করলে আঙুল দেখিয়ে বলতাম, ‘সেপাকু জীবো’। বাংলায় যার মানে, ওই দিকে যাব। সে জন্য মায়ের কাছে বকুনি-পিটুনিও খেয়েছি। রাজবাড়ির কাছেই ছিল ডুলুং নদী। এক বার কী হল, রাজ পরিবারের সদস্যেরা, আমার দুই দাদা ও আমি ওই নদীর ধারে বেড়াতে গেলাম। সেখানে নৌকা বাঁধা ছিল। তাতে চাপতেই নৌকার দড়ি কী ভাবে খুলে গেল। নৌকা ভাসতে ভাসতে চলে গেল মাঝ নদীতে। ভয়ে আমার কী অবস্থা হয়েছিল, বলে বোঝানো সম্ভব নয়। শেষে উল্টো দিক থেকে কয়েক জন সাঁতরে এসে আমাদের নৌকা টেনে তীরে পৌঁছে দেয়। রাজ পরিবারের সদস্যদের মতো ওই পড়শিরাও আমার কাছে অপরিচিত হয়েই রয়ে গেল।
চলে এলাম ঝাড়গ্রাম। পড়শি হয়ে উঠল শাল গাছ, নাম না জানা অনেক পাখি। এক সন্ধ্যায় বাবা ও আর্দালি তিওয়ারিদা সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। রাস্তায় দেখতে পেলেন দু’টি খুদে বাঘকে। বাড়িতে নিয়ে এলেন। বাড়িতেই পোষার জন্য বায়না করেছিলাম। বাবা-মা শোনেনি। কোথায় যেন দিয়ে এল! রাগে-দুঃখে পনেরো দিন কথা বলিনি।
খড়্গপুর থাকার সময়ে খেলা দেখে নারুদার মনে ধরে আমাকে ও সুবীরকে। নারুদা তখন মুম্বইয়ে কী একটা ওষুধ কোম্পানিতে কাজ করে। যাঁরা কলকাতার মাঠে খেলার সুযোগ পেত না, তাঁরা মুম্বইয়ের বিভিন্ন কোম্পানিতে খেলতে যেত। নারুদা মুম্বইয়ে নিয়ে গিয়ে ট্রায়ালের ব্যবস্থা করে। আমি মফতলালে খেলার সুযোগ পাই। পরের বছর ভারতীয় দলে। টাটা হয়ে মোহনবাগানে।
যেখানে থাকি, সেখানে ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক বেশি। বড় ম্যাচ থাকলেই আমার পড়শি অর্চি-মনসিজ ঠাকুরেরা পুজোর ফুল ও প্রসাদ নিয়ে এসে মাথায় ঠেকিয়ে দিত। আমার হয়ে চিৎকার করত। আমি আসার পরে ওই এলাকায় মোহনবাগানেরও পতাকা উড়তে শুরু করে। বছরের পর বছর কেটে গিয়েছে। অপরিচিতই থেকে যাওয়া পড়শিদের দেখতে খুব ইচ্ছে করে এখনও।