সিডলি আগ্নেয়গিরির শীর্ষে শুভম চট্টোপাধ্যায়। নিজস্ব চিত্র ।
রক্ত জমে যাওয়ার মতো ঠান্ডা। খারাপ আবহাওয়ায় হোয়াইট আউটের জেরে সামনের কোনও কিছুই ঠাহর করা ভার। সেই সঙ্গে প্রবল ঠান্ডায় মাথাচাড়া দিয়েছে পুরনো সাইটিকার ব্যথা। এই সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে মাত্র ২৫ দিনে দুর্গমতম আন্টার্কটিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার তিনটি শৃঙ্গে সফল আরোহণ করে ফিরেছেন হিন্দমোটরের বাসিন্দা, বছর তিরিশের শুভম চট্টোপাধ্যায়। গত ৭ জানুয়ারি থেকে ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আন্টার্কটিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ভিনসন ম্যাসিফ (৪৮৯২ মিটার) ও সর্বোচ্চ আগ্নেয়গিরি সিডলি (৪২৮৫ মিটার) এবং দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ অ্যাকঙ্কাগুয়ার (৬৯৬১ মিটার) শীর্ষে পৌঁছেছেন এই পর্বতারোহী। সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসাবে সাত মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ও সর্বোচ্চ আগ্নেয়গিরি ছোঁয়ার লক্ষ্য থেকে আর মাত্র তিন কদম দূরে এই যুবক। এখনও পর্যন্ত এই রেকর্ড রয়েছে আর এক বাঙালি পর্বতারোহী সত্যরূপ সিদ্ধান্তের ঝুলিতে।
গত ২৫ ডিসেম্বর আন্টার্কটিকার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন শুভম। বিমানে দক্ষিণতম মহাদেশের ইউনিয়ম হিমবাহে নেমেই বুঝতে পারেন, প্রথম থেকেই খারাপ আবহাওয়ার মোকাবিলা করতে হবে। সেই সঙ্গে ইউক্রেনীয় ও রুশ অভিযাত্রী দলের মধ্যে যোগাযোগের দায়িত্বও সামলাতে হয়েছে তাঁকে। এর পরে মাইনাস ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ঠেলে ৭ জানুয়ারি ভিনসন শৃঙ্গ ছুঁয়ে নামেন যখন, তত ক্ষণে গাল-নাকের চামড়া উঠতে শুরু করেছে। শুভম বলছেন, ‘‘নেমে এসে শুনি, সিডলি আগ্নেয়গিরিতে তাপমাত্রা নেমেছে মাইনাস ৭০ ডিগ্রিতে। তাতে রক্ত পর্যন্ত জমে যেতে পারে। ফলে, অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। কিছু দিন পরে সিডলি বেস ক্যাম্পে যখন পৌঁছই, তখনও এতটাই ঠান্ডা যে, পুরনো সাইটিকার ব্যথাটা আবার শুরু হয়ে গেল। ফ্লাস্কের চা থেকে হাতে থাকা ক্রিম— সবই জমে যাচ্ছে। তবু মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রওনা দিই সিডলির শীর্ষের দিকে।’’
কতটা কঠিন ছিল সেই যাত্রা? শুভম জানাচ্ছেন, ‘সামিট পুশ’-এর সময়ে হোয়াইট আউটের ফলে রাস্তা হারিয়ে ফেলেন তাঁদের গাইড। ফলে, পর পর চারটি ছোট শৃঙ্গ পেরিয়ে, অনেকটা বেশি পথ হেঁটে তবে আসল সামিটে পৌঁছন তাঁরা। তখন সেখানে তাপমাত্রা মাইনাস ৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁইছুঁই। ফেরার সময়ে দেখেন, ঠান্ডায় তাঁর রোদচশমার উপরে পুরু বরফ জমেছে। হাতে ধরে থাকা লাল দড়িটুকু ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। অথচ, চার দিকে হাঁ করে রয়েছে ক্রিভাস। শুভমের কথায়, ‘‘আমার পর্বতারোহণ অভিজ্ঞতায় আবহাওয়ার দিক থেকে কঠিনতম হল সিডলি। ওই প্রতিকূল সময়ে চার বার ভুল শৃঙ্গে ওঠা যে কতটা মানসিক আতঙ্ক তৈরি করতে পারে, তা কখনও ভুলব না। তবে বিশ্বের ১১০তম ব্যক্তি ও তৃতীয় ভারতীয় হিসাবে সিডলি ছোঁয়ার মুহূর্তটাও (২০ জানুয়ারি) চিরস্মরণীয়।’’
অভিযান এখানেই শেষ হয়। আন্টার্কটিকা থেকে চিলি ছুঁয়ে আর্জেন্টিনা পৌঁছেই জানতে পারেন, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ‘সামিট উইন্ডো’ রয়েছে অ্যাকঙ্কাগুয়ায়। ফলে সঙ্গে সঙ্গে হেলিকপ্টার নিয়ে বেস ক্যাম্প পৌঁছেই আরোহণ শুরু। ১ ফেব্রুয়ারি সেই শীর্ষ ছুঁয়ে নামার সময়ে সমস্যায় পড়েন সদলবল। ‘‘নামার সময়ে দলের সকলেই নিস্তেজ হয়ে পড়েন। অনেকে তো হ্যালুসিনেট করতেও শুরু করেন। কেউ গাড়ি দেখছেন, কেউ গাছগাছালি দেখছেন, কারও পায়ে ফোস্কা। কোনও রকমে ১১ ঘণ্টায় নেমে আসি।’’— বলছেন শুভম।
পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত শুভমের পাহাড়-প্রেমের হাতেখড়ি দশম শ্রেণিতে। বলছেন, ‘‘দেশ-বিদেশ ঘুরে পাহাড় চড়ব, এই ভাবনা থেকেই সপ্তশৃঙ্গ ও সপ্ত আগ্নেয়গিরির স্বপ্ন দেখা শুরু। ২০২৪ সালে আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো শৃঙ্গ দিয়ে সেই যাত্রার হাতেখড়ি।’’ বাড়িতে মা-বাবা-দাদাকে রেখে স্বপ্নের বেশির ভাগটাই সফল করে ফেলেছেন শুভম। নিজের পকেট থেকেই খরচ করেছেন প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। বাকি তিন লক্ষ্য— এভারেস্ট, দেনালি (উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ) এবং এশিয়ার সর্বোচ্চ আগ্নেয়গিরি দামাভান্দের (ইরানে) জন্য স্পনসরের খোঁজে রয়েছেন। গত সেপ্টেম্বরে আট হাজারি মানাসলু ছোঁয়ার পরে আগামী মরসুমেই এভারেস্ট ও আগামী জুনে দেনালির কথা ভেবেছেন তিনি। বলছেন, ‘‘এভারেস্টের জন্য প্রস্তুতি আগামী সপ্তাহ থেকেই শুরু করব। তার আগে মার্চে ইরান যাওয়ার কথা। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কী হবে, সে দিকে নজর রাখছি।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে