দুর্গার চক্ষুদানে মাকে খুঁজে পান শ্যাম

রাজমিস্ত্রি ছিলেন বাবা। যেখানে কাজে যেতেন সঙ্গী থাকত বছর সাতেকের ছেলে। সেই ছেলেই একদিন নিজের চোখে দেখল বাবার মৃত্যু। বাঁশের ভারায় দাঁড়িয়ে চারতলা বাড়ির বাইরে প্লাস্টার করছিলেন বাবা। ছোট্ট ছেলেটি সেই দিকেই তাকিয়েছিল।

Advertisement

নুরুল আবসার

শেষ আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০১৫ ০১:৪৮
Share:

শ্যামের হাতে রূপ পাচ্ছেন দুর্গা। ছবি: সুব্রত জানা।

রাজমিস্ত্রি ছিলেন বাবা। যেখানে কাজে যেতেন সঙ্গী থাকত বছর সাতেকের ছেলে। সেই ছেলেই একদিন নিজের চোখে দেখল বাবার মৃত্যু। বাঁশের ভারায় দাঁড়িয়ে চারতলা বাড়ির বাইরে প্লাস্টার করছিলেন বাবা। ছোট্ট ছেলেটি সেই দিকেই তাকিয়েছিল। হঠাৎই ভারা থেকে পা পিছলে গেল বাবার। মনে আছে, চোখের সামনে একটু ছটফট করেই থেমে গিয়েছিল বাবার শরীরটা। চারপাশের ভিড় থেকে একটা শব্দ ভেসে আসছিল ‘মরে গিয়েছে’।

Advertisement

মা মারা গিয়েছিলেন আগেই। বাবা চলে যেতে একেবারেই একা হয়ে যায় ছেলেটা। কাটা ঘুড়ির মতো এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতে থাকল জীবন। তবে ওই বয়সেই সে বুঝেছিল লড়াই করেই তাকে বেঁচে থাকতে হবে। সেই শুরু, আজও হার না মানার কঠিন প্রতিজ্ঞা সেদিনের সেই ছোট্ট ছেলেটার। নানা পেশা ঘুরে দুর্গার মূর্তি গড়াই তার এখন নেশা। ছোটবেলায় জীবনের প্রিয় দু’টি জিনিস হারিয়ে যেন তাদেরই যেন খুঁজে বেড়ায় সে এই মৃণ্ময়ীর মধ্যে। বছর সাঁইতিরিশের শ্যাম জানার কথায়, ‘‘বড় শান্তি পাই, জানেন।’’

হাওড়ার বাগনানের সন্তোষপুর গ্রামের বাসিন্দা শ্যাম দুর্গাপুজোর সময় দম বড়ই ব্যস্ত। সকাল থেকে সন্ধ্যা একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানায় কাজ। বাড়ি ফিরে রাত ২টো পর্যন্ত চলে প্রতিমা গড়া। গত তিন মাস ধরে এটাই রুটিন। প্রতিবারই মূর্তিতে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেন। এ বার প্রতিমা তৈরি করছেন বাঁশ, ঘাস, শেওলা, খড়িকাঠি, মাদুর কাঠি আর হোগলা দিয়ে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বাবুই পাখির বাসা। ৯০ শতাংশ কাজ শেষ। জানালেন, এই প্রতিমা যাবে হুগলির খানাকুলের একটি মণ্ডপে।

Advertisement

কারখানায় সারাদিনের খাটুনির পর ফিরে রাত জেগে ঠাকুর তৈরি কিন্তু টাকার জন্য নয়। শ্যামের কথায়, ‘‘তিন মাসের টানা খাটনি, জিনিসপত্রের দাম যদি ধরা হয় তাহলে লাভের কথা না তোলাই ভাল। তা হলে করছেন কেন? একতলা ছোট পাকা বাড়ির ছাদের এক কোণে টাঙানো ত্রিপলের আড়ালই স্টুডিও। হোগলার টুকরো দিয়ে তৈরি অলঙ্কার দেবীর গায়ে পরাতে পরাতে শ্যাম বলেন, ‘‘নতুন কিছু করার নেশা। এ বারের পুজো কেটে গেলেই ফের সামনের বার নতুন কী করা যায় তা নিয়ে ভাবতে বসব।’’ গত বছর নারকেলের মালার দুর্গা তৈরি করেছিলেন বলে শ্যাম জানান।

কলকাতার বালিগঞ্জ এলাকায় পৈতৃক বাড়ি ছিল। মা-বাবার মৃত্যুর পরে আত্মীয়েরা তাঁকে তাড়িয়ে দেয়। এর পর থেকে কখনও ভিক্ষা করে, কখনও চুরি করে খাবার খেয়েছেন। এক সময়ে চায়ের দোকানে কাজ নেন। সেখান থেকে পরিচিত এক জনের সঙ্গে চলে আসেন বাগনানে। কাজ নেন একটি ডেকরেটরের দোকানে। ১৭ বছর কাজ করার পরে বিবাহ সূত্রে সন্তোষপুর গ্রামের বাসিন্দা ও ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানায় কাজের শুরু। বছর ছয়েক ধরেই মূর্তি তৈরির নেশা। স্কুলে পড়ার সুযোগ হয়নি। নেই শিল্পের প্রথাগত প্রশিক্ষণ। তবু শ্যামের হাতে নিখুঁতভাবে মূর্ত হয়ে ওঠেন দশভূজা। চেহারায় ছোটখাটো চেহারার শ্যাম এলাকায় ছটু নামেই পরিচিত। তাঁর কথায়, ‘‘ছেলেবেলায় বেঁচে থাকার লড়াই আমার কাছ থেকে শৈশবের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু সেই আনন্দ ফিরে পেয়েছি দুর্গার মূর্তি তৈরির মধ্যে। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝি আমার বেঁচে থাকার লড়াই বৃথা যায়নি।’’

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement