ঘোষণার পরে সপ্তাহ ঘুরতে চললেও সরকারি সহায়ক মূল্যে আলু কেনা সে ভাবে শুরু হয়নি। দরজা বন্ধ করতে শুরু করেছে হিমঘরও। এই পরিস্থিতিতে বিক্ষোভ চলছেই জেলায়-জেলায়। আলু চাষে এমন বিপর্যয়ের জেরে আরও দু’জনের আত্মঘাতী হওয়ার অভিযোগ উঠল রাজ্যে।
মঙ্গলবার বর্ধমানের গলসির এক চাষি ও বাঁকুড়ার কোতুলপুরের এক চাষির স্ত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। দুই পরিবারেরই দাবি, আলুর দাম না মেলা ও ঋণ শোধের জন্য মহাজনের তাগাদা এই ফাঁসে পড়ে আত্মঘাতী হয়েছেন দু’জন।
কৃষকসভার বর্ধমান জেলা সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক মণ্ডলের ক্ষোভ, “এ পর্যন্ত ৯ জন চাষি আত্মঘাতী হয়েছেন। তাতেও প্রশাসনের টনক নড়েনি।” বর্ধমানের জেলা সভাধিপতি দেবু টুডু বলেন, “সরকার উপযুক্ত পদক্ষেপ করছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।”
গলসির সাঁকো পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা গণেশ সরেন (২৫) গত ১২ মার্চ কীটনাশক খেয়ে অসুস্থ হলে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। মঙ্গলবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর দাদা ছোট্টু সরেন দাবি করেন, “ভাই পাঁচ বিঘে জমিতে ভাগচাষ করেছিল। তাতেও মহাজনের কাছে অনেক টাকা ধার করতে হয়। প্রথমে নাবিধসায় আলুর খারাপ ফলন, পরে আবার দামও না মেলায় হতাশায় ভুগছিল। দেনা শোধ করার চাপেই কীটনাশক খেয়েছে ভাই।”
কোতুলপুরের বাসিন্দা মঙ্গলা রায়কে (৪০) সোমবার রাতে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে আনা হয়। সকালে মৃত্যু হয় তাঁর। মঙ্গলাদেবীর স্বামী, আলুচাষি মহাদেব রায় বলেন, “নিজের ও ভাগচাষের মোট ছ’বিঘে জমিতে পোখরাজ আলু চাষ করেছিলাম। মহাজনের কাছে বেশ কয়েক হাজার টাকা ধার হয়। ইচ্ছে ছিল আলু বেচে শোধ করব। কিন্তু আলুর বস্তার দাম ৭০ টাকায় নেমে যাওয়ায় মাঠেই আলু পড়ে রয়েছে।” তিনি দাবি করেন, “এ নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে অশান্তি হচ্ছিল। সোমবারও ঝামেলা হয়। তার পরেই ও গায়ে আগুন দেয়।” তাঁর আত্মীয়, আলুচাষি কার্তিক দাস ও সুভাষ দাসেরা অভিযোগ করেন, সরকারি ব্যবস্থায় জেলায় আলু কেনা শুরু না হওয়ায় বিপদ আরও বাড়ছে।
গত কয়েক দিনে আলু চাষে বিপর্যয়ের জন্য বর্ধমান, হুগলিতে বেশ কয়েক জন চাষির আত্মঘাতী হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আগের ঘটনাগুলির মতো এ দিনও পুলিশের দাবি, গলসি ও কোতুলপুরে আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনা ঘটেছে পারিবারিক বিবাদের জেরেই। এর সঙ্গে আলু চাষে বিপর্যয়ের কোনও সম্পর্ক নেই।
সহায়ক মূল্যে আলু কেনা এবং কৃষি ঋণ মকুবের দাবিতে এ দিন ধূপগুড়ি-গয়েরকাটা ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন কিছু চাষি। ঘণ্টা তিনেক রাস্তায় আলু ফেলে বিক্ষোভ চলে। অবরোধ চলাকালীনই জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসনের কর্তারা সহায়ক মূল্যে আলু কেনার সিদ্ধান্ত নেন। সহায়ক মূল্য বাড়ানো ও সব চাষির কাছ থেকে আলু কেনার দাবিতে পশ্চিম মেদিনীপুরের রামজীবনপুরে আরামবাগ-ক্ষীরপাই রাস্তা অবরোধ হয়। বিক্ষোভ হয় কালনাতেও। সোমবার হুগলির দাদপুরে আলু রাখতে না পেরে ক্ষুব্ধ চাষিরা একটি হিমঘরের গেট ভেঙে কয়েক হাজার বস্তা আলু রেখে যান। মঙ্গলবার পুলিশের উপস্থিতিতি আলু রাখা শুরু হয়।