পুজোর দালানে আবাসিকরা।-নিজস্ব চিত্র।
ঢাকের দু’কাঠির আওয়াজে চার দেওয়ালের গণ্ডী ছাড়িয়ে মনটা ছুটে বেরিয়ে যেতে চায়। চায় নিসঙ্গতা কাটিয়ে পুজোর চার-চারটে দিন ছেলে, বৌমা-নাতি-নাতনি সবাইকে নিয়ে আনন্দে মেতে উঠতে। কিন্তু কোনও উপায় নেই। স্বজনদের থেকে দূরে এঁদের জীবনের শেষ ঠাঁই এখন বৃদ্ধাশ্রম। আত্মীয়-পরিজনদের স্পর্শ থেকে নিঃসঙ্গ এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা নিজেদের মতো করে আনন্দ করতে তাই মেতে উঠেছেন শারদোৎসবে। যার শুরুটা হয়েছিল গত বছর।
হুগলির পোলবার সুগন্ধায় দিল্লি রোডের ধারে দেবভূমি বৃদ্ধাশ্রমে ১০ জন পুরুষ আর ২০ জন মহিলা নিয়ে আবাসিক সাকুল্যে ৩০ জন। অধিকাংশের বয়স ষাট পেরিয়েছে। কেউ আছেন পাঁচ বছর ধরে, কেউ বা তারও বেশি। প্রতি বছর পুজো এলেই মনে পড়ে যেত পুরনো দিনের কথা। পরিবারের সকলের সঙ্গে মিলেমিশে পুজোর আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার স্মৃতি। স্মৃতিই তো। কারণ এখন পুজোর ঢাকের কাঠির আওয়াজ কানে এলেও সকলের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠার মধ্যে তাঁরা নেই। কিন্তু পুরনো দিনের সেই শারদোৎসবের টান তো অস্বীকার করা যায় না। তাই সকলে ঠিক করে ফেললেন, পরিবারের সঙ্গে নেই তো কি, নিজেরাই নিজেদের মতো করে শারদোৎসবের আয়োজন করে আনন্দ করবেন। সেই ভাবনা থেকেই ২০১৪ সালে বৃদ্ধাশ্রমে শুরু হয়ে গেল দুর্গাপুজো। নাতি-নাতনি নিয়ে নাই ঘুরলেন। নিজেরা পুজো করে রোজকার জীবন থেকে একটু আলাদা জীবন কাটাবেন। রোজকার নিয়মের বেড়াজাল থেকে এই কয়েকটা দিন একটু লাগামছাড়া এবং অবশ্যই খাবারের মেনুতে রদবদল। কি নেই তাতে? খিচুড়ি থেকে শুরু করে লুচি, ছোলার ডাল, পটল চিংড়ি, ফ্রায়েড রাইস, পাঁঠার মাংস, ইলিশ ভাপা, পাবদা মাছের ঝাল, আমের চাটনি, দই মিষ্টিতে ভরপুর চারদিনের মেনু।
আবাসিক বীণাপানি মুখোপাধ্যায়, মীরা চৌধুরী, সুপ্রিয়া চট্টোপাধ্যা, বাসনা নাথ, রথীন দাশগুপ্ত সকলেই ব্যস্ত পুজোর আয়োজনে। কারও সঙ্গেই কারও রক্তের সম্পর্ক নেই। কিন্তু একসঙ্গে থাকতে থাকতে এঁরা সকলেই এখন একটা পরিবার। আশ্রমের সামনে সামিয়ানা খাটানো হয়েছে। সেখানেই ঠাকুরের সামনে কেউ ফল কাটছেন, কেউ পুজো উপকরণ জোগাড় করছেন। বীণাপানি দেবী বলেন, ‘‘আত্মীয়-স্বজন, পরিবার বলে আর কিছু রইল না শেষ জীবনে। তবে এখানে থেকে জীবনটা ভালই কাটছে। সব ভুলে শেষ জীবনটা এই ভাবে কেটে গেলে আর কিছু চাই না। পুজোর কটাদিন মনটা খারাপ হয়ে যেত, তাই সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে পুজো শুরু করি।’’
বৃদ্ধাশ্রমের কর্ণধার সমীর দাসের কথায়, ‘‘আবাসিকরা সকলেই পরিবার-পরিজন ছেড়ে এখানে নিঃসঙ্গ। ওঁদের নিঃসঙ্গতা কাটাতেই পুজোর ব্যবস্থা। যাতে ওঁরাও আনন্দে মেতে উঠতে পারেন। যেন আর সকলের থেকে নিজেদের আলাদা মনে না করেন।’’