বেআইনি: হাওড়ার কোনা পর্বতপাড়ায় বোজানো হচ্ছে পুকুর। ছবি: দীপঙ্কর মজুমদার।
বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ফের হাওড়া শহরে সক্রিয় জমি-মাফিয়ারা। হাওড়ার পূর্ব থেকে পশ্চিম, সর্বত্র জলা জমি-পুকুর ভরাটের হিড়িক পড়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ। এমনকি, পুকুর ভরাট নিষিদ্ধ বলে হাওড়া পুরসভার তরফে বোর্ড টাঙানোর পরেও তা উপড়ে ফেলে দিনেদুপুরে চলছে পুকুর ভরাটের কাজ! তৃণমূলেই একাংশের অভিযোগ, দলের এক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির দলবল এই ভরাট-চক্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে জমি-মাফিয়ারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে এ বিষয়ে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও।
এমনিতেই নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে জেলা প্রশাসনের অধিকাংশ আধিকারিক ব্যস্ত। বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার অপেক্ষা মাত্র। এই সময়টাকেই বেছে নিয়ে নবান্নের কাছে মধ্য হাওড়ার গোরাচাঁদ রায় লেনে একটি ১০ কাঠার পুকুর রাতের অন্ধকারে বোজানোর কাজ শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বেনারস রোড সংলগ্ন কোনা পর্বতপাড়ায় শিবমন্দিরের কাছে একটি ১২ কাঠা পুকুরে দিনরাত ডাম্পারে করে মাটি এনে ফেলে অর্ধেকেরও বেশি বুজিয়ে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ।
হাওড়া পুরসভা সূত্রের খবর, পর্বতপাড়ার ওই পুকুর ভরাট নিয়ে এলাকাবাসীরা ছাড়াও তৃণমূলের প্রাক্তন পুরপ্রতিনিধি হাওড়া পুরসভা ও জেলাশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ জানান। ৭ নম্বর বরো থেকে ইঞ্জিনিয়ারেরা গিয়ে সম্প্রতি সেখানে পুকুর ভরাট নিষিদ্ধ বলে বোর্ড লাগিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। কিন্তু অভিযোগ, পরের দিনই সেই বোর্ড উপড়ে ফেলে ফের বোজানোর কাজ শুরু করেছে জমি-মাফিয়ারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুকুর বোজানোর কাজ করছেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে অন্যতম স্থানীয় একটি ওয়ার্ডের তৃণমূলের যুব সভাপতি ও এক জন আইএনটিটিইউসি-র স্থানীয় নেতা। শাসকদলের এক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির ছত্রছায়ায় থাকা এই নেতারা এলাকায় এতটাই আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে রেখেছেন যে, বাসিন্দারা প্রকাশ্যে মুখ খুলতেও ভয় পাচ্ছেন। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা সোমনাথ বেরা বলেন, ‘‘পর্বতপাড়ার এই পুকুরটা আমরা স্নান থেকে গৃহস্থালি, সব কাজেই ব্যবহার করতাম। সেটাকেও দিনেদুপুরে বুজিয়ে ফেলা হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে শাসকদলের লোকজন আমাদের শাসাচ্ছে। তা-ও আমরা লিখিত প্রতিবাদ করেছি।’’
স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশ যে পুকুর ভরাটের সঙ্গে জড়িত, তা অকপটে স্বীকার করেছেন ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূলের প্রাক্তন পুরপ্রতিনিধি ত্রিলোকেশ মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘‘দলের এক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির মদতে ওই পুকুর ভরাটের কাজ হচ্ছে। আমি বাধা দিয়েও আটকাতে পারিনি। আমরা দলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এই কাজ অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।’’
হাওড়া পুরসভা সূত্রের খবর, পর্বতপাড়ায় পুকুরটি বোজানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বোর্ড লাগানো হয়েছিল। সেই বোর্ড দুষ্কৃতীরা ভেঙে দিয়ে ফের বোজানোর কাজ শুরু করেছে। পুরসভার পক্ষ থেকে পুকুরটির মালিককে নোটিস পাঠিয়ে মাটি তুলে পুকুরটি পূর্বাবস্থায় ফেরানোর কথা বলা হয়েছে। পুর কমিশনার প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘ওই পুকুরের যে অংশটি বোজানো হয়েছে, সেই মাটি চার দিনের মধ্যে তুলে ফেলার নোটিস দেওয়া হয়েছে। না করলে পুরসভার পক্ষ থেকে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় এফআইআর করা হবে। পুকুরটি পূর্বাবস্থায় ফেরাতেই হবে।’’
অন্য দিকে, নবান্নের কাছে মন্দিরতলা চত্বরে গোরাচাঁদ রায় লেনে গিয়ে দেখা গিয়েছে, একটি ২০ কাঠার পুকুরকে চারদিক থেকে টিন দিয়ে ঘিরে বোজানোর কাজ চলছে। লোকচক্ষুর আড়ালে চলা এই ভরাটের জন্য বর্ষাকালে গোটা এলাকা যে জমা জলে ভাসবে, সেই আশঙ্কা করছেন এলাকার বাসিন্দারা।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে